ঘসেটি বেগম ও মীরজাফর উভয়েই আলীবর্দীর মৃত্যুর পর শওকৎ জঙ্গকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়া মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করিতে উৎসাহিত করিলেন। কিন্তু এই উৎসাহ বা প্ররোচনার আবশ্যক ছিল না। শওকৎ জঙ্গ আলীবর্দীর মধ্যমা কন্যার পুত্র, সুতরাং কনিষ্ঠা কন্যার পুত্র সিরাজ অপেক্ষা সিংহাসনে তাঁহারই দাবি তিনি বেশি মনে করিতেন এবং তিনি দিল্লিতে বাদশাহের দরবারে তাঁহার নামে সুবেদারীর ফরমানের জন্য আবেদন করিলেন।
সিরাজ সিংহাসনে আরোহণ করিয়াই তাঁহার অবস্থা উপলব্ধি করিতে পারিলেন। মীরজাফরের ষড়যন্ত্রের কথা সম্ভবত তিনি জানিতেন না। ঘসেটি বেগম ও শওকৎ জঙ্গকেই প্রধান শত্রু জ্ঞান করিয়া তিনি প্রথমে ইহাদিগকে দমন করিবার ব্যবস্থা করিলেন। মতিঝিল আক্রমণ করিয়া সিরাজ ঘসেটি বেগমকে বন্দী করিলেন ও তাঁহার ধনরত্ন লুঠ করিলেন। তারপর তিনি সসৈন্যে শওকৎ জঙ্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। কিন্তু দুইটি কারণে ইংরেজদের প্রতিও তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ছিলেন। প্রথমত, তাহারা রাজবল্লভের পুত্রকে আশ্রয় দিয়াছে। দ্বিতীয়ত, তিনি শুনিতে পাইলেন ইংরেজরা তাঁহার অনুমতি না লইয়াই কলিকাতা দুর্গের সংস্কার ও আয়তনবৃদ্ধি করিতেছে। শওকৎ জঙ্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্ৰা করিবার পূর্বে তিনি কলিকাতার গভর্নর ড্রেকের নিকট নারায়ণ দাস নামক একজন দূত পাঠাইয়া আদেশ করিলেন যেন তিনি অবিলম্বে নবাবের প্রজা কৃষ্ণদাসকে পাঠাইয়া দেন। কলিকাতার দুর্গের কি কি সংস্কার ও পরিবর্তন হইতেছে, তাহা লক্ষ্য করিবার জন্যও দূতকে গোপনে আদেশ দেওয়া হইল।
১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ই মে সিরাজ মুর্শিদাবাদ হইতে সসৈন্যে শওকৎ জঙ্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। ২০শে মে রাজমহলে পৌঁছিয়া তিনি সংবাদ পাইলেন যে তাঁহার প্রেরিত দূত গোপনে কলিকাতা সহরে প্রবেশ করে, কিন্তু কলিকাতার কর্তৃপক্ষের নিকট দৌত্যকার্যের উপযুক্ত দলিল দেখাইতে না পারায় গুপ্তচর মনে করিয়া তাহাকে তাড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। এই অজুহাতটি মিথ্যা বলিয়াই মনে হয়। কলিকাতার গর্ভনর ড্রেক সাহেব ঘুষ লইয়া কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দিয়াছিলেন এবং তাঁহার বিশ্বাস ছিল পরিণামে ঘসেটি বেগমের পক্ষই জয়লাভ করিবে। এই জন্যই তিনি সিরাজের বিরুদ্ধাচরণ করিতে ভরসা পাইয়াছিলেন।
কলিকাতার সংবাদ পাইয়া সিরাজ ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিলেন এবং ইংরেজদিগকে সমুচিত শাস্তি দিবার জন্য তিনি রাজমহল হইতে ফিরিয়া ইংরেজদিগের কাশিমবাজার কুঠি লুঠ ও কয়েকজন ইংরেজকে বন্দী করিলেন। ৫ই জুন তিনি কলিকাতা আক্রমণের জন্য যাত্রা করিলেন এবং ১৬ই জুন কলিকাতার উপকণ্ঠে পৌঁছিলেন। কলিকাতা দুর্গের সৈন্যসংখ্যা তখন খুবই অল্প ছিল-কার্যক্ষম ইউরোপীয় সৈন্যের সংখ্যা তিন শতেরও কম ছিল এবং ১৫০ জন আর্মেনিয়ান ও ইউরেশিয়ান সৈন্য ছিল। সুতরাং নবাব সহজেই কলিকাতা অধিকার করিলেন। গভর্নর নিজে ও অন্যান্য অনেকেই নৌকাযোগে পলায়ন করিলেন এবং ফলতায় আশ্রয় লইলেন। ২০শে জুন কলিকাতার নূতন গভর্নর হলওয়েল আত্মসমর্পণ করিলেন এবং বিজয়ী সিরাজ কলিকাতা দুর্গে প্রবেশ করিলেন।
সিরাজের সৈন্যরা ইউরোপীয় অধিবাসীদের বাড়ী লুঠ করিয়াছিল; কিন্তু কাহারও প্রতি অত্যাচার করে নাই। সিরাজও হলওয়েলকে আশ্বস্ত করিয়াছিলেন। সন্ধ্যার সময় কয়েকজন ইউরোপীয় সৈন্য মাতাল হইয়া এ-দেশী লোককে আক্রমণ করে। তাহারা নবারের নিকট অভিযোগ করিলে নবাব জিজ্ঞাসা করিলেন, এইরূপ দুবৃত্ত মাতাল সৈন্যকে সাধারণত কোথায় আটকাইয়া রাখা হয়? তাহারা বলিল, অন্ধকূপ (Black Hole) নামক কক্ষে। সিরাজ হুকুম দিলেন যে, ঐ সৈন্যদিগকে সেখানে রাত্রে আটক রাখা হউক। ১৮ ফুট দীর্ঘ ও ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি প্রশস্ত এই কক্ষটিতে ঐ সমুদয় বন্দীকে আটক রাখা হইল। পরদিন প্রভাতে দেখা গেল দম বন্ধ হইয়া অথবা আঘাতের ফলে তাহাদের অনেকে মারা গিয়াছে।
এই ঘটনাটি অন্ধকূপ হত্যা নামে কুখ্যাত। প্রচলিত বিবরণ মতে মোট কয়েদীর সংখ্যা ছিল ১৪৬, তাঁহার মধ্যে ১২৩ জনই মারা গিয়াছিল। এই সংখ্যাটি যে অতিরঞ্জিত, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। সম্ভবত ৬০ কি ৬৫ জনকেই ঐ কক্ষে আটক করা হইয়াছিল। ইহাদের মধ্যে কত জনের মৃত্যু হইয়াছিল, তাহা সঠিক জানিবার উপায় নাই। কিন্তু ২১ জন যে বাঁচিয়াছিল, ইহা নিশ্চিত।
ইতিমধ্যে শওকৎ জঙ্গ বাদশাহের উজীরকে এক কোটি টাকা ঘুষ দিয়া সুবাদারীর ফরমান এবং সিরাজকে বিতাড়িত করিবার জন্য বাদশাহের অনুমতি পাইয়াছিলেন। সুতরাং তিনি সিরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। সিরাজও কলিকাতা জয় সমাপ্ত করিয়া ১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরের শেষে সসৈন্যে পূর্ণিয়া অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। ১৬ই অক্টোবর নবাবগঞ্জের নিকট মনিহারী গ্রামে দুই দলে যুদ্ধ হইল। এই যুদ্ধে শওকৎ জঙ্গ পরাজিত ও নিহত হইলেন।
অল্পবয়স্ক হইলেও সিরাজ মাতামহের মৃত্যুর ছয়মাসের মধ্যেই ঘসেটি বেগম, ইংরেজ ও শওকৎ জঙ্গের ন্যায় তিনটি শত্রুকে ধ্বংস করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন ইহা তাঁহার বিশেষ যোগ্যতার পরিচয় সন্দেহ নাই। কিন্তু এই সাফল্যলাভের পর তাঁহার সকল উদ্যম ও উৎসাহ যেন শেষ হইয়া গেল।
কলিকাতা জয়ের পর ইহার রক্ষার জন্য উপযুক্ত কোন বন্দোবস্ত করা হইল না। ইংরেজের সঙ্গে শত্রুতা আরম্ভ করিবার পর যাহাতে তাহারা পুনরায় বাংলা দেশে শক্তি ও প্রতিষ্ঠা স্থাপন করিতে না পারে, তাঁহার সুব্যবস্থা করা অবশ্য কর্তব্য ছিল; কিন্তু তাহাও করা হইল না। ইংরেজ কোম্পানী মাদ্রাজ হইতে ক্লাইবের অধীনে একদল সৈন্য ও ওয়াটসনের অধীনে এক নৌবহর কলিকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠাইল। নবাবের কর্মচারী মাণিকচাঁদ কলিকাতার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ক্লাইব ও ওয়াটসন বিনা বাধায় ফলতায় উদ্বাস্তু ইংরেজদের সহিত মিলিত হইলেন (১৫ই ডিসেম্বর, ১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দ)। ১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ২৭শে ডিসেম্বর ইংরেজ সৈন্য ও নৌবহর কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিল। নবাবের বজবজে একটি ও তাঁহার নিকটে আরও একটি দুর্গ ছিল। মাণিকচাঁদ এই দুইটি দুর্গ রক্ষার্থে অগ্রসর হইতেছিলেন-পথে ক্লাইবের সৈন্যের সঙ্গে তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। সহসা আক্রমণের ফলে ইংরেজদের কিছু সৈন্য মারা গেল। কিন্তু মাণিকাদের পাগড়ীর পাশ দিয়া একটি গুলি যাওয়ার শব্দে ভীত হইয়া তিনি পলায়ন করিলেন। ইংরেজরা বজবজ দুর্গ ধ্বংস করিল এবং বিনা যুদ্ধে কলিকাতা অধিকার করিল (২রা জানুয়ারী, ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দ)। ইংরেজরা যে পূর্বেই ঘুষ দিয়া মাণিকচাঁদকে হাত করিয়াছিল, সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাই। মাণিকচাঁদের সহিত ক্লাইবের পত্র বিনিময় হইতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে কলিকাতা হইতে ইংরেজরা বিতাড়িত হইয়া ফলতায় আশ্রয় গ্রহণের পরেই মাণিকচাঁদ নবাবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া গোপনে ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বন করেন। অর্থের প্রভাব ছাড়া ইহার আর কোন কারণ দেখা যায় না। ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দে মাণিকচাঁদের পুত্রকে ইংরেজ গভর্নমেন্ট উচ্চ পদে নিযুক্ত করেন–এই প্রসঙ্গে কাগজ-পত্রে লেখা আছে যে মাণিকচাঁদ ত্রিশ বৎসর যাবৎ ইংরেজের অনেক উপকার করিয়াছেন।
