৫
বাংলায় ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায়
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে পর্তুগীজদেশীয় ভাস্কো-দা-গামা আফ্রিকার পশ্চিম ও পূর্ব উপকূল ঘুরিয়া বরাবর সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে আসিবার পথ আবিষ্কার করেন। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই পর্তুগীজ বণিকগণ বাংলা দেশের সহিত বাণিজ্য করিতে আরম্ভ করেন। ১৫১৭ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহারা চট্টগ্রামে ও সপ্তগ্রামে বাণিজ্য কুঠি তৈরী করিবার অনুমতি পায়। ১৫৭৯-৮০ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট আকবর ভাগীরথী-তীরে হুগলি নামক একটি নগণ্য গ্রামে পর্তুগীজদিগকে কুঠি তৈরী করিবার অনুমতি দেন এবং ইহাই ক্রমে একটি সমৃদ্ধ সহর ও বাংলায় পর্তুগীজদের বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হইয়া উঠে। ইহা ছাড়া বাংলায় হিজলী, শ্রীপুর, ঢাকা, যশোহর, বরিশাল ও নোয়াখালি জিলার বহুস্থানে পর্তুগীজদের বাণিজ্য চলিত। ষোড়শ শতাব্দীর শেষে চট্টগ্রাম ও ডিয়াঙ্গা এবং সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমে সন্দ্বীপ, দক্ষিণ শাহবাজপুর প্রভৃতি স্থান পর্তুগীজদের অধিকারভুক্ত হয়। কিন্তু বাংলায় পর্তুগীজদের প্রভাব বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। কারণ পর্তুগীজদের বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরও দুইটি জিনিষ বাংলায় আমদানি হয়-খ্রীষ্টীয় ধর্মপ্রচারক এবং জলদস্যু। এই উভয়ই বাঙালীর আতঙ্কের কারণ হইয়া উঠিয়াছিল। আরাকানের রাজা ডিয়াঙ্গা পর্তুগীজদের হত্যা করিয়া সন্দ্বীপ অধিকার করেন। পর্তুগীজদের আগ্নেয় অস্ত্র ও নৌবহর কেবল বাংলার নহে মুঘল বাদশাহেরও ভয়ের কারণ হইয়া উঠিয়াছিল, কারণ এই দুই শক্তির বলে তাহারা দুর্ধর্ষ হইয়া উঠিয়া স্বাধীন জাতির ন্যায় আচরণ করিত। শাহ্জাহান যখন বিদ্রোহী হইয়া বাংলা দেশে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন, তখন পর্তুগীজরা প্রথমে নৌবহর লইয়া তাঁহাকে সাহায্য করিতে অগ্রসর হয়; কিন্তু পরে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া তাহাকে ত্যাগ করে। ফিরিবার পথে তাহারা শাহ্জাহানের বেগম মমতাজমহলের দুইজন বাদীকে ধরিয়া অকথ্য অত্যাচার করে। এই সমুদয় কারণে শাহজাহান সম্রাট হইয়া কাশিম খানকে বাংলা দেশের সুবাদার নিযুক্ত করার সময় এই নির্দেশ দিলেন যে অবলিম্বে হুগলি দখল করিয়া পর্তুগীজ শক্তি সমূলে ধ্বংস করিতে হইবে এবং যাবতীয় শ্বেতবর্ণ পুরুষ, স্ত্রী, শিশু ইসলাম ধর্ম্মে দীক্ষিত অথবা ক্রীতদাসরূপে সম্রাটের দরবারে প্রেরিত হইবে। ১৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে কাশিম খান হুগলি অধিকার করিলেন। ৪০০ ফিরিঙ্গি স্ত্রী-পুরুষকে বন্দী করিয়া আগ্রায় পাঠানো হইল। তাহাদিগকে বলা হইল যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিলে তাহারা মুক্তি পাইবে, নচেৎ আজীবন ক্রীতদাসরূপে বন্দী হইয়া থাকিতে হইবে। অধিকাংশই মুসলমান হইতে আপত্তি করিল এবং আমরণ বন্দী হইয়াই রহিল। হুগলির পতনের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশে পর্তুগীজ প্রাধান্যের শেষ হইল।
পর্তুগীজদের পরে আরও কয়েকটি ইউরোপীয় বণিকদল বাংলাদেশে বাণিজ্য বিস্তার করে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম হইতেই ওলন্দাজেরা বাংলায় বাণিজ্য করিতে আরম্ভ করে। ১৬৫৩ খ্রীষ্টাব্দে হুগলির নিকটবর্তী কুঁচুড়ায় তাহাদের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁহার অধীনে কাশিমবাজার ও পাটনায় আরও দুইটি কুঠি স্থাপিত হয়। দিল্লির বাদশাহ ফারুখশিয়র ওলন্দাজদিগকে শতকরা সাড়ে তিন টাকার পরিবর্তে আড়াই টাকা শুল্ক দিয়া বাণিজ্য করিবার অধিকার প্রদান করে। ফরাসী বণিকেরাও সম্রাটকে ৪০,০০০ টাকা এবং বাংলার নবাবকে ১০,০০০ টাকা ঘুষ দিয়া ঐ সুবিধা লাভ করেন। কিন্তু ১৭৪০ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে তাঁহারা বাংলায় বাণিজ্যের সুবিধা করিতে পারেন নাই। হুগলির নিকটবর্তী চন্দননগরে তাঁহাদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল।
ইংরেজ বণিকেরা প্রথমে পর্তুগীজ ও ওলন্দাজ বণিকদের প্রতিযোগিতায় বাংলা দেশে বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা করিতে পারেন নাই। ১৬৫০ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহারা নবাবের নিকট হইতে বাংলা দেশে বাণিজ্য করিবার সনদ পান এবং পরবর্তী বৎসর হুগলিতে কুঠি স্থাপন করেন। ১৬৬৮ খ্রীষ্টাব্দে ঢাকা এবং অনতিকাল পরেই রাজমহল এবং মালদহেও তাহাদের কুঠি স্থাপিত হয়। এই সমুদয় অঞ্চলে শুজা ইংরেজদিগকে বার্ষিক তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য করিবার অধিকার দেন। কিন্তু বাংলার মুঘল কর্মচারীরা নানা অজুহাতে এই সুবিধা হইতে ইংরেজদিগকে বঞ্চিত করে। ইংরেজ বণিকগণ শায়েস্তা খান ও সম্রাট ঔরঙ্গজেবের নিকট হইতেও ফরমান আদায় করেন; কিন্তু তাহাতেও কোন সুবিধা হয় না। ইংরেজরা তখন নিজেদের শক্তিবৃদ্ধির দ্বারা আত্মরক্ষা করিতে সচেষ্ট হইলেন। ইতিমধ্যে হুগলির মুঘল শাসনকর্ত্তা ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে ইংরেজদের কুঠি আক্রমণ করিলেন। ইংরেজরা বাধা দিতে সমর্থ হইলেও ইংরেজ এজেন্ট জব চার্ণক সেখানে থাকা নিরাপদ মনে না করিয়া, প্রথমে সুতানুটি (বর্তমান কলিকাতার অন্তর্গত), পর হিজলীতে তাহাদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপিত করিলেন এবং তাঁহাদের ক্ষতির প্রতিশোধস্বরূপ বালেশ্বর সহরটি পোড়াইয়া দিলেন। মুঘলসৈন্য হিজলী অবরোধ করিলে উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি হইল এবং ১৬৮৭ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজরা সুতানুটিতে ফিরিয়া গেলেন (সেপ্টেম্বর, ১৬৮৯ খ্রী)। কিন্তু লণ্ডনের কর্তৃপক্ষ পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলায় একটি সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত স্থান অধিকার দ্বারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা করিতে মনস্থ করিলেন। জব চার্ণকের আপত্তি সত্ত্বেও ইংরেজরা সুতানুটি হইতে বাণিজ্যকেন্দ্র উঠাইয়া, সমস্ত ইংরেজ অধিবাসী ও বাণিজ্য-দ্রব্য জাহাজে বোঝাই করিয়া জলপথে চট্টগ্রাম আক্রমণ করিলেন। কিন্তু ব্যর্থ মনোরথ হইয়া মাদ্রাজে (১৬৮৮ খ্রী) ফিরিয়া গেলেন। আবার উভয় পক্ষে সন্ধি হইল। বাংলার সুবাদার বার্ষিক তিন হাজার টাকার বিনিময়ে ইংরেজদিগকে বিনাশুল্কে বাণিজ্য করিতে অনুমতি দিলেন। ১৬৯০ খ্রীষ্টাব্দের অগস্ট মাসে ইংরেজরা আবার সুতানুটিতে ফিরিয়া আসিয়া সেখানে ঘরবাড়ী নির্মাণ করিলেন। ১৬৯৬ খ্রীষ্টাব্দে শোভাসিংহের বিদ্রোহ উপলক্ষে কলিকাতার দুর্গ দৃঢ় করা হইল এবং ইংলণ্ডের রাজার নাম অনুসারে ইহার নাম রাখা হইল ফোর্ট উইলিয়ম। বার্ষিক ১২,০০০ টাকায় সুতানুটি, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর, এই তিনটি গ্রামের ইজারা লওয়া হইল। ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দে মাদ্রাজ হইতে পৃথকভাবে বাংলা একটি স্বতন্ত্র প্রেসিডেন্সীতে পরিণত হইল। ১৭১৭ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ বণিকগণের প্রতিনিধি সুরম্যানকে সম্রাট ফারুখশিয়র এই মর্মে এক ফরমান প্রদান করেন যে ইংরেজগণ শুল্কের পরিবর্তে মাত্র বার্ষিক তিন হাজার টাকা দিলে সারা বাংলায় বাণিজ্য করিতে পারিবেন, কলিকাতার নিকটে জমি কিনিতে পারিবেন এবং যেখানে খুশী বসবাস করিতে পারিবেন। বাংলার সুবাদার ইহা সত্ত্বেও নানারকমে ইংরেজ বণিকগণের প্রতিবন্ধকতা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তথাপি কলিকাতা ক্রমশই সমৃদ্ধ হইয়া উঠিল। ইহার ফলে মারাঠা আক্রমণের সময় দলে দলে লোক কলিকাতায় নিরাপদ আশ্রয় লাভ করিয়াছিল। ইহাও কলিকাতার উন্নতির অন্যতম কারণ।
