মীরজাফরের দুর্বল শাসন, বাদশাহজাদার বিহার আক্রমণ ও নবাবী পরিবর্তনের সুযোগ লইয়া অনেক জমিদার বিদ্রোহী হইয়াছিলেন–মীর কাশিম ইংরেজ সৈন্যের সাহায্যে মোদিনীপুরের বিদ্রোহীদলকে দমন করিয়া বীরভূমের দিকে অগ্রসর হইলেন। বীরভূমের জমিদার আসাদ জামান খাঁ প্রায় বিশ হাজার পদাতিক ও পাঁচ হাজার ঘোড়সওয়ার লইয়া এক দুর্গম প্রদেশে আশ্রয় লইয়াছিলেন। কিন্তু অকস্মাৎ আক্রমণে তিনি সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হইয়া বশ্যতা স্বীকার করিলেন। বর্ধমানও সহজেই মীর কাশিমের পদানত হইল। মুঙ্গেরের নিকটবর্তী করকপুরের রাজা বিদ্রোহী হইয়া মুঙ্গেরের দিকে অগ্রসর হইয়াছিলেন কিন্তু ইংরেজ ও নবাবের সৈন্যেরা তাঁহাকে পরাজিত করিল। বীরভূম ও বর্ধমানের এই যুদ্ধে মীর কাশিম স্বয়ং সেনানায়ক ছিলেন। সুতরাং নবাবী সৈন্য যে ইংরেজ সৈন্যের তুলনায় কত অপদার্থ ও অকর্মণ্য তাহা তিনি প্রত্যক্ষ করিলেন। এই উপলব্ধির ফলে, এবং সম্ভবতঃ ইংরেজদের সহিত সংঘর্ষের অবশ্যম্ভাবিতা বুঝিতে পারিয়া তিনি অবিলম্বে তাঁহার সেনাদল ইউরোপীয় পদ্ধতিতে শিক্ষিত করিবার ব্যবস্থা করিলেন। এরূপ আমূল পরিবর্তন খুবই কষ্টকর ও সময়সাধ্য-সুতরাং তাঁহার তিন বৎসর রাজ্যকালের মধ্যে তিনি যে কতকটা কৃতকার্য হইয়াছিলেন, ইহাই তাঁহার কৃতিত্বের পরিচয়। সম্ভবতঃ তাঁহার এই নূতন সামরিক নীতি যথাসম্ভব ইংরেজদিগের নিকট হইতে গোপন রাখার জন্য তিনি মুর্শিদাবাদ হইত মুঙ্গেরে রাজধানী স্থানান্তরিত করিলেন। নানা উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করিয়া তিনি তাঁহার উদ্দেশ্য সাধনে ব্রতী হইলেন। মুঙ্গেরে পুরাতন দুর্গ সুসংস্কৃত হইল। ইউরোপীয় দক্ষ শিল্পীগণের উপদেশে ও নির্দেশে কর্মকুশল দেশীয় শিল্পকারগণ উকৃষ্ট কামান, বন্দুক, গুলি গোলা, বারুদ প্রভৃতি সামরিক উপকরণ প্রস্তুত করিতে লাগিল। উপযুক্ত সৈনিক ও কর্মচারীর অধীনে নবাবের সৈন্যদল ইউরোপীয় সামরিক পদ্ধতিতে শিক্ষিত হইল। কলিকাতার বিখ্যাত আমানী বণিক খোঁজা পির ভ্রাতা গ্রেগরী মীর কাশিমের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হইল। ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে গ্রেগরী বা ‘গরগিন খাঁ’ ‘গুরগন খাঁ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। গরগিন খা’ সেনাপতি হওয়ায় অনেক আর্মানী নবাবের সৈন্যদলে যোগদান করে এবং তিনি ভ্রাতা খোঁজা পিদ্রুর সাহায্যে গোপনে ইউরোপীয় অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করিবার ব্যবস্থা করেন।
নবাবের সৈন্যদল তিনভাগে বিভক্ত হয়–অশ্বারোহী, পদাতিক ও গোলান্দাজ। প্রথম বিভাগের নায়ক ছিলেন মুঘল সেনানায়কগণ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ আর্মানী, জার্মান, পর্তুগীজ ও ফরাসী নায়কদের অধীনে পরিচালিত হইত। ইহাদের মধ্যে আর্মানী মার্কার ও ফরাসী সমরু এই দুইজন বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। মার্কার ইউরোপে যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা এবং হল্যাণ্ডে যুদ্ধ করিয়াছিলেন। সমরুর প্রকৃত নাম ওয়ালটার রাইনহার্ড (Walter Reinhard)। ইনি ফরাসী জাহাজের নাবিক হইয়া ভারতে আসেন এবং সুমনের (Sumner) অথবা সোমার্স (Somers) নামে ফরাসী সৈন্যদলে ভর্তি হন। ইহা হইতেই সমরু নামের উৎপত্তি। তিনি পূর্বে ইংরেজ, ফরাসী, অযোধ্যার সফদরজঙ্গ ও সিরাজউদ্দৌলার অধীনে সেনানায়ক ছিলেন। ইহারা এবং আরো কয়েকজন দক্ষ সেনানায়ক মীর কাশিমের অধীনে ছিলেন।
এই শিক্ষিত সেনাদলের সাহায্যে মীর কাশিম বেতিয়া রাজ্য জয় করিয়া নেপাল রাজ্য আক্রমণ করিলেন। সম্মুখ যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াও গুপ্ত আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত হইয়া তিনি ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইলেন।
১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দের অগস্ট মাসে শাহ আলমের দ্বিতীয়বার বিহার আক্রমণের কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে। ঐ বৎসরই বর্ষাকাল শেষ হইলে শাহ আলম ফরাসী সৈন্য ও তাঁহাদের অধ্যক্ষ ল সাহেবকে সঙ্গে লইয়া তৃতীয়বার বিহার আক্রমণ করিলেন। ইংরেজ সৈন্যাধ্যক্ষ কারন্যাক তাঁহাকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করিয়া (১৫ই জানুয়ারী, ১৭৬১ খ্রী) ল ও ফরাসী সেনানায়কদের বন্দী করিলেন। শাহ আলম ইংরেজদের সহিত সন্ধির প্রস্তাব করিলে কারন্যাক গয়ায় গিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁহাকে সঙ্গে করিয়া পাটনায় লইয়া আসেন। এই সময়ে বাংলার নূতন নবাব মীর কাশিম বর্ধমানে ও বীরভূমে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি পাটনায় আসিয়া শাহ আলমের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। … …
শুল্কের ব্যাপার ছাড়াও কোম্পানীর কর্মচারীরা নবাবের প্রজার উপর নানা রকম উৎপীড়ন করিত। ঢাকার কর্মচারীরা ব্যক্তিগত আক্রোশ বশতঃ শ্রীহট্টে একদল সিপাহী পাঠাইয়া সেখানকার একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে বধ করিয়াছিলেন এবং স্থানীয় জমিদারকে জোর করিয়া ধরিয়া লইয়া গিয়া বন্দী করিয়াছিলেন। এইরূপ অত্যাচারের ফলে প্রজাগণ অনেক সময় গ্রাম ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হইত। ইংরেজের সঙ্গে কলহ বা যুদ্ধের আশঙ্কায় অত্যাচারী ইংরেজ কর্মচারীকে নিজে দণ্ড না দিয়া প্রজাদের দুরবস্থা সম্বন্ধে মীর কাশিম গর্ভনরের নিকট পুনঃ পুনঃ আবেদন করেন। ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দের ২৬শে মার্চ তারিখের চিঠির মর্ম এই–“কলিকাতা, কাশিমবাজার, পাটনা, ঢাকা প্রভৃতি সকল কুঠির ইংরেজ অধ্যক্ষ তাঁহাদের গোমস্তা ও অন্যান্য কর্মচারীসহ খাজনা আদায়কারী, জমিদার, তালুকদার প্রভৃতির মতন ব্যবহার করেন আমার কর্মচারীদের কোন আমলই দেন না। প্রতি জিলা ও পরগনায়, প্রতি গঞ্জে, গ্রামে কোম্পানীর গোমস্তা ও অন্যান্য কর্মচারিগণ তেল, মাছ, খড়, বাঁশ, ধান, চাউল, সুপারি এবং অন্যান্য দ্রব্যের ব্যবসা করে, এবং তাহারা কোম্পানীর দস্তক দেখাইয়া কোম্পানীর মতই। সকল সুযোগ-সুবিধা আদায় করে।” অন্যান্য পত্রে নবাব লেখেন যে “তাহারা বহু নূতন কুঠি নির্মাণ করিয়া ব্যবসা উপলক্ষে প্রজাদের উপর বহু অত্যাচার করে। তাহারা জোর করিয়া সিকি দামে দ্রব্য কেনে এবং আমার প্রজা ও ব্যবসায়ীদের উপর নানা অত্যাচার করে। কোম্পানীর দস্তক দেখাইয়া তাহারা শুল্ক দেয় না এবং ইহাতে আমার পঁচিশ লক্ষ টাকা লোকসান হয়। ইহার ফলে দেশের ব্যবসায়ীরা ও বহু প্রজা সর্বস্বান্ত হইয়া দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছে।”
