কয়েকজন ইংরেজও এইরূপ অত্যাচারের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। বাখরগঞ্জ হইতে সার্জেন্ট ব্রেগো ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দের ২৬শে মে গভর্নর ভ্যানসিটার্টকে যে পত্র লেখেন তাঁহার মর্ম এই–“এই স্থানটি বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। কিন্তু নিম্নলিখিত কারণে এ স্থানের ব্যবস্থা একেবারে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। একজন ইংরেজ বেচাকেনার জন্য একজন গোমস্তা পাঠাইলেন। সে অমনি প্রত্যেক লোককে তাঁহার দ্রব্য কিনিতে অথবা তাঁহার নিকট তাহাদের দ্রব্য বেচিতে বলে, যদি কেহ অস্বীকার করে বা অশক্ত হয় তবে তৎক্ষণাৎ তাহাকে বেত্রাঘাত অথবা কয়েদ করা হয়। যে সমস্ত দ্রব্যের ব্যবসায় তাহারা নিজেরা চালায় সেই সব দ্রব্য আর কেহ কেনাবেচা করিতে পারিবে না, করিলে তাহাকে শাস্তি দেওয়া হয়। ন্যায্য দামের চেয়ে জিনিসের দাম তাহারা অনেক কম করিয়া ধরে এবং অনেক সময় তাহাও দেয় না। যদি আমি এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি, অমনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। এইরূপে বাঙালী গোমস্তাদের অত্যাচারে প্রতিদিন বহু লোক শহর ছাড়িয়া পলাইতেছে। পূর্বে সরকারী কাছারীতে বিচার হইত কিন্তু এখন প্রতি গোমস্তাই বিচারক এবং তাঁহার বাড়ীই কাছারী। তাহারা জমিদারদেরও দণ্ডবিধান করে এবং মিথ্যা অভিযোগ করিয়া তাহাদের নিকট হইতে টাকা আদায় করে।”
১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ওয়ারেন হেষ্টিংস এইসব অত্যাচারের কাহিনী গভর্নরকে জানান। তিনি বলেন যে “কেবল কোম্পানীর গোমস্তা ও সিপাহী নহে, অন্য লোকও সিপাহীর পোষাক পরিয়া বা গোমস্তা বলিয়া পরিচয় দিয়া সর্বত্র লোকের উপর যথেচ্ছ অত্যাচার করে। আমাদের আগে একদল সিপাহী যাইতেছিল, তাহাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে অনেকে আমার নিকট অভিযোগ করিয়াছে। আমাদের আসার সংবাদে শহর ও সরাই হইতে লোকেরা পলাইয়াছে–দোকানীরা দোকান বন্ধ করিয়া সরিয়া পড়িয়াছে।”
২৬শে মের পত্রে হেষ্টিংস লেখেন–“সর্বত্র নবাবের কর্তৃত্ব প্রকাশ্যে অস্বীকৃত ও অপমানিত; নবাবের কর্মচারীরা কারারুদ্ধ; নবাবের দুর্গ আমাদের সিপাহী দ্বারা আক্রান্ত।”
গভর্নর ভ্যানসিটার্ট লিখিয়াছেন–“আমি গোপনে অত্যাচারী ইংরেজ কর্মচারীদের সাবধান করিয়াছি; কিন্তু অত্যাচারের কোন উপশম না হওয়ায় বোর্ডের সভায় ইহা পেশ করিয়াছি। অথচ বোর্ডের সদস্যরা এ বিষয়ে কোন মনোযোগই দিলেন না। কারণ, তাঁহাদের বিশ্বাস নবাব আমাদের সঙ্গে কলহ করার জন্যই এই সব মিথ্যা সংবাদ রটাইতেছেন। নবাবের অভিযোগে বিশ্বাস করি বলিয়া তাঁহারা আমাকে গালি দেন ও শত্রু বলিয়া মনে করেন। যদিও প্রতিদিন অভিযোগের সংখ্যা বাড়িয়াই চলিতেছে, তথাপি প্রতিকার তো দূরের কথা, ইহার একটির সম্বন্ধেও কোন তদন্ত হয় নাই।”
নবাবের প্রধান অভিযোগ ছিল ইংরেজদের বে-আইনী ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে। বাদশাহের ফরমান অনুসারে যে সকল দ্রব্য এদেশে জাহাজে আমদানী হয় অথবা এদেশ হইতে জাহাজে রপ্তানী হয়, কেবল সেই সকল দ্রব্যই কোম্পানী বেচাকেনা করিতে পারিবেন এবং কোম্পানীর মোহরাঙ্কিত দস্তক’ দেখাইলে তাঁহার উপর কোন শুল্ক ধার্য হইবে না। কিন্তু কেবল কোম্পানী নয়, তাহাদের ইংরেজ কর্মচারীরাও অন্য সকল দ্রব্য-লবণ, সুপারি, তামাক প্রভৃতি-বাংলা দেশের মধ্যেই বেচাকেনা করিত এবং কেম্পানীর দস্তক দেখাইয়া কেহই শুল্ক দিত না। লবণের গোলা হইতে সর্বত্র দেশী ব্যাপারীদের সরাইয়া ইংরেজরা প্রায় একচেটিয়া বাণিজ্য করিত এবং ইহাতে নবাবের প্রভূত লোকসান হইত। এতদ্ব্যতীত ইংরেজ বণিকের সহিত নবাবের কর্মচারীদের বিবাদ উপস্থিত হইলে ইংরেজরাই তাঁহার বিচার করিত। নবাব বা তাঁহার কর্মচারীদিগকে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করিতে দিত না। সুতরাং যাহারা কোন অপরাধ করিত সেই অপরাধের বিচারের ভারও তাহাদের উপরেই ছিল।” গর্ভনর ভ্যানসিটার্ট নবারের অভিযোগগুলি ন্যায়সঙ্গত মনে করিয়াছিলেন বলিয়াই হউক অথবা মীর কাশিমের নিকট হইতে বহু অর্থ পাইয়াছিলেন বলিয়াই হউক নবাবের পক্ষ লইয়া কাউনৃসিলের ইংরেজ সদস্যদের সহিত অনেক লড়িয়াছিলেন এবং কিছু কিছু কৃতকার্য হইয়াছিলেন। রামনারায়ণকে ইংরেজ গভর্নমেন্ট বরাবর নবাবের বিরুদ্ধে আশ্রয় দিয়াছিলেন কিন্তু নবাবের চিঠিতে উল্লিখিত ১৬ই জুনের ঘটনার দুইদিন পরে কলিকাতার কমিটি রামনারায়ণকে পদচ্যুত করে এবং কর্নেল কূট ও মেজর কারন্যাককে পাটনা হইতে স্থানান্তরিত করে। অগস্ট মাসে পাটনায় নূতন নায়েব-সুবাদার নিযুক্ত করার ব্যবস্থা হয় এবং সেপ্টেম্বর মাসে ভ্যানসিটার্টের আদেশে রামনারায়ণকে নবাবের হস্তে অর্পণ করা হয়। নবাব তাঁহার নিকট হইতে যতদূর সম্ভব টাকা আদায় করিয়া অবশেষে তাহাকে হত্যা করেন। কেবলমাত্র ইংরেজের অনুগ্রহের আশায় বা ভরসায় যাহারা স্বীয় প্রভুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিলেন, তাঁহাদের অদৃষ্টে যে কত নিগ্রহ ও দুঃখভোগ ছিল, মীরজাফর, মীর কাশিম, রামনারায়ণ প্রভৃতি তাঁহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইংরেজ কোম্পানীর কর্মচারীদের সম্বন্ধে নবাব যে অভিযোগ করিতেন, ভ্যানসিটার্ট তাঁহারও প্রতিকার করিতে যত্নবান হইলেন। ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দের শেষভাগে তিনি নবাবের নূতন রাজধানী মুঙ্গেরে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া এক নূতন সন্ধি করিলেন। স্থির হইল যে ভবিষ্যতে ইংরেজরা লবণের উপর শতকরা ৯ টাকা হারে শুল্ক দিবে। এ দেশীয় বণিকেরা শতকরা ৪০ টাকা শুল্ক দিত। সুতরাং নির্ধারিত শুল্ক দিয়াও ইংরেজদের অনেক লাভ থাকিত। কিন্তু এই সুবিধার পরিবর্তে সন্ধির আর একটি শর্তে স্থির হইল যে অতঃপর নবাবের কর্মচারীদের সহিত ইংরেজ বণিক বা তাঁহার গোমস্তার কোন বিবাদ বাধিলে নবাবের আদালতেই তাঁহার বিচার হইবে। ভ্যানসিটার্টের স্পষ্ট নিষেধ সত্ত্বেও কলিকাতা কাউসিল এই মীমাংসা গ্রহণ করিবার পূর্বেই নবাব তাঁহার কর্মচারীদিগকে এই বিষয় জানাইলেন এবং তদনুরূপ শুল্ক আদায় করিতে নির্দেশ দিলেন।
