কলিকাতার কাউনসিল মীরজাফরকে এই সন্ধির শর্ত স্বীকার করাইবার জন্য গভর্নর ভ্যানসিটার্ট ও সৈন্যাধ্যক্ষ ক্যাইলোডকে একদল সৈন্যসহ মুর্শিদাবাদে পাঠাইলেন। পাছে নবাব কিছু সন্দেহ করেন, এইজন্য প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হইল যে ঐ সৈন্যদল পাটনায় যাইতেছে, কারণ বাদশাহ শাহ আলম পুনরায় বিহার আক্রমণ করিবেন এইরূপ সম্ভাবনা আছে।
ইতিমধ্যে মীরজাফরের দুরবস্থা চরমে পৌঁছিয়াছিল। ১৪ই জুলাই, ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার সৈন্যদল আবার বিদ্রোহী হয়, কোষাধ্যক্ষ ও অন্যান্য কর্মচারীদিগকে পাল্কী হইতে জোর করিয়া নামাইয়া নানারূপ লাঞ্ছনা করে, নবাবের প্রাসাদ ঘেরাও করে, নবাবকে গালাগালি করে এবং তাহাদের প্রাপ্য টাকা না দিলে নবাবকে মারিয়া ফেলিবে এইরূপ ভয় দেখায়। এই সঙ্কটের সময়েই মীর কাশিম তিন লক্ষ টাকা নগদ দিয়া এবং বাকী টাকার জামীন হইয়া অনেক কষ্টে গোলমাল থামাইয়া দেন। পাটনাতেও সৈন্যরা বিদ্রোহী হইয়া রাজবল্লভকে নানারূপ লাঞ্ছনা করে, তাঁহার বাড়ী ঘেরাও করে এবং তাঁহার জীবন বিপন্ন করিয়া তোলে। রাজকোষ শূন্য থাকায় বাংলার নবাব সৈন্যদলকে বেতন দিতে পারেন নাই, সুতরাং বাংলারাজ্য রক্ষা করিবার জন্য কোন সৈন্যই ছিল না এবং দুর্বল ও সহায়হীন নবাব পুত্তলিকার মত সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন, তাঁহার কোন ক্ষমতাই ছিল না। এদিকে তাঁহারই প্রদত্ত অর্থে পরিপুষ্ট ইংরেজ কোম্পানীর নিয়মিত বেতনভুক্ত সৈন্য সংখ্যা ছিল ১০০০ ইউরোপীয় এবং ৫০০০ ভারতীয়। সুতরাং ইংরেজ কোম্পানীকে বাধা। দিবার কোন সাধ্যই তাঁহার ছিল না।
তথাপি ১৪ই অক্টোবর যখন ভ্যানসিটার্ট মুর্শিদাবাদে নবাবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া মীর কাশিমের সহিত সন্ধি অনুযায়ী বন্দোবস্ত করিবার প্রস্তাব করিলেন, মীরজাফর কিছুতেই সম্মত হইলেন না। পাঁচদিন ধরিয়া কথাবার্তা চলিল–ইংরেজ গভর্নর মীরজাফরকে রাজ্যের বর্তমান অবস্থার পরিণাম বর্ণনা করিয়া নানারূপ ভয় দেখাইলেন কিন্তু কোন ফল হইল না। অবশেষে ২০শে অক্টোবর প্রাতঃকালে ক্যাইলোড ও মীর কাশিম একদল সৈন্য লইয়া মুর্শিদাবাদে নবাবের প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া গভর্নরের পত্র নবাবের নিকট পাঠাইলেন। ইহার সারমর্ম এই : “আপনার বর্তমান পরামর্শদাতাদের হাতে ক্ষমতা থাকিলে অচিরেই আপনার নিজের ও কোম্পানীর সর্বনাশ হইবে। দুই তিনটি লোকের জন্য আমাদের উভয়ের এইরূপ সর্বনাশ হইবে, ইহা বাঞ্ছনীয় নহে। সুতরাং আমি কর্নেল ক্যাইলোডকে পাঠাইতেছি–তিনি আপনার কুপরামর্শদাতাদিগকে তাড়াইয়া রাজ্যশাসনের সুবন্দোবস্ত করিবেন।”
নবাব এই চিঠি পাইয়া বিষম ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত হইলেন এবং ইংরেজকে বাধা দিবার সঙ্কল্প করিলেন। কিন্তু ঘণ্টা দুই পরেই নবাবের মাথা ঠাণ্ডা হইল এবং তিনি মীর কাশিমকে নবাবী পদ গ্রহণ করিতে আহ্বান করিলেন। তারপর তিনি ক্যাইলোডকে বলিলেন যে তাঁহার জীবন রক্ষার দায়িত্ব তাঁহার (ক্যাইলোডের) হাতেই রহিল। ভ্যানসিটার্ট বলিলেন যে শুধু তাঁহার জীবন কেন, তিনি ইচ্ছা করিলে তাঁহার রাজ্যও নিরাপদে রাখিতে পারেন, কারণ তাঁহাকে রাজ্যচ্যুত করিবার কোনরূপ অভিসন্ধি চাহাদের নাই। মীরজাফর বলিলেন, “আমার রাজ্যের সখ মিটিয়াছে। আর থাকিলে মীর কাশিমের হাতে আমার জীবন বিপন্ন হইবে, সুতরাং কলিকাতায় বাসের ব্যবস্থা করিলে আমি সুখে শান্তিতে থাকিতে পরিব।” ২২শে অক্টোবর মীরজাফর একদল ইংরেজ সৈন্য পরিবৃত হইয়া কলিকাতা যাত্রা করিলেন। মীর কাশিম বাংলার নবাব হইলেন।
মীর কাশিম নবাব হইয়া দেখিলেন যে রাজকোষে মণি-মরকতাদি ও নগদ মাত্র ৪০ কি ৫০ হাজার টাকা আছে। তিনি সব মণিরত্ন বিক্রয় করিলেন। ইহা ছাড়া প্রায় তিন লাখ টাকার সোনা ও রূপার তৈজসপত্র ছিল, এগুলি গালাইয়া টাকা ও মোহর তৈরি হইল। কিন্তু ইংরেজকে ইহা অপেক্ষা অনেক বেশি টাকা দিবার শর্ত ছিল–সুতরাং তিনি তাঁহার ব্যক্তিগত তহবিল হইতে অনেক টাকা দিলেন। নবাবী পাইবার দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনি ইংরেজ সৈন্যের ব্যয়নির্বাহের জন্য নগদ দশ লক্ষ টাকা দিলেন এবং মাসিক এক লক্ষ টাকা কিস্তিতে আরও দশ লক্ষ টাকা দিতে প্রতিশ্রুত হইলেন। পাটনার সৈন্যের জন্য আরও পাঁচ লক্ষ টাকা দিতে হইল। সন্ধির শর্তম, বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম এই তিন জিলার রাজস্ব কোম্পানীর হস্তগত হইল। ইহা ছাড়া কোম্পানীর বড় বড় কর্মচারীকে টাকা দিতে হইল। গভর্নর ভ্যানসিটার্ট পাইলেন পাঁচ লক্ষ, ক্যাইলোড় দুই লক্ষ, এবং আরও পাঁচজন পদানুযায়ী মোটা টাকা পাইলেন। এই সাতজন কর্মচারী পাইলেন ১৭,৪৮,০০০ এবং সৈন্যদের জন্য নগদ ১৫ লক্ষ টাকা লইয়া মোট ৩২,৪৮,০০০ টাকা মীর কাশিমকে দিতে হইল।
মীর কাশিমের সৌভাগ্যক্রমে কলিকাতা কাউন্সিলের ‘বিশিষ্ট সমিতির সদস্যরাই তখন কেবল তাঁহার সহিত গোপন বন্দোবস্তের কথা জানিতেন। সুতরাং কাউন্সিলের অপরাপর সদস্যেরা টাকার ভাগ কিছুই পাইলেন না। অতএব তাঁহারা সাধারণ লোকের ন্যায় মীরজাফরকে অপসারণ করিয়া মীর কাশিমকে নবাব করা অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ বলিয়া মত প্রকাশ করিলেন।
মসনদে বসিবার জন্য মীর কাশিমকে বহু অর্থ ব্যয় করিতে হইয়াছিল। সুতরাং নানা উপায়ে তিনি অর্থ সংগ্রহে প্রবৃত্ত হইলেন। মীরজাফরের কয়েকজন অনুচর তাঁহার অনুগ্রহে নিতান্ত নিম্নশ্রেণীর ভৃত্য হইতে রাজস্বসংক্রান্ত উচ্চ পদে নিযুক্ত হইয়া বহু অর্থ সঞ্চয় করিয়াছিল। মীর কাশিম ইহাদিগকে এবং ইহাদের অধীনস্থ কর্মচারীদিগকে পদচ্যুত ও কারারুদ্ধ করিয়া তাহাদের যথাসর্বস্ব রাজ-সরকারে বাজেয়াপ্ত করিলেন। তিনি প্রায় সকল কর্মচারীরই হিসাব-নিকাশ তলব করিলেন এবং ইহার ফলে বহু লোকের সর্বনাশ হইল। বহু অভিজাত সম্প্রদায়ের লোক এমন কি আলীবর্দীর পরিবারবর্গও নানা কল্পিত মিথ্যা অপরাধের ফলে সর্বস্ব নবাবকে দিতে বাধ্য হইয়া পথের ফকীর হইলেন। এইরূপ নানাবিধ উপায়ে অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় সংক্ষেপ করিয়া মীর কাশিম রাজকোষ পরিপুষ্ট করিলেন এবং ইংরেজের ঋণ অনেকটা পরিশোধ করিলেন।
