বেশ বুঝা যায় যে ইহার পূর্বেই সিরাজের বিরুদ্ধে গুরুতর ষড়যন্ত্র চলিতেছিল এবং ষড়যন্ত্রকারীরা ইংরেজের সহায়তায় সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করিবার জন্য তাঁহাদের স্বার্থ অনুযায়ী নবাবকে পরামর্শ দিতেছিলেন। সিরাজ কূটরাজনীতি এবং লোকচরিত্র এই উভয় বিষয়েই অনভিজ্ঞ ছিলেন। যদিও মীরজাফরকে তিনি সন্দেহ করিতেন, তথাপি তাহাকে বন্দী করিতে সাহস করিতেন না। নবাব একবার ক্রুদ্ধ হইয়া মীরজাফরকে লাঞ্ছিত করিতেন আবার তাঁহার স্তোকবাক্যে ভুলিয়া তাঁহার সহিত আপোষ করিতেন। রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ প্রভৃতি বিশ্বাসঘাতকদের কথায় তিনি ফরাসীদের বিদায় করিয়া দিলেন অর্থাৎ একমাত্র যাহারা তাঁহাকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাহায্য করিতে পারিত তাহাদিগকে দূর করিয়া দিয়া তিনি চক্রান্তকারীদের সাহায্য করিলেন।
সিরাজের অস্থিরমতিত্ব, অদূরদর্শিতা, লোকচরিত্রে অভিজ্ঞতা প্রভৃতি ছাড়াও তাঁহার চরিত্রে আরও অনেক দোষ ছিল। তাঁহাকে সিংহাসনচ্যুত করিবার জন্য যাহারা ষড়যন্ত্র করিয়াছিল, তাহাদের বিচার করিবার পূর্বে সিরাজের চরিত্রসম্বন্ধে আলোচনা করা প্রয়োজন। এ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী মত দেখিতে পাওয়া যায়। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা তাঁহার চরিত্রে বহু কলঙ্ক কালিমা লেপন করিয়াছে। ইহা যে অন্তত কতক পরিমাণে সিরাজের প্রতি তাহাদের বিশ্বাসঘাতকতার সাফাই-স্বরূপ লিখিত, তাহা অনায়াসেই অনুমান করা যাইতে পারে। সমসাময়িক ঐতিহাসিক সৈয়দ গোলাম হোসেন লিখিয়াছেন যে সিরাজের চপলমতিত্ব, দুশ্চরিত্রতা, অপ্রিয় ভাষণ ও নিষ্ঠুরতার জন্য সভাসদেরা সকলেই তাঁহার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। এই বর্ণনাও কতকটা পক্ষপাতদুষ্ট হইতে পারে। কিন্তু বাংলা দেশের কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁহার ‘পলাশীর যুদ্ধ’ কাব্যে সিরাজের যে কলঙ্কময় চিত্র আঁকিয়াছেন তাহাও যেমন অতিরঞ্জিত, ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় এবং নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ সিরাজউদ্দৌলাকে যে প্রকার স্বদেশবৎসল ও মহানুভব বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাও ঠিক তদ্রূপ। সিরাজের চরিত্রের বিরুদ্ধে বহু কাহিনী এদেশে প্রচলিত আছে তাহাও নির্বিচারে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু ফরাসী অধ্যক্ষ জঁ ল সিরাজের বন্ধু ছিলেন, সুতরাং তিনি সিরাজের সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন, তাহা একেবারে অগ্রাহ্য করা যায় না। তিনি এ-সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন তাঁহার সারমর্ম এই : “আলীবর্দীর মৃত্যুর পূর্বেই সিরাজ অত্যন্ত দুশ্চরিত্র বলিয়া কুখ্যাত ছিলেন। তিনি যেমন কামাসক্ত তেমনই নিষ্ঠুর ছিলেন। গঙ্গার ঘাটে যে সকল হিন্দু মেয়েরা স্নান করিতে আসিত তাহাদের মধ্যে সুন্দরী কেহ থাকিলে সিরাজ তাঁহার অনুচর পাঠাইয়া ছোট ডিঙ্গিতে করিয়া তাহাদের ধরিয়া আনিতেন। লোক-বোঝাই ফেরী নৌকা ডুবাইয়া দিয়া জলমগ্ন পুরুষ, স্ত্রী ও শিশুদের অবস্থা দেখিয়া সিরাজ আনন্দ অনুভব করিতেন। কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে বধ করিবার প্রয়োজন হইলে আলীবর্দী একাকী সিরাজের হাতে ইহার ভার দিয়া নিজে দূরে থাকিতেন, যাহাতে কোন আর্তনাদ তাঁহার কানে না যায়। সিরাজের ভয়ে সকলের অন্তরাত্মা কাঁপিত ও তাঁহার জঘন্য চরিত্রের জন্য সকলেই তাঁহাকে ঘৃণা করত।”
সুতরাং সিরাজের কলুষিত চরিত্রই যে তাঁহার প্রতি লোকের বিমুখতার অন্যতম কারণ, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে ষড়যন্ত্রকারীদের অধিকাংশ প্রধানত ব্যক্তিগত কারণেই সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করিবার ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন। এরূপ ষড়যন্ত্র নূতন নহে। সতের বৎসর পূর্বে আলীবর্দী এইরূপ ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া বাংলার নবাব হইয়াছিলেন। সিরাজউদ্দৌলা নিজের দুষ্কৃতি ও মাতামহের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিলেন।
সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করিবার গোপন পরামর্শ মুর্শিদাবাদে অনেক দিন হইতেই চলিতেছিল। প্রথমে স্থির হইয়াছিল যে নবাবের একজন সেনানায়ক ইয়ার লতিফকে সিরাজের পরিবর্তে নবাব করা হইবে। লতিফ ইংরেজদের সাহায্য লাভের জন্য গোপনে দূত পাঠাইলেন। ইংরেজরা এই প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করিল, কারণ তাহাদের বরাবর বিশ্বাস ছিল যে সিরাজ ইংরেজের শত্রু। সিরাজ ফরাসীদের সহিত মিলিত হইয়া ইংরেজকে বাংলা দেশ হইতে তাড়াইবেন, ইংরেজদের সর্বদাই এই ভয় ছিল। সিরাজ তাহাদিগকে খুশি করিবার জন্য আশ্রিত জ্যাঁ ল সাহেবকে বিদায় দিয়াছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা তাহাতেও সন্তুষ্ট না হইয়া ল সাহেবের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইল। সিরাজ ক্রোধান্ধ হইয়া ইহার তীব্র প্রতিবাদ করিলেন এবং পলাশীতে একদল সৈন্য পাঠাইলেন। এই ঘটনায় ইরেজদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে সিরাজের রাজত্বে তাহারা বাংলায় নিরাপদে বাণিজ্য করিতে পারিবে না। সুতরাং সিরাজকে তাড়াইয়া ইংরেজের অনুগত কোন ব্যক্তিকে নবাব করিতে পারিলে তাহারা বাংলা দেশে প্রতিপত্তি লাভ করিতে পারিবে। ইংরেজদের এই মনোভাব জানিতে পারিয়া মীরজাফর স্বয়ং নবাব পদের প্রার্থী হইলেন। তিনি নবাবের সেনাপতি; সুতরাং তিনিই ইংরেজদিগকে বেশী সাহায্য করিতে পারিবেন, এইজন্য ইংরেজরাও তাঁহাকে মনোনীত করিল।
নবীনচন্দ্র সেন তাঁহার ‘পলাশীর যুদ্ধ’ কাব্যের প্রথম সর্গে এই ষড়যন্ত্রের যে চিত্র আঁকিয়াছেন, তাঁহার কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই। সাত আটজন সন্ত্রাস্ত ব্যক্তি রাত্রিযোগে সম্মিলিত হইয়া অনেক বাদানুবাদের পর অবশেষে সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করিবার প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন, ইহা সর্বৈব মিথ্যা। রানী ভবানী, কৃষ্ণচন্দ্র ও রাজবল্লভের মুখে নবীনচন্দ্র বড় বড় বক্তৃতা দিয়াছেন, কিন্তু তাঁহারা এ ষড়যন্ত্রে একবারেই লিপ্ত ছিলেন না। প্রধানত মীরজাফর ও জগৎশেঠ কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির অধ্যক্ষ ওয়াটস্ সাহেবের মারফৎ কলিকাতার ইংরেজ কাউনসিলের সঙ্গে এই বিষয়ে আলাপ করেন। উমিচাঁদ আর রায়দুর্লভও ষড়যন্ত্রের বিষয় জানিতেন এবং ইহার পক্ষপাতী ছিলেন। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ১লা মে কলিকাতার ইংরেজ কমিটি অনেক বাদানুবাদ ও আলোচনার পর মীরজাফরের সঙ্গে গোপন সন্ধি করা স্থির করিল এবং সন্ধির শর্তগুলি ওয়াটস্ সাহেবের নিকট পাঠানো হইল। সন্ধির শর্তগুলি মোটামুটি এই :
