কলিকাতার ইংরেজ কাউসিল কিন্তু এই সমস্ত অভিযোগের বিষয় বিবেচনা করিয়া ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে নন্দকুমারকে বন্দী করিয়া কলিকাতায় পাঠাইলেন। তাঁহাকে তাঁহার নিজের বাড়ীতেই নজরবন্দী করিয়া রাখা হইল এবং শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে তাঁহার কোন হাত রহিল না। কিছুদিন পরে তিনি আবার ইংরেজদের অনুগ্রহ লাভে সমর্থ হইয়াছিলেন।
নন্দকুমার ইংরেজকে তাড়াইবার জন্য ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন–এই অভিযোগের সত্যতার উপর নির্ভর করিয়া বর্তমান যুগে কেহ কেহ তাঁহাকে দেশপ্রেমিক বলিয়া অভিহিত করেন এবং দশ বৎসর পরে ইংরেজ আদালতে তাঁহার প্রাণদণ্ড হইয়াছিল বলিয়া তাহাকে দেশের প্রথম শহীদ বলিয়া সম্মান দিয়া থাকেন। বলা বাহুল্য তাঁহার প্রাণদণ্ড হইয়াছিল জাল করিবার অভিযোগে– ইংরেজকে তাড়াইবার প্রসঙ্গমাত্রও সেই বিচারের সময় কেহ উচ্চারণ করে নাই। তাঁহার প্রাণদণ্ড ন্যায় হইয়াছিল কি অন্যায় হইয়াছিল এ সম্বন্ধে তাঁহার মৃত্যুর পর দেড়শত বৎসর পর্যন্ত বহু বিতর্ক হইয়াছে। এবং এখনও সন্দেহের যথেষ্ট অবসর আছে। কিন্তু এই সুদীর্ঘকাল মধ্যে কেহ কল্পনাও করে নাই যে তিনি দেশের জন্য প্রাণ দিয়াছিলেন। কারণ ইংরেজ তাড়াইবার অভিযোগ কতদূর সত্য তাহা বলা কঠিন এবং সত্য হইলেও তাঁহার উদ্দেশ কি ছিল আজ তাহা জানিবার কোন উপায় নাই। তিনি স্বীয় প্রভু সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে চক্রান্ত করিয়াছিলেন, তারপর মীরজাফরের স্বপক্ষে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন, এবং মীরজাফরের বিপক্ষে মীর কাশিমের সহিত ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন। অতএব স্বভাবতই তিনি যে স্বার্থ সাধনের জন্য চক্রান্ত করিয়াছিলেন এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত নহে। সুতরাং ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁহার চক্রান্ত নিছক স্বদেশপ্রেম অথবা নিজের স্বার্থসিদ্ধির উপায়মাত্র তাহা কেহই বলিতে পারে না এবং তিনি সত্যই ইংরেজকে তাড়াইতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলেন কিনা, তাহাও নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না।
নবাব মীরজাফর যে অযোগ্য ও অপদার্থ ছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তাঁহার দেশদ্রোহিতার ফলেই যে বাংলা দেশ তথা ভারতবর্ষ ইংরেজের অধীন হইল এই অভিযোগ পুরাপুরি সত্য নহে। রাজ্যলাভের জন্য প্রভুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-ইহা তখন অনেকেই করিত। তাঁহার পূর্বে আলীবর্দী এবং তাঁহার পরে মীর কাশিম উভয়েই ইহা করিয়াছিলেন। মীরজাফর যখন ইংরেজের সাহায্য লাভের জন্য ষড়যন্ত্র করেন তখন তাঁহার পক্ষে ইহা কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল যে ইহার ফলে ইংরেজরা বাংলা দেশের সর্বময় কর্ত্তা হইবে।
৭
মীর কাশিম
মীরজাফরের অযোগ্যতা ও অকর্মণ্যতায় ইংরেজ কোম্পানী তাঁহার প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁহার পুত্র মীরন ইংরেজদের প্রতি বিরূপ ছিলেন এবং ইংরেজরা ইহা জানিত। কিন্তু মীরন কার্যক্ষম এবং পিতার প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন। নবাবের উপর তাঁহার প্রভাবও খুব বেশি ছিল। অকস্মাৎ বজ্রাঘাতে মীরনের মৃত্যু হইল (৩রা জুলাই, ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দ)। ইংরেজরা এই ঘটনার সুযোগ লইয়া নবাবের উপর তাহাদের আধিপত্য আরও কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল।
যদিও মীরজাফর ইংরেজ কোম্পানী ও ইংরেজ কর্মচারীদিগকে বহু অর্থ। দিয়াছিলেন–তথাপি তাহাদের দাবি মিটিল না। ওদিকে রাজকোষ শূন্য। সুতরাং মীরজাফরের আর টাকা দিবার সাধ্য ছিল না; নূতন ইংরাজ গর্ভনর ভ্যানসিটার্ট প্রস্তাব করিলেন যে চট্টগ্রাম জিলা কোম্পানীকে ইজারা দেওয়া হউক কিন্তু মীরজাফর ইহাতে কিছুতেই সম্মত হইলেন না। নবাবের জামাতা মীর কাশিমের হাতে অনেক টাকা ছিল, এবং যখন মীরজাফরের সৈন্যরা বিদ্রোহ করে তখন তিনিই টাকা দিয়া তাহা মিটাইয়া দেন। মীরনের মৃত্যুর পর নবাবের উত্তরাধিকারী কে হইবে, এই প্রশ্ন উঠিলে দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়াইল। প্রথম মীরনের পুত্র। মীরনের দিওয়ান রাজবল্ল খুব ধনী ছিলেন এবং পূর্ব হইতেই ইংরেজের বন্ধু ছিলেন। তিনি মীরনের পুত্রের পক্ষে থাকায় একদল ইংরেজ তাঁহাকে সমর্থন করিলেন। আর এক দল কাশিমের দাবি সমর্থন করিলেন। রাজবল্লভ ও মীর কাশিম উভয়েই অর্থশালী ও ইংরেজের অনুগত; সুতরাং মীরজাফরের হাত হইতে প্রকৃত ক্ষমতা কাড়িয়া লইয়া ইহাদের যে কোন একজনের হাতে দেওয়া ইংরেজের প্রধান চেষ্টার বিষয় হইল। মীরজাফর প্রথমে মীরনের পুত্র এবং মীর কাশিম উভয়ের স্বপক্ষেই মত দিলেন কিন্তু একজনকে মনোনীত করিতে ইতস্তত করিলেন–পরে যখন বুঝিলেন যে মীর কাশিম ও রাজবল্লভ দুইজনই ইংরেজের অনুগৃহীত–তখন এই দুইজনকেই বাদ দিয়া মীর্জা দাউদ নামক এক তৃতীয় ব্যক্তির হাতেই আপাতত সমস্ত ক্ষমতা দিতে মনস্থ করিলেন।
১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে ভ্যান্সিটার্ট ইংরেজ কোম্পানীর কলিকাতা প্রেসিডেন্সির গভর্নর হইয়া আসিলেন। তিনি মীর কাশিমের পক্ষ লইলেন এবং কলিকাতার কাউনসিল তাঁহার সঙ্গে বন্দোবস্ত করিবার ভার গভর্নরের উপর দিলেন। মীর কাশিম বলিলেন যে, নবাবের বর্তমান পরামর্শদাতাদিগকে সরাইয়া যদি তাঁহার উপর শাসনের সকল দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দেওয়া হয় তাহা হইলে তিনি কোম্পানীকে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করিতে পারেন, কিন্তু বলপ্রয়োগ ভিন্ন নবাব কিছুতেই এই বন্দোবস্তে রাজী হইবেন না। অতঃপর ভ্যানসিটার্ট ও মীর কাশিমের মধ্যে অনেক গোপন পরামর্শ চলিল। ইহার ফলে মীর কাশিম ও ইংরেজদের মধ্যে এই শর্তে এক সন্ধি হইল যে, মীরজাফর নামে নবাব থাকিবেন–কিন্তু মীর কাশিম নায়েব সুবাদার হইবেন এবং শাসন সংক্রান্ত সকল বিষয়েই তাঁহার পুরাপুরি কর্তৃত্ব থাকিবে। ইংরেজরা প্রয়োজন হইলে মীর কাশিমকে সৈন্য দিয়া সাহায্য করিবেন-এবং ইহার ব্যয় নির্বাহার্থে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম এই তিন জিলা ইংরেজদিগকে ‘ইজারা বন্দোবস্ত’ করিয়া দিবেন। ইংরেজের প্রাপ্য টাকা কিস্তিবন্দী করিয়া শোধ দেওয়া হইবে।
