এই সমুদয় বিদ্রোহ থামিতে না থামিতেই মীরজাফরের সৈন্যদল বিদ্রোহ করিল। তাহাদের অনেক বেতন বাকী ছিল সুতরাং তাহারা পুনঃ পুনঃ ইহা পরিশোধ করিবার জন্য নবাবের নিকট আবেদন করিল। নবাব ক্রুদ্ধ হইয়া অনেক সৈন্য বরখাস্ত করিলেন। ইহার ফলে সৈন্যরা তাঁহার প্রাসাদ অবরোধ করিল। নবাবের দুর্ব্যবহারে বিহারের দুইজন জমিদার সুন্দর সিংহ ও বলবন্ত সিংহ বিদ্রোহ করিলেন।
ইতিমধ্যে আর এক গুরুতর সংকট উপস্থিত হইল। এই সময়ে দিল্লির সাম্রাজ্য নামেমাত্র পর্যবসিত হইয়াছিল। দিল্লির নামসর্বস্ব বাদশাহ দ্বিতীয় আলমগীর মাত্র দিল্লি ও তাঁহার চতুর্দিকে সামান্য ভূখণ্ডে রাজত্ব করিতেন কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল তাঁহার উজীরের হস্তে। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে আফগান সুলতান আহমদ শাহ আবদালী দিল্লি আক্রমণ করিলেন এবং উজীর গাজীউদ্দীন ইমাদ্-উল-মুলক আত্মসমর্পণ করিলেন (জানুয়ারী, ১৭৫৭ খ্রী)। আবদালী রুহেলা নায়ক নাজীবউদ্দৌল্লাকে দিল্লিতে তাঁহার প্রতিনিধি হিসাবে রাখিয়া প্রস্থান করিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে আবদালীর এই আক্রমণে ভীত হইয়াই সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদিগের সহিত ফেব্রুয়ারী মাসে সন্ধি করিয়াছিলেন।
আবদালীর প্রস্থানের পরই মারাঠাগণ দিল্লি আক্রমণ করিল (অগস্ট, ১৭৫৭ খ্রী) এবং নাজীবউদ্দৌল্লাকে সরাইয়া আবার গাজীউদ্দীনকে উজীর নিযুক্ত করিল। গাজীউদ্দীন বাদশাহ ও তাঁহার পুত্র (বাদশাহজাদা) উভয়ের সঙ্গেই খুব দুর্ব্যবহার করিতেন। তাঁহার হাত হইতে পরিত্রাণ লাভের জন্য বাদশাহজাদা দিল্লি হইতে পলায়ন করিয়া নাজীবউদ্দৌল্লার আশ্রয় গ্রহণ করিলেন (মে, ১৭৫৮ খ্রীষ্টাব্দ)। বাদশাহ দ্বিতীয় আলমগীর তাঁহার পুত্রকে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার সুবাদার নিযুক্ত করিয়াছিলেন। বাংলার নবাব পরিবর্তন এবং আভ্যন্তরিক অসন্তোষ ও বিদ্রোহের সুযোগে অকর্মণ্য মীরজাফরকে পদচ্যুত করিয়া বাংলার মসনদে বাদশাহজাদাকে বসাইবার জন্য এলাহাবাদের সুবাদার মুহম্মদ কুলী খান ও অযোধ্যার নবাব শুজাউদ্দৌল্লা বাদশাহজাদাকে সম্মুখে রাখিয়া বিহার আক্রমণ করিতে মনস্থ করিলেন। পূর্ব্বোক্ত বিহারের বিদ্রোহী জমিদার দুইজনও তাঁহাদের সঙ্গে যোগ দিলেন।
এই আক্রমণের সংবাদে মীরজাফর অত্যন্ত বিচলিত হইলেন, কারণ তাঁহার সৈন্যেরা পূর্ব হইতেই বিদ্রোহী ছিল। শাহজাদার সংবাদ শুনিয়া জমিদারদের মধ্যে অনেকেই তাঁহার সঙ্গে যোগ দিতে মনস্থ করিল। নবাব অনন্যোপায় হইয়া সোনা রূপার তৈজসপত্র বিক্রয় করিয়া সৈন্যগণের বাকী বেতন কতকটা শোধ করিলেন এবং ইংরেজ সৈন্যের সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। শাহজাদাও ক্লাইবের সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। ইতিমধ্যে বাদশাহ উজীরের চাপে পড়িয়া শাহজাদার পরিবর্তে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার অন্য সুবাদার নিযুক্ত করিলেন এবং মীরজাফরকে আদেশ দিলেন যেন অবিলম্বে শাহজাদাকে আক্রমণ ও বন্দী করেন। শাহজাদা পাটনা দুর্গ আক্রমণ করিয়াছিলেন (মার্চ, ১৭৫৯ খ্রীষ্টাব্দ)। কিন্তু ক্লাইবের হস্তে তিনি পরাজিত হইলেন। তখন শাহজাদা ইংরেজের নিকট কিছু অর্থ সাহায্য চাহিলেন। ক্লাইব তাঁহাকে দশহাজার টাকা দিলে তিনি বিহার ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন। দিল্লির উজীর শাহজাদার পরাজয়ে খুশী হইয়া বাংলায় মীরজাফরের কর্তৃত্ব অনুমোদন করিলেন এবং মীরজাফরের অনুরোধে ক্লাইবকে একটি সম্মানসূচক পদবী দিলেন। মীরজাফরও ক্লাইবকে এই পদের উপযুক্ত জায়গীর প্রদান করিলেন।
এই যুদ্ধে মীরজাফরের পুত্র মীরন নবাব-সেনার নায়ক ছিলেন। মীরন কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর প্রতি দুর্ব্যবহার করায় তাঁহারা মীরনের প্রস্থানের পরই কয়েকজন জমিদারের সঙ্গে একযোগে বিদ্রোহ করিয়া শাহজাদাকে আবার বিহার আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ করিলেন। এই আমন্ত্রণ পাইয়া ১৭৫৯ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসের শেষভাগে শাহজাদা আবার বিহার আক্রমণ করিবার উদ্দেশ্যে যাত্রা করিলেন। শোন নদের নিকট পৌঁছিয়া তিনি সংবাদ পাইলেন যে তাঁহার। পিতা উজীর কর্ত্তৃক নিহত হইয়াছেন। অমনি তিনি দ্বিতীয় শাহ আলম নামে নিজেকে সম্রাট বলিয়া ঘোষণা করিলেন এবং অযোধ্যার নবাব শুজাউদ্দৌল্লাকে উজীর নিযুক্ত করিলেন। তিনি অভিষেকের আমোদ-উৎসবে বহু সময় কাটাইলেন। এই অবসরে পাটনায় রামনারায়ণ দুর্গ রক্ষার বন্দোবস্ত শেষ করিলেন এবং ক্যাইলোডের অধীনে একদল ইংরেজ সৈন্য পাটনায় পৌঁছিল। ইংরেজ সৈন্য পৌঁছিবার পূর্বেই রামনারায়ণ বাদশাহী ফৌজকে আক্রমণ করিয়া পরাস্ত হইলেন (৯ই ফেব্রুয়ারী, ১৭৬০ খ্রী)। কিন্তু শাহ আলম পাটনার নিকট পৌঁছিলেও দুর্গ আক্রমণ করিতে ভরসা পাইলেন না এবং ২২শে ফেব্রুয়ারী ক্যাইলোডের হস্তে পরাস্ত হইয়া তিনি বিহার সহরে প্রস্থান করিলেন। অতঃপর শাহ আলম মুর্শিদাবাদ আক্রমণের জন্য কামগার খানের অধীনস্থ একদল অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া পাহাড় ও জঙ্গলের মধ্য দিয়া অগ্রসর হইয়া বিষ্ণুপুর পৌঁছিলেন। এইখানে একদল মারাঠা সৈন্য তাঁহার সঙ্গে যোগ দিল। এই সময় মীরজাফরের নবাবীর শেষ অবস্থা এবং বাংলা দেশেরও চরম দুরবস্থা। সম্ভবত এই সকল সংবাদ শুনিয়াই শাহ আলম বাংলা দেশ আক্রমণ করিতে উৎসাহিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার আশা পূর্ণ হইল না। তাঁহার কতক সৈন্য দামোদর নদ পার হওয়ার পরই ইংরেজ সৈন্যের সহিত তাহাদের একটি খণ্ডযুদ্ধ হইল (৭ই এপ্রিল, ১৭৬০ খ্রী)। শাহ আলম তখন তাড়াতাড়ি ফিরিয়া অরক্ষিত পাটনা দুর্গের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। কিন্তু ইংরেজ সৈন্য পাটনায় পৌঁছিলে (২৮শে এপ্রিল, ১৭৬০ খ্রী) বাদশাহ পাটনা ত্যাগ করিয়া রাণীসরাই নামক স্থানে উপস্থিত হইলেন। এখানে ফরাসী অধ্যক্ষ জ্যাঁ ল সাহেব তাঁহার সহিত যোগ দিলেন। কিন্তু হাজীপুরে ইংরেজ সৈন্য খাদিম হোসেনকে পরাজিত করিলে (১৯শে জুন) বাদশাহ ভগ্নমনোরথ হইয়া বিহার প্রদেশ হইতে প্রস্থান করিয়া যমুনা তীরে পৌঁছিলেন (অগস্ট, ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দ)।
