শুল্ক ব্যাপার সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হইয়া ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দে জানুয়ারী মাসে মীর কাশিম “গরগিন খাঁ”র অধীনে এক সৈন্যদল নেপাল জয় করিবার জন্য পাঠাইলেন। মকবনপুরের নিকটে এক যুদ্ধে নবাবসৈন্য গুখাদিগকে পরাজিত করিয়া রাত্রে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাইতেছিল। অকস্মাৎ গুর্খাদের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হইয়া পলাইল। নবাবের বহু সৈন্য নিহত হইল এবং বহু অস্ত্র-শস্ত্র কামান-বন্দুক গুর্খাদের হস্তগত হইল।
এদিকে ভ্যানসিটার্ট নবাবের সহিত নূতন বন্দোবস্ত করায় ইংরেজ বণিকরা ক্রুদ্ধ হইয়া কলিকাতা বোর্ডের নিকট ইহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিল এবং বোর্ড এই নূতন বন্দোবস্ত নাকচ করিয়া দিল। ভ্যানসিটার্ট বোর্ডের সদস্যদিগকে স্মরণ করাইয়া দিলেন যে বাদশাহী ফরমানে এরূপ আভ্যন্তরিক বাণিজ্যের অধিকার দেওয়া হয় নাই, এবং কোম্পানীর ইংলণ্ডীয় কর্তৃপক্ষ একাধিকবার নির্দেশ দিয়াছেন যে লবণ, সুপারি প্রভৃতি যে সমুদয় দ্রব্যের বেচাকেনা বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাঁহার জন্য নির্ধারিত শুল্ক দিতে হইবে–কারণ তাহা না হইলে নবাবের রাজস্বের অনেক ক্ষতি হইবে। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও ইংরেজরা বহুদিন যাবৎ যে সুবিধা ভোগ করিয়া আসিতেছে, তাহা ছাড়িয়া দিতে রাজী হইল না এবং ভ্যানসিটার্টের নূতন বন্দোবস্ত কাউনসিল নাকচ করিয়া দিলেন। অগত্যা ভ্যানসিটার্ট নবাবকে লিখিলেন–“বাদশাহী ফরমান এবং বাংলার নবাবদের সহিত সন্ধি অনুসারে কোম্পানীর দস্তকের বলে বিনা শুল্কে আভ্যন্তরিক ও বিদেশীয় বাণিজ্য করিবার সম্পূর্ণ অধিকার ইংরেজ বণিকদের আছে। সুতরাং ইংরেজ বণিকেরা এই অধিকারের জোরে পূর্বের ন্যায় বিনা শুল্কে বাংলা দেশের অভ্যন্তরে সকল দ্রব্যের ব্যবসা করিতে পারে ও করিবে। তবে প্রাচীন প্রথা অনুসারে লবণের উপরে শতকরা আড়াই টাকা হিসাবে শুল্ক দিবে। কেবল দুইটি কুঠিতে তামাকের উপর শুল্ক দিবে।”
কলিকাতা কাউনৃসিলের এই নূতন সিদ্ধান্ত প্রচারিত হইবার পূর্বেই পাটনায় নবাবের সহিত ইংরেজ কুঠির অধ্যক্ষ এলিস সাহেবের এক সংঘর্ষ হইল। নবাবের সহিত ভ্যানসিটার্টের যে নূতন বন্দোবস্ত হইয়াছিল তদনুসারে নবাবের কর্মচারীরা ইংরেজ বণিকের নিকট শুল্ক দাবি করে। এলিস ইহাতে ক্রুদ্ধ হইয়া নবাবের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একদল সৈন্য পাঠান এবং তাহাদের অধ্যক্ষ আকবর আলী খানকে বন্দী করিয়া পাটনায় লইয়া আসেন। নিজের চোখের উপর এই রকম অত্যাচারে নবাব ক্রোধে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া তাঁহার কর্মচারীকে উদ্ধার করিবার জন্য ৫০০ ঘোড়সওয়ার পাঠাইলেন। ইহারা উক্ত কর্মচারীকে না পাইয়া এলিসের প্রহরীদের আক্রমণ করিল। চারিজন প্রহরী হত হইল এবং নবাবের সৈন্য এলিসের অবশিষ্ট প্রহরী ও গোমস্তাদের বন্দী করিয়া আনিল। নবাব তাহাদিগকে ভৎর্সনা করিয়া ছাড়িয়া দিলেন। কলিকাতা কাউনৃসিল ভ্যানসিটার্টের সহিত নবাবের নূতন বন্দোবস্ত নাকচ করিয়া দেওয়ায় ভবিষ্যতে এইরূপ গোলযোগ বন্ধ করিবার অভিপ্রায়ে নবাব সমস্ত জিনিষের উপরই শুল্ক একেবারে উঠাইয়া দিলেন (১৭ই মার্চ, ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দ)। গভর্নরকে লিখিলেন, তাঁহার আর রাজত্ব করিবার সখ নাই; সুতরাং তাহাকে রেহাই দিয়া ইংরেজরা যেন অন্য নবাব নিযুক্ত করে।
সমস্ত শুল্ক তুলিয়া দেওয়ায় বাংলার রাজস্ব অর্ধেক কমিয়া গেল। অত্যাচার, অপমান ও অরাজকতা নিবারণের জন্য নবাব এ ক্ষতিও সহ্য করিতে প্রস্তুত হইলেন। কিন্তু কলিকাতা কাউনসিলের অধিকাংশ সদস্য নবাবের প্রস্তাবে অমত করিলেন। তাঁহারা বলিলেন ইংরেজ বণিক ছাড়া আর সকলের নিকট হইতেই শুল্ক আদায় করিতে হইবে–কারণ তাহা না হইলে ইংরেজ বণিকদের অতিরিক্ত মুনাফা বন্ধ হয়।
ইংরেজ ঐতিহাসিক মিল লিখিয়াছেন, স্বার্থের প্ররোচনায় মানুষ যে কতদূর ন্যায়-অন্যায় বিচাররহিত ও লজ্জাহীন হইতে পারে, ইহা তাঁহার একটি চরম দৃষ্টান্ত।
এই সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইয়া কলিকাতা কাউসিল মুঙ্গেরে নবাবের নিকট অ্যামিয়ট ও হে নামক দুই সাহেবকে পাঠাইয়া নিম্নলিখিত দাবিগুলি উপস্থাপিত করিলেন।
১। নবাব ও ভ্যানসিটার্টের মধ্যে নূতন বন্দোবস্ত অনুসারে নবাবের কর্মচারীদিগকে যে সকল আদেশ দেওয়া হইয়াছিল তাহা প্রত্যাহার করা এবং ইহার জন্য ইংরেজদের যে ক্ষতি হইয়াছে, তাঁহার পূরণ করা।
২। শুল্ক রহিত করিবার আদেশ প্রত্যাহার করা।
৩। নবাবের কর্মচারীদের সহিত ইংরেজ বণিকদের বা তাহাদের গোমস্তার এবং কোম্পানীর কর্মচারীদের কোন বিবাদ উপস্থিত হইলে কোম্পানীর কুঠির ইংরেজ অধ্যক্ষের হস্তেই তাঁহার বিচারের ভার দেওয়া।
৪। বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম জিলা ইংরেজ কোম্পানীকে বর্তমান ইজারার পরিবর্তে সম্পূর্ণ স্বত্ব বা জায়গীর দেওয়া।
৫। দেশীয় মহাজনেরা যাহাতে কোম্পানীর টাকা বিনা বাটায় গ্রহণ করে এবং কোম্পানী যাহাতে ঢাকা ও পাটনার টাকশালে তিন লক্ষ টাকা তৈরী করিতে পারে, তাঁহার ব্যবস্থা করা।
৬। নবাবের দরবারে একজন ইংরেজ প্রতিনিধি (Resident) রাখা।
নবাব দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্তে রাজী হইলেন না। তিনি বলিলেন, “ইংরেজরা বহু সন্ধি করিয়াছে এবং তাহা অবিলম্বে ভঙ্গ করিয়াছে–আমি কোন সন্ধি ভঙ্গ করি নাই। সুতরাং নূতন সন্ধির কোন অর্থ হয় না।” তারপর একখানি সাদা কাগজ তাহাদের হাতে দিয়া বলিলেন, “তোমাদের যাহা ইচ্ছা ইহাতে লিখিয়া দাও, আমি সই করিব-কিন্তু আমার কেবল একটি দাবি–তাহা এই যে দেশের যেখানে যত ইংরেজ সৈন্য আছে তাহাদিগকে সরাইয়া নিবে।”
