কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরে যখন মুর্শিদকুলী খান স্বাধীন রাজার ন্যায় রাজত্ব করিতে লাগিলেন তখন নবাব ও তাঁহার কর্মচারীরা সমৃদ্ধ ইংরেজ বণিকদিগের নিকট হইতে নানা উপায়ে অর্থ আদায় করিতে লাগিলেন। নবাবদের মতে ইংরেজদের বাণিজ্য বহু বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং তাঁহাদের কর্মচারীরাও বিনা শুঙ্কে বাণিজ্য করিতেছে, সুতরাং তাহাদের বার্ষিক টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত। ইহা লইয়া প্রায়ই বিবাদ-বিসংবাদ হইত আবার পরে গোলমাল মিটিয়া যাইত। কারণ বাংলার নবাব জানিতেন যে ইংরেজের বাণিজ্য হইতে তাঁহার যথেষ্ট লাভ হয়-ইংরেজরাও জানিতেন যে নবাবের সহিত শত্রুতা করিয়া বাণিজ্য করা সম্ভব হইবে না। সুতরাং কোন পক্ষই বিবাদ-বিসংবাদ চরমে পৌঁছিতে দিতেন না। নবাব কখনও কখনও টাকা না পাইলে ইংরেজদের মাল বোঝাই নৌকা আটকাইতেন। ১৭৩৬ খ্রীষ্টাব্দে এইরূপ একবার নৌকা আটকানো হয়। কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠিয়ালরা ৫৫,০০০ টাকা দিলে নবাব নৌকা ছাড়িয়া দেন।
নবাব আলীবর্দী ইউরোপীয় বণিকদের সহিত সদ্ভাব রক্ষা করিয়া চলিতেন এবং তাঁহাদের প্রতি যাহাতে কোন অন্যায় বা অত্যাচার না হয় সেদিকে লক্ষ্য। রাখিতেন। কারণ ইহাদের ব্যবসায় বজায় থাকিলে যে বাংলা সরকারের বহু অর্থাগম হইবে, তাহা তিনি খুব ভাল করিয়াই জানিতেন। তবে অভাবে পড়িলে টাকা আদায়ের জন্য তিনি অনেক সময় কঠোরতা অবলম্বন করিতেন। মারাঠা আক্রমণের সময়ে তিনি ইংরেজ, ফরাসী ও ওলন্দাজ বণিকদের নিকট হইতে টাকা আদায় করেন। ১৭৪৪ খ্রীষ্টাব্দে সৈন্যের মাহিনা বাকী পড়ায় তিনি ইংরেজদের নিকট হইতে ত্রিশ লক্ষ টাকা দাবী করেন এবং তাহাদের কয়েকটি কুঠি আটক করেন। পরে অনেক কষ্টে ইংরেজরা মোট প্রায় চারি লক্ষ টাকা দিয়া রেহাই পান। ইংরেজরা বাংলার কয়েকজন আর্মেনিয়ান ও মুঘল বণিকের জাহাজ আটকাইবার অপরাধে আলিবর্দী তাঁহাদিগকে ক্ষতিপূরণ করিতে আদেশ দেন ও দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা করেন।
দাক্ষিণাত্যে ইংরেজ ও ফরাসী বণিকেরা যেমন স্থানীয় রাজাদের পক্ষ অবলম্বন করিয়া ক্রমে ক্রমে শক্তিশালী হইতেছিলেন, বাংলা দেশ যাহাতে সেরূপ না হইতে পারে সে দিকে আলীবর্দীর বিশেষ দৃষ্টি ছিল। ইউরোপে যুদ্ধ উপস্থিত হইলে তিনি ফরাসী, ইংরেজি ও ওলন্দাজ বণিকগণকে সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন যে তাঁহার রাজ্যের মধ্যে যেন তাহাদের পরস্পরের মধ্যে কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ না হয়। তিনি ইংরেজ ও ফরাসীদিগকে বাংলায় কোন দুর্গ নির্মাণ করিতে দিতেন না, বলিতেন “তোমরা বাণিজ্য করিতে আসিয়াছ, তোমাদের দুর্গের প্রয়োজন কি? তোমরা আমার রাজ্যে আছ, আমিই তোমাদের রক্ষা করিব।” ১৭৫৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি দিনেমার (ডেনমার্ক দেশের অধিবাসী) বণিকগণকে শ্রীরামপুরে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করিতে অনুমতি দেন।
৬
সিরাজউদ্দৌলা
নবাব আলীবর্দীর কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তাঁহার তিন কন্যার সহিত তাঁহার তিন ভ্রাতুষ্পুত্রের (হাজী আহম্মদের পুত্র) বিবাহ হইয়াছিল। এই তিন জামাতা যথাক্রমে ঢাকা, পূর্ণিয়া ও পাটনার শাসনকর্ত্তা ছিলেন। আলীবর্দীর জীবদ্দশায়ই তিন জনের মৃত্যু হয়। জ্যেষ্ঠা কন্যা মেহের উন্-নিসা ঘসেটি বেগম নামেই সুপরিচিত ছিলেন। তাঁহার কোন পুত্র সন্তান ছিল না কিন্তু বহু ধন-সম্পত্তি ছিল এবং স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ঢাকা হইতে আসিয়া মুর্শিদাবাদে মতিঝিল নামে সুরক্ষিত বৃহৎ প্রাসাদ নির্মাণ করিয়া সেখানেই থাকিতেন। মধ্যমা কন্যার পুত্র শওকৎ জঙ্গ পিতার মৃত্যুর পর পূর্ণিয়ার শাসনকর্ত্তা হন।
কনিষ্ঠা কন্যা আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলা মুর্শিদাবাদের মাতামহের কাছে থাকিতেন। তাঁহার জন্মের পরেই আলীবর্দী বিহারের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হন। সুতরাং এই নবজাত শিশুকেই তাঁহার সৌভাগ্যের মূল কারণ মনে করিয়া তিনি ইহাকে অত্যধিক স্নেহ করিতেন। তাঁহার আদরের ফলে সিরাজের লেখাপড়া কিছুই হইল না, এবং বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দুর্দান্ত, স্বেচ্ছাচারী, কামাসক্ত, উদ্ধত, দুর্বিনীত ও নিষ্ঠুর যুবকে পরিণত হইলেন। কিন্তু তথাপি আলীবর্দী সিরাজকেই নিজের উত্তরাধিকারী মনোনীত করিলেন। আলীবর্দীর মৃত্যুর পর সিরাজ বিনা বাধায় সিংহাসনে আরোহণ করিলেন।
ঘসেটি বেগম ও শওকত্সঙ্গ উভয়েই সিরাজের সিংহাসনে আরোহণের বিরুদ্ধে ছিলেন। নবাব-সৈন্যের সেনাপতি মীরজাফর আলী খানও সিংহাসনের স্বপ্ন। দেখিতেন। আলীবর্দীর ন্যায় মীরজাফরও নিঃস্ব অবস্থায় ভারতে আসেন এবং আলীবর্দীর অনুগ্রহেই তাঁহার উন্নতি হয়। মীরজাফর আলীবর্দীর বৈমাত্রেয় ভগিনীকে বিবাহ করেন এবং ক্রমে সেনাপতি পদ লাভ করেন। আলীবর্দী প্রতিপালক প্রভুর পুত্রকে হত্যা করিয়া নবাবী লাভ করিয়াছিলেন। মীরজাফরও তাঁহারই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া সিরাজকে পদচ্যুত করিয়া নিজে নবাব হইবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা মনে মনে পোষণ করিতেন।
ঘসেটি বেগমের সহিত সিরাজের বিরোধিতা আলীবর্দীর মৃত্যুর পূর্বেই আরম্ভ হইয়াছিল। তাঁহার স্বামী ঢাকার শাসনকর্ত্তা ছিলেন, কিন্তু তিনি ভগ্নস্বাস্থ্য ও অতিশয় দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন, বুদ্ধিশুদ্ধিও তেমন ছিল না। সুতরাং ঘসেটি বেগমের হাতেই ছিল প্রকৃত ক্ষমতা এবং তিনিই তাঁহার অনুগ্রহভাজন দিওয়ান হোসেন কুলী খানের সাহায্যে দেশ শাসন করিতেন। হোসেন কুলীর শক্তি ও সম্পদ বৃদ্ধিতে সিরাজ ভীত হইয়া উঠিলেন এবং একদিন প্রকাশ্য দরবারে আলীবর্দীর নিকট অভিযোগ করিলেন যে হোসেন কুলী তাঁহার (সিরাজের) প্রাণনাশের জন্য ষড়যন্ত্র করিতেছে। আলীবর্দী প্রিয় দৌহিত্রকে কোনমতে বুঝাইয়া প্রকাশ্যে কোন হঠকারিতা করিতে নিরস্ত করিলেন। ঘসেটি বেগমের সহিত হোসেন কুলীর অবৈধ প্রণয়ের কথাও সম্ভবত সিরাজ ও আলীবর্দী উভয়ের কানে গিয়াছিল। সম্ভবত সেইজন্যই আলীবর্দী সিরাজকে তাঁহার দুরভিসন্ধি হইতে একেবারে নিবৃত্ত করেন নাই। মাতামহের উপদেশ সত্ত্বেও সিরাজ প্রকাশ্য রাজপথে হোসেন কুলী খানকে বধ করিলেন (এপ্রিল, ১৭৫৪ খ্রী)। অতঃপর ঘসেটি বেগম রাজবল্লভ নামে বিক্রমপুরের একজন হিন্দুকে দিওয়ান নিযুক্ত করিলেন। রাজবল্লভ সামান্য কেরানীর পদ হইতে নিজের যোগ্যতার বলে নাওয়ারা (নৌবহর) বিভাগের অধ্যক্ষপদে উন্নীত হইয়াছিলেন। হোসেন কুলীর মৃত্যুর পর তিনিই ঘসেটির দক্ষিণ হস্ত এবং ঢাকায় সর্বেসর্বা হইয়া উঠিলেন। সিরাজ উহাকে ভালচক্ষে দেখিতেন না। সুতরাং ঘসেটি বেগমের স্বামীর মৃত্যুর পরই সিরাজ রাজবল্লভকে তহবিল তছরূপের অপরাধে বন্দী করিলেন এবং তাঁহার নিকট হিসাব-নিকাশের দাবী করিলেন (মার্চ, ১৭৫৬ খ্রী)। বৃদ্ধ আলীবর্দী তখন মৃত্যুশয্যায়, তথাপি তিনি রাজবল্লভকে তখনই বধ না করিয়া হিসাব-নিকাশ পর্যন্ত তাঁহার প্রাণ রক্ষার আদেশ করিলেন। সিরাজ রাজবল্লভকে কারাগারে রাখিলেন এবং রাজবল্লভের পরিবারবর্গকে বন্দী ও তাঁহার ধনসম্পত্তি লুঠ করিবার জন্য রাজবল্লভের বাসভূমি রাজনগরে (ঢাকা জিলায়) একদল সৈন্য পাঠালেন। সৈন্যদল রাজনগরে পৌঁছিবার পূর্বেই রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস সপরিবারে সমস্ত ধনরত্নসহ পুরীতে তীর্থযাত্রার নাম করিয়া জলপথে কলিকাতায় পৌঁছিলেন এবং কলিকাতার গভর্নর ড্রেককে ঘুষ দিয়া কলিকাতা দুর্গে আশ্রয় লইলেন। সম্ভবত ঘসেটি বেগমের ধনরত্নও এইরূপে কলিকাতায় সুরক্ষিত হইল।
