এই যুদ্ধে নবাবসৈন্যের পরাজয় হইলেও তকী খান যে সাহস, সমরকৌশল ও প্রভুভক্তি দেখাইয়াছেন তাহা ঐ যুগে সত্য সত্যই দুর্লভ ছিল। মুঙ্গের হইতে আগত সেনাদলের নায়কেরা যদি তাঁহার সহায়তা করিতেন তবে যুদ্ধের ফল অন্যরূপ হইত। তাহাদের সহিত তুলনা করিলে তকী খানের বীরত্ব ও চরিত্র আরও উজ্জ্বল হইয়া উঠে। দুঃখের বিষয় সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চন্দ্রশেখর উপন্যাসে তকী খানের একটি অতি জঘন্য চিত্র আঁকিয়াছেন। ইহা সম্পূর্ণ অলীক ও অনৈতিহাসিক। এই বীরের ললাটে যে কলঙ্ক কালিমা বঙ্কিমচন্দ্র লেপিয়া দিয়াছেন তাহা কথঞ্চিত দূর করিবার জন্যই তকী খানের কাহিনী সবিস্তারে বিবৃত হইল।
কাটোয়ার যুদ্ধক্ষেত্র হইতে বিজয়ী ইংরেজ সৈন্য মুর্শিদাবাদের দিকে অগ্রসর হইল। মুর্শিদাবাদ রক্ষার জন্য যথেষ্ট সৈন্য ছিল; কিন্তু অযোগ্য ও অপদার্থ নায়েব নবাব সৈয়দ মুহম্মদ মুঙ্গেরে পলায়ন করিলেন। এক রকম বিনা যুদ্ধেই মুর্শিদাবাদ ইংরেজের হস্তগত হইল। মুর্শিদাবাদের অধিবাসীরা–বিশেষত হিন্দুগণ মীর কাশিমের হস্তে উৎপীড়িত হইয়াছিলেন। জগৎশেঠ, মহারাজা রাজবল্লভ প্রভৃতি সম্ভ্রান্ত হিন্দুগণকে মীর কাশিম মুঙ্গেরে কারারুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন, কারণ তাঁহার মনে সন্দেহ হইয়াছিল যে ইহারা ইংরেজের পক্ষভুক্ত। সুতরাং মুর্শিদাবাদে মীরজাফর ও ইংরেজ সৈন্য বিপুল সংবর্ধনা পাইলেন।
কাটোয়ার যুদ্ধে ইংরেজদের বহু লোকক্ষয় হইয়াছিল–সুতরাং তাঁহারা দুই পল্টন নূতন সৈন্য সংগ্রহ করিয়া পুনরায় অগ্রসর হইলেন। গিরিয়ার প্রান্তরে দুই দলে যুদ্ধ হইল (২রা অগস্ট)। আসাদুল্লা ও মীর বদরুদ্দীন প্রভৃতি মীর কাশিমের কয়েকজন সেনানায়ক অতুল বিক্রমে যুদ্ধ করিলেন। মীর বদরুদ্দীন ইংরেজ সৈন্যের বামপার্শ্ব ভেদ করিয়া অগ্রসর হইলেন; এবং তখন ইংরেজ সৈন্য জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িতে লাগিল। এই সময়ে ইংরেজ সৈন্যের দক্ষিণ পার্শ্ব আক্রমণ করিলেই জয় সুনিশ্চিত ছিল। কিন্তু তাঁহার পূর্বেই বদরুদ্দীন আহত হওয়ায় তাঁহার সৈন্যদের অগ্রগতি থামিয়া গেল। এই অবসরে মেজর অ্যাডাম্স প্রবলবেগে আক্রমণ করায় নবাবসৈন্য ছত্রভঙ্গ হইয়া পলায়ন করিল। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, নবাবসৈন্যের দুই প্রধান নায়ক সমরু ও মার্কার এ যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থাকিয়াও যুদ্ধে বিশেষ কোন অংশগ্রহণ করেন নাই। অনেকে মনে করেন তাঁহারা নবাবের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছেন কিন্তু এ সম্বন্ধে স্পষ্ট কোন প্রমাণ নাই।
গিরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত নবাবসৈন্য কিছুদূর উত্তরে উধুয়ানালার দুর্গে আশ্রয় লইল। ইহার একধারে ভাগীরথী ও অপর পাশে উধুয়া নামক নালা এবং ইহারই মধ্য দিয়া মুর্শিদাবাদ হইতে পাটনা যাইবার বাদশাহী রাজপথ। রাজপথের পার্শ্বদেশেই প্রশস্ত ও গভীর নালা এবং তাঁহার পাশেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্বতমালা ক্রমশ বিস্তারিত হইতে হইতে উত্তরাভিমুখে চলিয়া গিয়াছে। এই দুর্ভেদ্য গিরিসঙ্কটে একটি ক্ষুদ্র দুর্গ ছিল। মীর কাশিম নূতন দুর্গ-প্রাচীর নির্মাণ করিয়া তদুপরি সারি সারি কামান সাজাইয়াছিলেন। এই প্রাচীর এত সুদৃঢ় ছিল যে দীর্ঘকাল গোলাবর্ষণেও তাহা ভগ্ন হইবার সম্ভাবনা ছিল না। বহু সংখ্যক নবাবীসৈন্য এই দুর্গরক্ষার জন্য পাঠান হইয়াছিল।
ইংরেজরা বহু গোলাবর্ষণ করিয়াও যখন দুর্গপ্রাচীর ভাঙ্গিতে পারিল না তখন নবাবসৈন্যের ধারণা হইল যে এই দুর্গ জয় করা ইংরেজের সাধ্য নহে। এইজন্য তাহারা আর পূর্বের ন্যায় সতর্কতার সহিত দুর্গ পাহারা দিত না এবং নৃত্যগীতে চিত্ত বিনোদন করিত। এই সময়ে এক বিশ্বাসঘাতক নবাবী সৈনিক দুর্গ হইতে গোপনে রাত্রিতে পলায়ন করিয়া ইংরেজ শিবিরে উপস্থিত হইল। সে ইংরেজ সেনাপতিকে জানাইল যে জলগণ্ডের এমন একটি অগভীর স্থান আছে, যেখানে হাঁটিয়া পার হওয়া যায়। সেই রাত্রিতেই ইংরেজ সেনা অস্ত্রশস্ত্র মাথায় করিয়া নিঃশব্দে ঐ স্বল্প গভীর স্থানে জলগণ্ড পার হইয়া দুর্গমূলে সমবেত হইল। নিদ্রামগ্ন প্রহরীদিগকে হত্যা করিয়া কয়েকজন ইংরেজ সৈনিক প্রাচীর বাহিয়া দুর্গমধ্যে প্রবেশ করিল এবং দুর্গদ্বার খুলিয়া দিল। অমনি বহু ইংরেজ সৈন্য দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করিল; তখন নিদ্রিত নবাবীসৈন্য অতর্কিত আক্রমণে বিভ্রান্ত হইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। নবাবের সেনানায়কগণ পলায়নের পথরোধ করিয়া ঘোষণা করিলেন, যে পলায়ন করিবে তাহাকেই গুলি করা হইবে। নিজ পক্ষের গুলিবর্ষণে বহু নবাবসৈন্য নিহত হইল, তথাপি তাহারা ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য অগ্রসর হইল না। আরাটুন, মার্কাট ও গরগিন খাঁ বিনাযুদ্ধে দুর্গ সমৰ্পণ করিয়া পলায়ন করিলেন। এইরূপে ৪০,০০০ সৈন্য ও শতাধিক কামান দ্বারা রক্ষিত এই দুর্ভেদ্য দুর্গ এক হাজার ইউরোপীয় ও চারি হাজার সিপাহী জয় করিল। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে উল্লিখিত বিদেশী দুই সেনানায়কের বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই উধুয়ানালায় মীর কাশিমের পরাজয় হইয়াছিল। “গরগনি খা”র ভ্রাতা খোঁজা পি ইংরেজদের বন্ধু ছিলেন তিনি যে ইংরেজ সেনানায়ক অ্যাডাম্সের অনুরোধে উধুয়ানালায় মাটি ও আরাটুনের নিকট ইংরেজদের উপকার করিবার জন্য চিঠি লিখিয়াছিলেন, তাহা পরবর্তীকালে নিজেই স্বীকার করিয়াছেন।
