কলিকাতা অধিকার করিয়াই ইংরেজরা সিরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিল (৩রা জানুয়ারী, ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দ)। ওদিকে সিরাজও কলিকাতা অধিকারের সংবাদ পাইয়া যুদ্ধযাত্রা করিলেন। ১০ই জানুয়ারী ক্লাইব হুগলি অধিকার করিয়া সহরটি লুঠ করিলেন এবং নিকটবর্তী অনেক গ্রাম পোড়াইয়া দিলেন। সিরাজ ১৯শে জানুয়ারী হুগলি পৌঁছিলে ইংরেজরা কলিকাতায় প্রস্থান করিল। ৩রা ফেব্রুয়ারী সিরাজ কলিকাতার সহরতলীতে পৌঁছিয়া আমীরাদের বাগানে শিবির স্থাপন করিলেন।
৪ঠা জুন ইংরেজরা সন্ধি প্রস্তাব করিয়া দুইজন দূত পাঠাইলেন। নবাব সন্ধ্যার সময় তাহাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলিলেন, কিন্তু পরদিন পর্যন্ত আলোচনা মুলতুবী রহিল। কিন্তু ইংরেজ দূতেরা রাত্রে গোপনে নবাবের শিবির হইতে চলিয়া গেল। শেষ রাত্রে ক্লাইব অকস্মাৎ নবাবের শিবির আক্রমণ করিলেন। অতর্কিত আক্রমণে নবাবের পক্ষের প্রায় ১৩০০ লোক হত হইল, কিন্তু প্রাতঃকালে নবাবের একদল সৈন্য সুসজ্জিত হওয়ায় ক্লাইব প্রস্থান করিলেন। মনে হয়, ইংরেজ দূতেরা নবাবের শিবিরের সন্ধান লইতেই আসিয়াছিল এবং তাহাদের নিকট সংবাদ পাইয়া ক্লাইব অকস্মাৎ আক্রমণ করিয়া নবাবকে হত অথবা বন্দী করার জন্যই এই আক্রমণ করিয়াছিলেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে কুয়াসায় পথ ভুল করিয়া নবাবের তাঁবুতে পৌঁছিতে অনেক দেরী হইল এবং নবাব এই সুযোগে ঐ তবু ত্যাগ করিয়া গেলেন।
এই নৈশ আক্রমণের ফলে ইংরেজরা যে সব দাবি করিয়াছিল নবাব তাহা সকলই মানিয়া লইয়া তাহাদের সহিত সন্ধি করিলেন (৯ই ফেব্রুয়ারী, ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দ)। নবাবের সৈন্যসংখ্যা ৪৫,০০০ ও কামান ইংরেজদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তথাপি তিনি এইরূপ হীনতা স্বীকার করিয়া ইংরেজদের সহিত সন্ধি করিলেন কেন ইহার কোন সুসঙ্গত কারণ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তবে দুইটি ঘটনা নবাবকে অত্যন্ত বিচলিত করিয়াছিল। প্রথমত, এই সময়ে সংবাদ আসিয়াছিল যে আফগানরাজ আহমদ শাহ আবদালী দিল্লি, আগ্রা, মথুরা প্রভৃতি বিধ্বস্ত করিয়া বিহার ও বাংলা দেশের দিকে অগ্রসর হইতেছে। ইহাতে নবাব অতিশয় ভীত হইলেন এবং যে কোন উপায়ে ইংরেজদের সহিত মিত্রতা স্থাপন করিতে সঙ্কল্প করিলেন।
দ্বিতীয়ত, নবাবের কর্মচারী ও পরামর্শদাতারা প্রায় সকলেই সন্ধি করিতে উপদেশ দিলেন। ইহারা নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিতেছিলেন এবং সম্ভবত নবাব তাঁহার কিছু কিছু আভাসও পাইয়াছিলেন। কারণ যাহাই হউক, এই সন্ধির ফলে নবাবের প্রতিপত্তি অনেক কমিয়া গেল এবং ইংরেজের শক্তি, প্রতিপত্তি ও ঔদ্ধত্য যে অনেক বাড়িয়া গেল, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কতকটা ইহারই ফলে রাজ্যের প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণ তাহাকে সিংহাসনচ্যুত করিবার জন্য ষড়যন্ত্র আরম্ভ করিলেন।
সিরাজ নবাব হইয়া সেনাপতি মীরজাফর ও দিওয়ান রায়দুর্লভকে পদচ্যুত করেন এবং জগৎশেঠকে প্রকাশ্যে অপমানিত করেন। এই তিন জনই ছিলেন সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্যোক্তা। সিরাজের বিরুদ্ধে ঘসেটি বেগমের যথেষ্ট আক্রোশের কারণ ছিল–সুতরাং তিনিও অর্থ দিয়া ইহাদের সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইলেন। উমিচাঁদ নামক একজন ধনী বণিক সিরাজের বিশ্বাসভাজন ছিলেন। তিনিও ষড়যন্ত্রে যোগ দিলেন।
এই সময় ইউরোপে ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হইল। ইংরেজরা ফরাসীদের প্রধান কেন্দ্র চন্দননগর অধিকার করিয়া বাংলার ফরাসী শক্তি নির্মূল করিতে মনস্থ করিল। সিরাজউদ্দৌলা ইহাতে আপত্তি করিলেন এবং হুগলির ফৌজদার নন্দকুমারকে ইংরেজরা চন্দননগর আক্রমণ করিলে তাহাদিগকে বাধা দিতে আদেশ করিলেন। উমিচাঁদ ইংরেজদের পক্ষ হইতে ঘুষ দিয়া নন্দকুমারকে হাত করিলেন এবং ক্লাইব চন্দননগর অধিকার করিলেন (২৩শে মার্চ, ১৭৫৭ খ্রী)।
এই সময় হইতে সিরাজদ্দৌলার চরিত্রে ও আচরণে গুরুতর পরিবর্তন লক্ষিত হয়। তিনি ক্লাইবকে ভয় দেখাইয়াছিলেন যে ফরাসীদের বিরুদ্ধে ইংরেজরা যুদ্ধ করিলে তিনি নিজে ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিবেন। ক্লাইব তাহাতে বিচলিত না হইয়া চন্দননগর আক্রমণ করিলেন। চন্দননগর আক্রমণের সময় রায়দুর্লভ, মাণিকচাঁদ ও নন্দকুমারের অধীনে প্রায় বিশ হাজার সৈন্য ছিল। তাঁহারা কোন বাধা দিলেন না এবং নবাবও ইহার জন্য কোন কৈফিয়ৎ তলব করিলেন না। তিনি নিজে তো ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেনই না, বরং চন্দননগরের পতন হইলে ক্লাইবকে অভিনন্দন জানাইলেন। তারপর ক্লাইব যখন নবাবকে অনুরোধ করিলেন যে পলাতক ফরাসীদের ও তাহাদের সমস্ত সম্পত্তি ইংরেজদের হাতে দিতে হইবে, তখন তিনি প্রথমত ঘোরতর আপত্তি করিলেন এবং কাশিমবাজারের ফরাসী কুঠির অধ্যক্ষ জ্যাঁ ল সাহেবকে অনুচরসহ সাদর অভ্যর্থনা করিয়া আশ্রয় দিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি তাঁহার বিশ্বাসঘাতক অমাত্যদের পরামর্শে জঁ ল সাহেবকে বিদায় দিলেন। সম্ভবত ইহার অন্য কারণও ছিল। সিরাজ জানিতেন যে ফরাসীরা দাক্ষিণাত্যে নিজামের রাজ্যে কর্ত্তা হইয়া বসিয়াছেন। বাংলা দেশে যাহাতে ইংরেজ বা ফরাসী কোন পক্ষই ঐরূপ প্রভুত্ব করিতে না পারে, তাঁহার জন্য তিনি ইহাদের একটির সাহায্যে অপরটিকে দমনে রাখিবার চেষ্টা করিতেছিলেন। এইজন্য তিনি যখন শুনিলেন যে ফরাসী সেনাপতি বুসী দাক্ষিণাত্য হইতে একদল সৈন্য লইয়া বাংলার অভিমুখে যাত্রা করিয়াছেন, তখন তিনি ইংরেজ কোম্পানীর সাহায্য প্রার্থনা করেন। আবার ইংরেজ যখন ফরাসীদের চন্দননগর অধিকার করিল, তখন তিনি ক্রুদ্ধ হইয়া একদল সৈন্য পাঠাইলেন এবং বুসীকে দুই হাজার সৈন্য পাঠাইতে লিখিলেন। এই সময়ে (১০ই মে, ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দ) পেশোয়া বালাজী রাও ইংরেজ কোম্পানীর কলিকাতার গভর্নরকে লিখিলেন যে তিনি ইংরেজকে ১,২০,০০০ সৈন্য দিয়া সাহায্য করিবেন এবং বাংলা দেশকে দুই ভাগ করিয়া ইংরেজ ও পেশোয়া এক এক ভাগ দখল করিবেন। ক্লাইব সিরাজকে ইহা জানাইলে তিনি ইংরেজের প্রতি খুশী হইয়া সৈন্য ফিরাইয়া আনিলেন।
