২১শে নভেম্বর, ১৭৫৯ খ্রীস্টাব্দে ওলন্দাজরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল এবং ৭০০ ইউরোপীয় এবং প্রায় ৮০০ মলয় সৈন্য জাহাজ হইতে নামাইল। ক্লাইব এই সংবাদ পাইয়া ফোর্ডের অধীনে একদল সৈন্য পাঠাইলেন। চন্দননগর ও চুঁচুড়ার মাঝামাঝি বেদারা নামক স্থানে দুই দলে যুদ্ধ হইল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই ওলন্দাজেরা সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হইয়া ২৫শে নভেম্বর বশ্যতা স্বীকার করিল।
তৎকালীন ইংরেজদের মধ্যে সকলেরই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে মীরজাফর ওলন্দাজদের সঙ্গে গোপনে ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন। ইহার স্বপক্ষে প্রধান যুক্তি ছিল দুইটি। প্রথমত, মীরজাফরের সহায়তায় ভরসা না থাকিলে তাহারা কখনও ইংরেজের সহিত যুদ্ধ করিতে ভরসা পাইত না-এবং ওলন্দাজ কোম্পানী তাহাদের কর্তৃপক্ষের নিকট চিঠিতে স্পষ্টই এইরূপ সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা জানাইয়াছিলেন। দ্বিতীয়ত, মীরজাফরের দরবারের একদল অমাত্য যে ওলন্দাজদের সাহায্যে বাংলার ইংরেজদিগের প্রভাব খর্ব করিয়া নবাবের স্বাধীনভাবে রাজত্ব করিবার ব্যবস্থা করিতে বিশেষ ইচ্ছুক ছিলেন এবং এই দলে যে মীরন, রামনারায়ণ প্রভৃতিও ছিলেন, এরূপ মনে করিবার কারণ আছে।
মীরজাফরের স্বপক্ষেও দুইটি প্রবল যুক্তি আছে। প্রথমত, সন্দেহ থাকিলেও ইংরেজরা মীরজাফরের বিরুদ্ধে কোন নিশ্চিত প্রমাণ পায় নাই। পাইলে মীরজাফরের প্রতি তাহাদের ব্যবহার অন্যরূপ হইত। দ্বিতীয়ত, ১৭৫৯ খ্রীষ্টাব্দের ২২শে অক্টোবর–অর্থাৎ সৈন্যবোঝাই ওলন্দাজ জাহাজগুলি বাংলা দেশে পৌঁছিবার পর-কলিকতার কাউসিল বিলাতের কর্তৃপক্ষকে এই বিষয় চিঠিতে জানাইয়া, সঙ্গে সঙ্গে লিখিয়াছেন যে নবাব এ বিষয়ে কিছু জানিতেন না এবং তিনি ইহাতে ওলন্দাজদের প্রতি বিষম ক্রুদ্ধ হইয়াছেন।
কোন কোন ইংরেজ লিখিয়াছেন যে মীরজাফর মহারাজা রাজবল্লভের সাহায্যে ওলন্দাজদিগের সহিত গোপনে ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন। অনেক ইংরেজের এরূপ ধারণাও ছিল যে মহারাজা নন্দকুমারের চক্রান্তেই বর্ধমান, বীরভূম ও অন্যান্য স্থানের জমিদারগণ ও খাদিম হোসেন খান বিদ্রোহ করিয়াছিলেন এবং শাহজাদা ও মারাঠা শিবভউ বাংলা দেশ আক্রমণ করিয়াছিলেন। বর্তমানকালে অনেকের বিশ্বাস, এই সকলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজদের অধীনতাপাশ হইতে বাংলা দেশকে মুক্ত করা এবং এইজন্য নন্দকুমার স্বদেশভক্তরূপে সম্মানের পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন। সুতরাং নন্দকুমারের সম্বন্ধে যেটুকু তথ্য জানিতে পারা যায় তাঁহার আলোচনা প্রয়োজন।
নন্দকুমার যে সিরাজউদ্দৌলার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া ইংরেজদিগকে চন্দননগর অধিকার করিতে সাহায্য করিয়াছিলেন, তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। সুতরাং সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর নন্দকুমার ইংরেজ ও মীরজাফর উভয়েরই প্রিয়পাত্র হইয়া নিজের উন্নতিসাধন করিতে সমর্থ হইলেন। মীরজাফর যখন সিংহাসনচ্যুত হইলেন তখন নন্দকুমার তাঁহার বিশেষ অন্তরঙ্গ ও বিশ্বাসভাজন হইলেন। ইংরেজ লেখকগণের মতে অতঃপর নন্দকুমার নানা উপায়ে ইংরেজ কোম্পানীর অনিষ্টসাধন চেষ্টা করিতে লাগিলেন। গভর্নর ভ্যানসিটার্ট নন্দকুমারের বাড়ী হইতে প্রাপ্ত কতকগুলি গোপনীয় পত্রের সাহায্যে শাহজাদা এবং পণ্ডিচেরীর ফরাসী কর্তৃপক্ষের সহিত ইংরেজের বিরুদ্ধে তাঁহার চক্রান্তের বিষয় কাউনসিলের নিকট উপস্থিত করিয়া তাহাকে নিজের বাড়ীতে নজরবন্দী করিয়া রাখিলেন। কিন্তু যে কোন উপায়েই হউক, নন্দকুমার ৪০ দিন পরে মুক্ত হইলেন।
ইংরেজরা যখন মীর কাশিমের সহিত যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া মীরজাফরকে আবার নবাব করিবার প্রস্তাব করিলেন, তখন মীরজাফর যে কয়েকটি শর্তে এই পদ গ্রহণে রাজী হইলেন তাঁহার একটি শর্ত এই যে নন্দকুমার তাঁহার দিওয়ান হইবেন এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেই সঙ্কটকালে ইংরেজেরা ইহাতে রাজী হইলেন।
ইংরেজ লেখকরা বলেন যে দিওয়ান হইবার পরও নন্দকুমার ইংরেজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন। মীর কাশিমের সহিত তিনি এই বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন যে তিনি ইংরেজ সৈন্যের সমস্ত সংবাদ মীর কাশিমকে জানাইবেন–মীর কাশিম পুনরায় নবাব হইলে নন্দকুমারকে দিওয়ানের পদ দিবেন। এতদ্ব্যতীত তিনি কাশীর রাজা বলবন্ত সিংহকে ইংরেজের পক্ষ ত্যাগ করিয়া তাহাদর বিরুদ্ধে শুজাউদ্দৌল্লার সঙ্গে যোগ দিবার জন্য প্ররোচিত করিয়াছিলেন। এই দুইটি অভিযোগ সম্বন্ধে গভর্নর ভ্যাটসিটার্ট বহু অনুসন্ধানের ফলে যে সমুদয় প্রমাণ সংগ্রহ করিয়াছিলেন, তাহাতে ইহার সত্যতা সম্বন্ধে বিশেষ কোন সন্দেহ থাকে না।
নন্দকুমারের বিরুদ্ধে তৃতীয় অভিযোগ এই যে তিনি শুজাউদ্দৌল্লাকে লিখিয়াছিলেন যে, তিনি যদি ইংরেজদিগকে বাংলা দেশ হইতে তাড়াইতে পারেন, তবে তিনি তাঁহাকে এক কোটি টাকা এবং বিহার প্রদেশ দিবেন। শুজাউদ্দৌল্লা রাজী না হওয়ায় তিনি কয়েক লক্ষ টাকাসহ একজন উকীল পাঠাইয়াছিলেন এবং শুজাউদ্দৌল্লা রাজী হইয়াছিলেন। এই অভিযোগ সম্বন্ধে বিশ্বস্ত কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। তবে মীরজাফর যে শুজাউদ্দৌল্লাকে মীর কাশিমের পক্ষ ত্যাগ করাইয়া তাঁহার সঙ্গে যোগ দেওয়াইবার জন্য বহু চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং কতকটা সফলও হইয়াছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। সুতরাং নন্দকুমারের বিরুদ্ধে তৃতীয় অভিযোগ মীরজাফরের আচরণ দ্বারা সমর্থিত হয় না। আর মীরজাফরের অজ্ঞাতসারে এবং বিনা সমর্থনে যে নন্দকুমার এক কোটি টাকা ও বিহার প্রদেশ শুজাউদ্দৌল্লাকে দিবার প্রস্তাব করিবেন, ইহা বিশ্বাসযোগ্য নহে। পূর্ব-অভিজ্ঞতার পরে মীরজাফরও যে ইংরেজদিগকে তাড়াইবার জন্য ষড়যন্ত্র করিবেন, খুব বিশ্বস্ত প্রমাণ না থাকিলে সত্য বলিয়া গ্রহণ করা উচিত নহে।
