১। ফরাসীদিগকে বাংলা দেশ হইতে তাড়াইতে হইবে।
২। সিরাজউদ্দৌলার কলিকাতা আক্রমণের ফলে কোম্পানীর ও কলিকাতায় অধিবাসীদের যাহা ক্ষতি হইয়াছিল, তাহা পূরণ করিতে হইবে। ইহার জন্য কোম্পানীকে এক কোটি, ইংরেজ অধিবাসীদিগকে পঞ্চাশ লক্ষ ও অন্যান্য অধিবাসীদিগকে সাতাশ লক্ষ টাকা দিতে হইবে।
৩। সিরাজউদ্দৌলার সহিত সন্ধির সব শর্ত এবং পূর্বেকার নবাবদের ফরমানে ইংরেজ বণিকদিগকে যে সমুদয় সুবিধা দেওয়া হইয়াছিল, তাহা বলবৎ থাকিবে।
৪। কলিকাতার সীমানা ৬০০ গজ বাড়ানো হইবে এবং এই বৃহত্তর কলিকাতার অধিবাসীরা সর্ববিষয়ে কোম্পানীর শাসনাধীন হইবে। কলিকাতা হইতে দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত ভূখণ্ডে ইংরেজ জমিদার-স্বত্ব লাভ করিবে।
৫। ঢাকা ও কাশিমবাজারে কুঠি ইংরেজ কোম্পানী ইচ্ছামত সুদৃঢ় করিতে এবং সেখানে যত খুশী সৈন্য রাখিতে পারিবে।
৬। সুবে বাংলাকে ফরাসী ও অন্যান্য শত্রুদের আক্রমণ হইতে রক্ষা করিবার জন্য কোম্পানী উপযুক্ত সংখ্যক সৈন্য নিযুক্ত করিবে এবং তাঁহার ব্যয় নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত জমি কোম্পানীকে দিতে হইবে।
৭। কোম্পানীর সৈন্য নবাবকে সাহায্য করিবে। যুদ্ধের অতিরিক্ত ব্যয়ভার নবাব দিতে বাধ্য থাকিবেন।
৮। কোম্পানীর একজন দূত নবাবের দরবারে থাকিবেন, তিনি যখনই প্রয়োজন বোধ করিবেন নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে পারিবেন এবং তাহাকে যথোচিত সম্মান দেখাইতে হইবে।
৯। ইংরেজের মিত্র ও শত্রুকে নবাবের মিত্র ও শত্রু বলিয়া পরিগণিত করিতে হইবে।
১০। হুগলির দক্ষিণে গঙ্গার নিকটে নবাব কোন নূতন দুর্গ নির্মাণ করিতে পারিবেন না।
১১। মীরজাফর যদি উপরোক্ত শর্তগুলি পালন করিতে স্বীকৃত হন, তবে ইংরেজরা তাঁহাকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবাদার পদে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য যথাসাধ্য সাহায্য করিবে।
সন্ধি স্বাক্ষরিত হইবার পূর্বে উমিচাঁদ বলিলেন যে মুর্শিদাবাদের রাজকোষে যত টাকা আছে তাঁহার শতকরা পাঁচ ভাগ তাঁহাকে দিতে হইবে নচেৎ তিনি এই গোপন সন্ধির কথা নবাবকে বলিয়া দিবেন। তাঁহাকে নিরস্ত করার জন্য এক জাল সন্ধি প্রস্তুত হইল, তাহাতে ঐরূপ শর্ত থাকিল–কিন্তু মূল সন্ধিতে সেরূপ কোন শর্ত রহিল না। ওয়াটসন এই জাল সন্ধি স্বাক্ষর করিতে রাজী না হওয়ায় ক্লাইব নিজে ওয়াটসনের নাম স্বাক্ষর করিলেন।
যতদিন এইরূপ ষড়যন্ত্র চলিতেছিল ততদিন ক্লাইব বন্ধুত্বের ভান করিয়া নবাবকে চিঠি লিখিতেন, যাহাতে নবাবের মনে কোন সন্দেহ না হয়। কিন্তু মীরজাফর কোরান-শপথ করিয়া সন্ধির শর্ত পালন করিবেন এই প্রতিশ্রুতি পাইয়া ক্লাইব নিজ মূর্ত্তি ধারণ করিলেন। নবাবও মীরজাফরের ষড়যন্ত্রের বিষয় কিছু কিছু জানিতে পারিলেন এবং তাঁহাকে বন্দী করিতে মনস্থির করিয়া একদল সৈন্য ও কামানসহ মীরজাফরের বাড়ি ঘেরাও করিলেন। মীরজাফর ক্লাইবকে এই বিপদের সংবাদ জানাইয়া লিখিলেন যে তিনি যেন অবিলম্বে যুদ্ধযাত্রা করেন। মীরজাফর গোপনে ওয়াটসকে লিখিলেন তিনি যেন অবিলম্বে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করেন। ওয়াটস্ এই চিঠি পাইয়া ১৩ই জুন অনুচরসহ মুর্শিদাবাদ হইতে চলিয়া গেলেন। ক্লাইবও মীরজাফরের চিঠি পাইয়া নবাবকে ঐ তারিখে চিঠি লিখিয়া জানাইলেন যে তাঁহার সহিত ইংরেজদের যে সকল বিষয়ে বিরোধ আছে, নবাবের পাঁচ জন কর্মচারীর উপর তাঁহার মীমাংসার ভার দেওয়া হউক এবং এই উদ্দেশ্যসাধনের জন্য তিনি সসৈন্যে মুর্শিদাবাদ যাত্রা করিতেছেন। তিনি যে পাঁচজন কর্মচারীর নাম করিলেন, তাহারা সকলেই বিশ্বাসঘাতক এবং ইংরেজের পক্ষভুক্ত। এই চিঠি পাইয়া এবং ওয়ার্টসের পলায়নের সংবাদ পাইয়া সিরাজ ইংরেজের প্রকৃত মনোভাব বুঝিতে পারিলেন। এবং এতদিন পরে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হইলেন। মোহনলাল, মীরমদন প্রভৃতি বিশ্বস্ত অনুচরেরা পরামর্শ দিল যে মীরজাফরকে অবিলম্বে হত্যা করা হউক। বিশ্বাসঘাতক কর্মচারীরা নবাবকে মীরজাফরের সহিত মিটমাট করিবার উপদেশ দিলেন। এই বিষম সঙ্কটের সময় সিরাজ তাঁহার অস্থিরমতিত্ব, কূট রাজনীতিজ্ঞান ও দূরদর্শিতার অভাব এবং লোকচরিত্র সম্বন্ধে অনভিজ্ঞতার চূড়ান্ত প্রমাণ দিলেন। মীরজাফরের বাড়ি ঘেরাও করিয়া তিনি তাঁহাকে পরম শত্রুতে পরিণত করিয়াছিলেন। অকস্মাৎ তিনি ভাবিলেন যে অনুনয় বিনয় করিয়া মীরজাফরকে নিজের পক্ষে আনিতে পারা যাইবে। মীরজাফরের বাড়ির চারিদিকে তিনি যে কামান ও সৈন্য পাঠাইয়াছিলেন তাহা ফিরাইয়া আনিয়া তিনি পুনঃ পুনঃ মীরজাফরকে সাক্ষাতের জন্য ডাকিয়া পাঠাইলেন। যখন মীরজাফর কিছুতেই নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিলেন না, তখন নবাব সমস্ত মানমর্যাদা বিসর্জন দিয়া স্বয়ং মীরজাফরের বাটীতে গমন করিলেন। মীরজাফর কোরান স্পর্শ করিয়া নিম্নলিখিত তিনটি শর্তে নবাবের পক্ষে থাকিতে রাজী হইলেন :
১। সমূহ বিপদ কাটিয়া গেলে মীরজাফর নবাবের অধীনে চাকুরী করিবেন না।
২। তিনি দরবারে যাইবেন না।
৩। আসন্ন যুদ্ধে তিনি কোন সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিবেন না।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সিরাজ এই সমুদয় শর্ত মানিয়া লইলেন এবং উপরোক্ত তৃতীয় শর্তটি সত্ত্বেও মীরজাফরকেই সেনাপতি করিয়া তাঁহার অধীনে এক বিপুল সৈন্যদলসহ যুদ্ধযাত্রা করিলেন। পলাশির প্রান্তরে ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ২২শে জুন তারিখে ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইব ও নবাবের সৈন্য পরস্পরের সম্মুখীন হইল। ক্লাইবের সৈন্যসংখ্যা ছিল মোট তিন হাজার-২২০০ সিপাহী, ৮০০ ইউরোপীয়ান–পদাতিক ও গোলন্দাজ। নবাবের মোট সৈন্য ছিল ৫০,০০০ ১৫,০০০ অশ্বারোহী এবং ৩৫,০০০ পদাতিক। নবাবের মোট ৫৩টি কামান ছিল। সিষ্ট্রে নামক একজন ফরাসী সেনানায়কের অধীনেও কয়েকটি কামান ছিল। মোহনলাল ও মীরমদনের অধীনে ৫,০০০ অশ্বারোহী ও ৭,০০০ পদাতিক সৈন্য ছিল। ২৩শে জুন প্রাতঃকালে যুদ্ধ অরম্ভ হইল। নবাবের পক্ষে সিনফ্রে গোলাবর্ষণ আরম্ভ করিলেন। ইংরেজ সৈন্যও গোলাবর্ষণ করিল এবং আম্রকাননের অন্তরালে আশ্রয় গ্রহণ করিল। ইহাতে উৎসাহিত হইয়া সিনফ্রে, মোহনলাল ও মীরমদন তাঁহাদের সৈন্য লইয়া ইংরেজ সৈন্য আক্রমণ করিলেন। মীরজাফর, ইয়ার লতিফ ও রায়দুর্লভের অধীনস্থ বৃহং সৈন্যদল দর্শকের ন্যায় চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও নবাবের ক্ষুদ্র সেনাদলে বীরবিক্রমে অগ্রসর হইয়া ইংরেজ সৈন্যদের বিপন্ন করিয়া তুলিল। এই সময় অকস্মাৎ একটি গোলার আঘাতে মীরমদনের মৃত্যু হইল। ইহাতে নবাব অতিশয় বিচলিত ও মতিচ্ছন্ন হইয়া মীরজাফরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। মীরজাফর প্রথমে আসেন নাই, কিন্তু পুনঃ পুনঃ আহ্বানের ফলে সশস্ত্র দেহরক্ষী সহ নবাবের শিবিরে আসিলেন। নবাব দীনভাবে নিজের পাগড়ী খুলিয়া মীরজাফরের সম্মুখে রাখিলেন এবং আলীবর্দীর উপকারের কথা স্মরণ করাইয়া নিজের প্রাণ ও মান রক্ষার জন্য মীরজাফরের নিকট করুণ নিবেদন জানাইলেন। মীরজাফর আবার কোরান স্পর্শ করিয়া নবাবকে অভয় দিলেন এবং বলিলেন “সন্ধ্যা আগতপ্রায়–আজ আর যুদ্ধের সময় নাই। আপনি মোহনলালকে ফিরিয়া আসিতে আজ্ঞা করুন। কাল প্রাতে আমি সমস্ত সৈন্য লইয়া ইংরেজ সৈন্য আক্রমণ করিব।” নবাব মোহনলালকে ফিরিতে আদেশ দিলেন। মোহনলাল ইহাতে অত্যন্ত আশ্চর্য বোধ করিয়া বলিয়া পাঠাইলেন যে “এখন ফিরিয়া যাওয়া কোনক্রমেই সঙ্গত নহে। এখন ফিরিলেই সমস্ত সৈন্য হতাশ হইয়া পলাইতে আরম্ভ করিবে।” নবাবের তখন আর হিতাহিতজ্ঞান বা কোন রকম বুদ্ধি বিবেচনা ছিল না। তিনি মীরজাফরের দিকে চাহিলেন। মীরজাফর বলিলেন, “আমি যাহা ভাল মনে করি তাহা বলিয়াছি, এখন আপনার যেরূপ বিবেচনা হয় সেইরূপ করুন।” নির্বোধ নবাব মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার স্পষ্ট প্রমাণ পাইয়াও তাঁহার মতই গ্রহণ করিলেন, একমাত্র বিশ্বস্ত অনুচর মোহনলালের উপদেশ গ্রাহ্য করিলেন না। তিনি পুনঃ পুনঃ মোহনলালকে ফিরিবার আদেশ পাঠাইলেন। মোহনলাল অগত্যা ফিরিতে বাধ্য হইলেন। … ….
