নবাব বুঝিতে পারিলেন যে শীঘ্রই ইংরেজদের সহিত তাঁহার যুদ্ধ বাধিবে। সুতরাং কলিকাতা হইতে যে কয়েকখানা ইংরেজের নৌকা অস্ত্র বোঝাই করিয়া পাটনায় পাঠান হইয়াছিল, তিনি সেগুলি আটক করিলেন এবং বলিলেন, পাটনা হইতে ইংরেজ সৈন্য না সরাইলে তিনি ঐ নৌকাগুলি ছাড়িবেন না। কিন্তু যখন তিনি শুনিলেন যে এলিস পাটনা দুর্গ আক্রমণের ব্যবস্থা করিতেছে তখন তিনি নৌকাগুলি ছাড়িয়া দিলেন; এবং ঐ তারিখেই (২২ জুন) গভর্নরকে এলিসের গোপন ব্যবস্থার খবর দিয়া লিখিলেন—”আমি পুনঃপুনঃ আপনাকে অনুরোধ করিয়াছি, আবারও করিতেছি–আপনি আমাকে রেহাই দিয়া অন্য নবাব নিযুক্ত করুন।”
নবাব নূতন সন্ধির শর্ত না মানায় অ্যামিয়ট ও হে নবাবের রাজধানী মুঙ্গের ত্যাগ করিলেন। ২৭শে জুন রাত্রে এলিস পাটনা আক্রমণ করিলেন। নবাবের সৈন্যেরা নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছিল–অতর্কিত আক্রমণে তাহারা বিপর্যস্ত হইল–এবং এলিস পাটনা দুর্গ জয় করিতে না পারিলেও পাটনা নগরী অধিকার করিলেন। বহু লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হইল। এবারে মীর কাশিমের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গিল। তিনি পাটনা পুনরায় অধিকারের জন্য মার্কারের অধীনে একদল সৈন্য পাঠাইলেন। তাহারা পাটনা নগরী অধিকার করিয়া ইংরেজ কুঠি আক্রমণ করিল। ইংরেজরা আত্মসমর্পণ করিল এবং এলিস ও আরও অনেকে বন্দী হইল।
নবাব এলিসের আকস্মিক আক্রমণের কথা ভ্যানসিটার্টকে জানাইলেন এবং ক্ষতি পূরণের দাবি করিলেন। অ্যামিয়ট সাহেব মীর কাশিমের নিকট দৌত্যকার্যে বিফল হইয়া আরও কয়েকজন ইংরেজসহ মুঙ্গের হইতে কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিয়াছিলেন। মীর কাশিম পাটনার সংবাদ পাইয়া মুর্শিদাবাদে আদেশ পাঠাইলেন যে অ্যামিয়টের নৌকা যেন আটক করা হয়। তাঁহাকে হত্যা করিবার কোন আদেশ ছিল না কিন্তু অ্যামিয়ট নবাবের আদেশ সত্ত্বেও নৌকা হইতে নামিতে অথবা আত্মসমর্পণ করিতে রাজী হইলেন না এবং নবাবের যে সমুদয় নৌকা তাঁহাকে ধরিতে আসিয়াছিল, ইংরেজ সৈন্যকে তাহাদের উপর গুলি বর্ষণ করিতে আদেশ দিলেন। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর নবাব সৈন্য অ্যামিয়টের নৌকাগুলি দখল করিল। ইংরেজ পক্ষের একজন হাবিলদার ও দুই একজন সিপাহী পলাইল-বাকী সকলেই আহত বা বন্দী হইল। অ্যামিয়টও মৃত্যুমুখে পতিত হইল। এই ঘটনা পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড বলিয়াই সাধারণতঃ ইতিহাসে বর্ণিত হয়–কিন্তু অ্যামিয়টের আদেশে নবাবের নৌকাসমূহের বিরুদ্ধে গুলি ছোঁড়ার ফলেই যে এই দুর্ঘটনা হয়, কোন কোন ইংরেজ লেখকও তাহা স্বীকার করিয়াছেন।
পাটনায় এলিস ও অন্যান্য ইংরেজদিগকে বন্দী করায় কলিকাতার কাউনসিল মীর কাশিমের বিরুদ্ধে বিষম উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন। তারপর ৩রা জুলাই অ্যামিয়টের নিধন-সংবাদে তাঁহারা মীর কাশিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিলেন এবং মীরজাফরকে পুনরায় বাংলার নবাবী-পদে প্রতিষ্ঠা করিলেন। ইংরেজরা ঐ দুই ঘটনার অনেক পূর্বেই মীর কাশিমের সহিত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি কলিকাতার কাউনসিলে যুদ্ধ বাধিলে কোন্ সেনানায়ক কোন্ দিকে অগ্রসর হইবেন তাহা নির্ণীত হইয়াছিল এবং ১৮ই জুন যুদ্ধের ব্যবস্থা আরও অগ্রসর হইয়াছিল।
মীর কাশিম যে যুদ্ধের জন্য একেবারে প্রস্তুত ছিলেন না, এমন কথা বলা যায় না। ইহার সম্ভাবনায়ই তিনি একদল সৈন্য ইউরোপীয় প্রথায় শিক্ষিত করিয়াছিলেন। তাঁহার সৈন্য সংখ্যা ৫০ হাজারের অধিক ছিল। ইংরেজ সেনাপতি মেজর অ্যাডামস্ চারি হাজার সিপাহী ও সহস্রাধিক ইউরোপীয় সৈন্য লইয়া তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করিলেন (জুলাই, ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দ)।
মীর কাশিম মুর্শিদাবাদ রক্ষার জন্য বিশ্বাসী নায়কদের অধীনে বহুসংখ্যক সৈন্য সেখানে পাঠাইলেন এবং তাহাদিগকে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি অবরোধ করার আদেশ দিলেন। কাশিমবাজার সহজেই অধিকৃত হইল এবং বন্দী ইংরেজগণ মুঙ্গেরে প্রেরিত হইয়া তথা হইতে পাটনাতে নীত হইলেন।
নবাবী সৈন্যের সেনাপতি তকী খানের সহিত মুর্শিদাবাদের নায়েব নবাব সৈয়দ মুহম্মদ খানের সদ্ভব ছিল না–সৈয়দ মুহম্মদ তকী খানকে প্রতি পদে বাধা দিতে লাগিলেন এবং মুঙ্গের হইতে যে তিন দল সৈন্য তকী খানের সহিত যোগ দিতে আসিয়াছিল, তাহাদের নায়কগণকে কুপরামর্শ দিয়া তকী খানের শিবির হইতে দূরে রাখিলেন। অজয় নদের তীরে নবাবী সৈন্যের এই দলের সহিত একদল ইংরেজ সৈন্যের যুদ্ধ হইল। নবাবসৈন্যের সহিত কামান ছিল না-ইংরেজ সৈন্যের কামানের গোলায় তাহারা বিধ্বস্ত হইল। তথাপি নবাবসৈন্য অতুল সাহসে চারি ঘণ্টাকাল যুদ্ধ করিল। কিন্তু অবশেষে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করিল।
বিজয়ী ইংরেজ সৈন্য কলিকাতা হইতে আগত মেজর অ্যাডামূসের সৈন্যের সহিত যোগ দিল। ইহার দুই তিন দিন পরে ১৯শে জুলাই তকী খানের সহিত কাটোয়ার সন্নিকটে ইংরেজদের যুদ্ধ হইল। এই যুদ্ধে তকী খান অশেষ বীরত্ব ও সাহসের পরিচয় দেন। বহুক্ষণ যুদ্ধের পর তকী খান আহত হইলেন এবং তাঁহার অশ্ব নিহত হইল। তকী খান আর একটি অশ্বে চড়িয়া ভীমবেগে ইংরেজ সৈন্য আক্রমণ করিলেন। এই সময় আর একটি গুলি তাঁহার স্কন্ধদেশ বিদীর্ণ করিল। ক্ষতস্থানের রক্ত কাপড়ে ঢাকিয়া অনুচরগণের নিষেধ না শুনিয়া তকী খান পলায়নপর ইংরেজদিগকে অনুসরণ করিয়া একটি নদীর খাতের কাছে পৌঁছিলেন। সেখানে ঝোঁপের আড়ালে কতকগুলি ইংরেজ সৈন্য লুকাইয়া ছিল। তাঁহাদেরই একজন তকী খানকে লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুঁড়িল-তকী খানের মৃত্যু হইল। অমনি তাঁহার সৈন্যদল ইতস্তত পলাইতে লাগিল। মুঙ্গের হইতে যে তিন দল সৈন্য আসিয়াছিল তাহারা যুদ্ধে কোন অংশগ্রহণ না করিয়া দূরে দাঁড়াইয়াছিল। তাহারাও এবারে পলায়ন করিল। ইংরেজরা কাটোয়ার যুদ্ধে জয়লাভ করিলেন।
