বাদশাহ শাহ আলমের আক্রমণের সুযোগ লইয়া মারাঠা সেনানায়ক শিবভট্ট বৃহৎ একদল সৈন্যসহ কটক আক্রমণ করিলেন। ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দের আরম্ভে তিনি মেদিনীপুর অধিকার করিলেন। বীরভূমের জমিদারও তাঁহার সঙ্গে যোগ দিলেন। মীরজাফর তখন ইংরেজ সৈন্যের সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। ইংরেজ সৈন্য অগ্রসর হইবামাত্র শিবভট্ট বিনা যুদ্ধে বাংলা দেশ হইতে প্রস্থান করিলেন।
এই সময়ে পূর্ণিয়ার নায়েব নাজিম খাদিম হোসেন খানও বিদ্রোহী হইয়া শাহ আলমের সঙ্গে যোগ দিবার জন্য অগ্রসর হইয়াছিলেন। মীরন ও ক্যাইলোড দুই সেনাদল লইয়া তাঁহাকে বাধা দানের জন্য অগ্রসর হইলেন। ১৬ই জুন খাদিম হোসেন খান পরাজিত হইয়া পলায়ন করিলেন এবং নবাবের সৈন্য তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিল। কিন্তু ৩রা জুলাই অকস্মাৎ শিবিরে বজ্রাঘাতে মীরনের মৃত্যু হওয়ায় নবাবসৈন্য ফিরিয়া আসিল।
এইরূপে ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দে শাহ আলম ও শিবভট্টের আক্রমণ এবং খাদিম হোসেনের বিদ্রোহ বাংলা দেশকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু ইংরেজ সৈন্যের সহায়তায় মীরজাফর এই তিনটি বিপদ হইতেই উদ্ধার পাইলেন।
কিন্তু অচিরেই আর এক বিপদ উপস্থিত হইল। ইংরেজ ও ফরাসীদের ন্যায় ওলন্দাজরাও বাংলায় বাণিজ্য করিত এবং হুগলির নিকটবর্তী চুঁচুড়ায় তাহাদের বাণিজ্য-কুঠি ছিল। মীরজাফরকে নবাবী পদে প্রতিষ্ঠা করিয়া ইংরেজদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বাড়িয়া যাওয়ায় ওলন্দাজেরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইল এবং মীরজাফরকে নবাবের উপযুক্ত মর্যাদা দেখাইল না। নবাব ওলন্দাজ কর্তৃপক্ষের নিকট জবাবদিহি দাবি করিলেন। কিন্তু তাহারা ত্রুটি স্বীকার না করিয়া লম্বা এক দাবি-দাওয়ার ফর্দ পেশ করিল। ক্লাইবের পরামর্শমত নবাব ওলন্দাজদের বাণিজ্য বন্ধ করিবার পরওয়ানা বাহির করিবামাত্র ওলন্দাজরা মীরজাফরের প্রাপ্য সম্মান দিল।
কিন্তু ইংরেজদের সহিত ওলন্দাজদের গোলমাল মিটিল না। একে তো ইংরেজরা বিনা শুল্কে বাণিজ্যের বিশেষ সুবিধা পাইত, তারপর মীরজাফরের নিকট হইতে তাহারা আরও কতকগুলি অধিকার লাভ করিয়াছিল। ইহার বলে ওলন্দাজদের যত জাহাজ গঙ্গা দিয়া যাইত, ইংরজেরা তাহা খানাতল্লাসী করিত এবং ইংরেজ ভিন্ন অন্য কোন জাতির লোককে জাহাজের চালক (pilot) নিযুক্ত করিতে দিত না। ইহার ফলে ওলন্দাজদের বাণিজ্য অনেক কমিয়া যাইতে লাগিল। উপায়ান্তর না দেখিয়া ওলন্দাজরা ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধ করা স্থির করিল এবং এই উদ্দেশ্যে তাহাদের শক্তির প্রধান কেন্দ্র হইতে বহু সৈন্য আনাইবার ব্যবস্থা করিল। ১৭৫৯ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে ইউরোপীয় ও মলয় সৈন্য বোঝাই ছয় সাতখানি জাহাজ গঙ্গায় পৌঁছিল। মীরজাফর তখন কলিকাতায় ছিলেন। তিনি ওলন্দাজদিগকে বাংলা দেশ হইতে তাড়াইবার প্রস্তাব করিলেন। ইংরেজরা ইহাতে সম্মত হইল না, কারণ ইউরোপে ইংরেজ ও ওলন্দাজদের মধ্যে পূর্ণ শান্তি বিরাজ করিতেছিল। তাহারা নবাবকে অনুরোধ করিল যেন তিনি ওলন্দাজদিগকে ইংরেজদের বিরুদ্ধতা হইতে নিবৃত্ত করেন। তদনুসারে নবাব কলিকাতা হইতে মুর্শিদাবাদে যাইবার পথে হুগলি ও কুঁচুড়ার মাঝামাঝি এক জায়গায় দরবারের আয়োজন করিয়া ওলন্দাজদিগকে উপস্থিত হইতে আদেশ দিলেন। দরবারে ওলন্দাজ কর্তৃপক্ষেরা নবাবকে বুঝাইতে চেষ্টা করিল যে ইংরেজরাই তাঁহার দুর্বলতা ও দেশের দুর্দশার কারণ এবং তাঁহার অনুগ্রহ পাইলে তাহাকে তাহারা এই বিপদ হইতে উদ্ধার করিতে পারে। নবাবকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া তাহারা ভরসা পাইল এবং প্রার্থনা করিল যে নবাব তাহাদিগের সেনাদলকে আসিতে দিবেন এবং ইংরেজরা যাহাতে কোন বাধা না দেয় তাহারা ব্যবস্থা করিবেন। নবাব ইহাতে আপত্তি করায় তাহারা বলিল যে সৈন্যবোঝাই জাহাজগুলি শীঘই ফেরৎ পাঠানো হইবে। ইহাতে খুশি হইয়া নবাব তাহাদিগকে সংবর্ধনা করিলেন এবং তাহাদের বাণিজ্যের সুবিধা করিয়া দিতে প্রতিশ্রুত হইলেন।
কিন্তু নবাব চলিয়া যাইবার পরই ওলন্দাজরা এমন ভাব দেখাইল যে নবাব তাহাদিগকে সৈন্যবোঝাই জাহাজ আনিতে অনুমতি দিয়াছেন। তাহারা জাহাজগুলি আনিবার ও নূতন সৈন্য সগ্রহের ব্যবস্থা করিতে লাগিল।
ইহাতে ইংরেজদের সন্দেহ হইল যে নবাব তলে তলে ওলন্দাজদের সহায়তা করিতেছিলেন। অনেক ইংরেজের দৃঢ় বিশ্বাস হইল যে নবাবই গোপনে ওলন্দাজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করিয়া সৈন্য আনার ব্যবস্থা করিয়াছেন। ক্লাইবও নবাবকে এক কড়া চিঠি লিখিলেন যে ওলন্দাজদের সহিত মিত্ৰতা করিলে ভবিষ্যতে তিনি মীরজাফরের সহিত কোন সম্বন্ধ রাখিবেন না। নবাব প্রতিবাদ করিয়া জানাইলেন যে ইংরেজের সহিত বন্ধুত্বের প্রমাণ দিতে তিনি সর্বদাই প্রস্তুত আছেন। ক্লাইব তাঁহাকে সসৈন্যে ইংরাজদিগের সঙ্গে মিলিত হইবার আমন্ত্রণ করিলেন। নবাব লিখিলেন যে কলিকাতা হইতে মুর্শিদাবাদে যাতায়াতের ফলে তিনি বড় ক্লান্ত, সুতরাং নিজে না যাইয়া পুত্রকে পাঠাইবেন।
ইতিমধ্যে ওলন্দাজেরা ইংরেজদের সাতখানি জাহাজ আটক করিল এবং ফলতায় নামিয়া ইংরেজের নিশান ছিঁড়িয়া ফেলিয়া ঘর বাড়ী জ্বালাইয়া দিল। ক্লাইব ভাবিলেন যে নবাবের সহায়তা না থাকিলে ওলন্দাজেরা এতদূর সাহস করিত না। সুতরাং তিনি নবাবকে লিখিলেন যে তাঁহার পুত্র বা সৈন্য পাঠাইবার প্রয়োজন নাই। কিন্তু তিনি যদি সত্যসত্যই ইংরেজের বন্ধু হন তবে ওলন্দাজদিগের যেভাবে যতদূর সম্ভব অনিষ্ট করিবেন। নবাব তৎক্ষণাৎ রামনারায়ণকে আদেশ দিলেন যেন ওলন্দাজদের পাটনার কুঠি অবরোধ করা হয় এবং তাহাদের নানা ভাবে উৎপীড়ন করা হয়। তাঁহার পরামর্শদাতাদের অনেকেই তাঁহাকে ওলন্দাজদের বিরুদ্ধে যাইতে নিষেধ করিল, কিন্তু মীরজাফর তাহাদের কথায় কর্ণপাত করিলেন না এবং হুগলিতে ওলন্দাজদের বাণিজ্য বন্ধ করিবার জন্য ফৌজদারের নিকট পরওয়ানা পাঠাইলেন। ইংরেজরা ওলন্দাজদের বরাহনগরের কুঠি দখল করিলেন। তাহারা নবাবের নিকট নালিশ করিল, কিন্তু কোন ফল হইল না।
