বিতাড়িত আফগান সৈন্যের পরিবর্তে নূতন সৈন্য নিযুক্ত করিয়া আলীবর্দী উড়িষ্যা পুনরধিকার করিবার জন্য সেনাপতি মীর জাফরকে প্রেরণ করেন। মীর জাফর মীর হবীরের এক সেনানায়ককে মেদিনীপুরের নিকট পরাজিত করেন (ডিসেম্বর, ১৭৪৬ খ্রীষ্টাব্দ)। কিন্তু বালেশ্বর হইতে মীর হবীর একদল মারাঠা সৈন্য সহ অগ্রসর হইলে মীর জাফর বর্ধমানে পলাইয়া যান। অতঃপর মীর জাফর ও রাজমহলের ফৌজদার নবাব আলীবর্দীকে গোপনে হত্যা করিবার চক্রান্ত করেন এবং নবাব উভয়কেই পদচ্যুত করেন। তারপর ৭১ বৎসরের বৃদ্ধ নবাব স্বয়ং অগ্রসর হইয়া মারাঠা সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করিলেন এবং বর্ধমান জিলা মারাঠাদের হাত হইতে উদ্ধার করিলেন (মার্চ, ১৭৭৭ খ্রীষ্টাব্দ)। কিন্তু উড়িষ্যা ও মেদিনীপুর মারাঠাদের হস্তে রহিল।
১৭৪৮ খ্রীষ্টাব্দের আরম্ভে আফগান অধিপতি আহম্মদ শাহ দুররাণী পঞ্জাব আক্রমণ করেন। এই সুযোগে আলীবর্দীর পদচ্যুত ও বিদ্রোহী আফগান সৈন্যদল তাহাদের বাসস্থান দ্বারভাঙ্গা জিলা হইতে অগ্রসর হইয়া পাটনা অধিকার করে। আলীবর্দীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হাজী আহমদের পুত্র জৈনুদ্দীন আহমদ (ইনি আলীবর্দীর জামাতাও) বিহারের নায়েব নাজিম ছিলেন। বিদ্রোহী আফগানেরা জৈনুদ্দীন ও হাজী আহমদ উভয়কেই বধ করে এবং আলীবর্দীর কন্যাকে বন্দী করে। দলে দলে আফগান সৈন্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়। উড়িষ্যা হইতে মীর হবীরের অধীনে একদল মারাঠা সৈন্যও পাটনার দিকে অগ্রসর হয়। আলীবর্দী অগ্রসর হইয়া ভাগলপুরের নিকটে মীর হবীরকে এবং পাটনার ২৬ মাইল পূর্বে গঙ্গার তীবরর্তী কালাদিয়ারা নামক স্থানে আফগানদের ও তাহাদের সাহায্যকারী মারাঠা সৈন্যদের পরাজিত করিয়া পাটনা অধিকার করেন এবং বন্দিনী কন্যাকে মুক্ত করেন (এপ্রিল, ১৭৪৮ খ্রীষ্টাব্দ)।
১৭৪৯ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে আলীবর্দী উড়িষ্যা আক্রমণ করেন এবং এক প্রকার বিনা বাধায় তাহা পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু তিনি ফিরিয়া আসিলেই মীর হবীরের মারাঠা সৈন্যরা পুনরায় উহা অধিকার করে।
অতঃপর উড়িষ্যা হইতে মারাঠা আক্রমণ প্রতিরোধ করিবার জন্য আলীবর্দী স্থায়িভাবে মেদিনীপুরে শিবির সন্নিবেশ করিলেন (অক্টোবর, ১৭৪৯ খ্রীষ্টাব্দ)। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও মীর হবীর পরবর্তী ফেব্রুয়ারী মাসে আবার বাংলাদেশে লুঠপাট আরম্ভ করিলেন এবং রাজধানী মুর্শিদাবাদের নিকটে পৌঁছিলেন। নবাব সেদিকে অগ্রসর হইলেই মীর হবীর পলাইয়া জঙ্গলে আশ্রয় লইলেন-আলীবর্দী মেদিনীপুরে ফিরিয়া গেলেন (এপ্রিল, ১৭৫০ খ্রীষ্টাব্দ) এবং সেখানে স্থায়িভাবে বসবাসের বন্দোবস্ত করিলেন। ইতিমধ্যে সংবাদ আসিল যে মৃত জৈনুদ্দীনের পুত্র এবং নবারের দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌল্লা পাটনা দখল করিবার জন্য সেখানে পৌঁছিয়াছেন। আলীবর্দী পাটনায় ছুটিয়া গেলেন, এবং গুরুতররূপে পীড়িত হইয়া মুর্শিদাবাদে ফিরিলেন। কিন্তু মারাঠা আক্রমণের ভয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হইবার পূর্বেই আবার তাঁহাকে কাটোয়া যাইতে হইল (ফেব্রুয়ারী, ১৭৫১ খ্রীষ্টাব্দ)।
বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া মুর্শিদাবাদের সিংহাসন অধিকার করার পর হইতেই উড়িষ্যার আধিপত্য লইয়া ভূতপূর্ব নবাবের জামাতা রুস্তম জঙ্গের সহিত আলীবর্দীর সংঘর্ষ আরম্ভ হয়। মারাঠা আক্রমণকে তাঁহার অবান্তর ফল বলা যাইতে পারে, কারণ রুস্তম জঙ্গের নায়েব মীর হবীরের সাহায্য ও সহযোগিতার ফলেই তাহারা নির্বিঘ্নে মেদিনীপুরের মধ্য দিয়া বাংলা দেশে আসিত। সুতরাং বিগত দশ বৎসর যাবৎ আলীবর্দীকে মীর হবীর ও মারাঠাদের সঙ্গে যে অবিশ্রাম যুদ্ধ করিতে হয়, তাহা তাঁহার পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত বলা যাইতে পারে। অবশ্য আলীবর্দী যে অপূর্ব সাহস, অধ্যবসায় ও রণকৌশলের পরিচয় দিয়াছিলেন, তাহা সর্বথা প্রশংসনীয়। কিন্তু ৭৫ বৎসরের বৃদ্ধ আর যুদ্ধ চালাইতে পারিলেন না। মারাঠারাও রণক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। সুতরাং ১৭৫১ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে নিম্নলিখিত তিনটি শর্তে এক সন্ধি হইল।
১। মীর হবীর আলীবর্দীর অধীনে উড়িষ্যার নায়েব নাজিম হইবেন–কিন্তু এই প্রদেশের উদ্বৃত্ত রাজস্ব মারাঠা সৈন্যের ব্যয় বাবদ রঘুজী ভোঁসলে পাইবেন।
২। ইহা ছাড়া চৌথ বাবদ বাংলার রাজস্ব হইতে প্রতি বৎসর ১২ লক্ষ টাকা রঘুজীকে দিতে হইবে।
৩। মারাঠা সৈন্য কখনও সুবর্ণরেখা নদী পার হইয়া বাংলা দেশে প্রবেশ করিতে পারিবে না।
সন্ধি হইবার এক বৎসর পরেই জনোজী ভেঁসলের মারাঠা সৈন্যরা মীর হবীরকে বধ করিয়া রঘুজীর এক সভাসদকে উড়িষ্যার নায়েব নাজিম পদে বসাইল (২৪শে অগস্ট, ১৭৫২ খ্রীষ্টাব্দ)। সুতরাং উড়িষ্যা মারাঠা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গেল।
বাংলা দেশে আবার শান্তি বিরাজ করিতে লাগিল। কিন্তু দিল্লির বাদশাহী হইতে স্বাধীনতার প্রথম ফলস্বরূপ বিগত দশ বারো বৎসরের যুদ্ধ বিগ্রহ ও অন্ত দ্বন্দ্বে বাংলার অবস্থা অতিশয় শোচনীয় হইয়া উঠিয়াছিল। আলীবর্দী শাসনসংক্রান্ত অনেক ব্যবস্থা করিয়াও বিশেষ কিছু করিয়া উঠিতে পারিলেন না। তারপর ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার এক দৌহিত্র ও পর বৎসর তাঁহার দুই জামাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্রের মৃত্যু হইল। আশী বৎসরের বৃদ্ধ নবাব এই সকল শোকে একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িলেন। ১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই এপ্রিল তাঁহার মৃত্যু হইল।
