ইতিমধ্যে দিল্লির বাদশাহ মারাঠারাজ সাহুকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় চৌথ আদায় করিবার অধিকার দিবেন এইরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন এবং সাহু নাগপুরের মারাঠারাজ রঘুজী ভোসলাকে ঐ অধিকার দান করিয়াছিলেন। কিন্তু দিল্লির বাদশাহ এই বিপদ হইতে রক্ষা পাইবার জন্য পেশোয়া বালাজী রাওর সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। বালাজী ও রঘুজীর মধ্যে বিষম শত্রুতা ছিল। সুতরাং বালাজী অভয় দিলেন যে ভোঁসলার মারাঠা সৈন্যদের তিনি বাংলা দেশ হইতে তাড়াইয়া দিবেন (নভেম্বর, ১৭৪২ খ্রীষ্টাব্দ)।
১৭৪৩ খ্রীষ্টাব্দের প্রথম ভাগে রঘুজী ভেসলা ভাস্কর পণ্ডিতকে সঙ্গে লইয়া বাংলা দেশ অভিমুখে অগ্রসর হইলেন এবং মার্চ মাসে কাটোয়ায় পৌঁছিলেন। ওদিকে পেশোয়া বালাজী রাও বিহারের মধ্য দিয়া বাংলা দেশের দিকে যাত্রা করিলেন। সারা পথ তাঁহার সৈন্যেরা লুঠপাট ও ঘর-বাড়ী-গ্রাম জ্বালাইতে লাগিল–যাঁহারা পেশোয়াকে টাকা-পয়সা বা মূল্যবান উপঢৌকন দিয়া খুশী করিতে পারিল তাহারাই রক্ষা পাইল।
ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে বহরমপুরের দশ মাইল দক্ষিণে নবাব আলীবর্দী ও পেশোয়া বালাজী রাওয়ের সাক্ষাৎ হইল (৩০শে মার্চ, ১৭৪৩ খ্রীষ্টাব্দ)। স্থির হইল যে বাংলার নবাব মারাঠারাজ সাহুকে চৌথ দিবেন এবং বালাজী রাওকে তাঁহার সামরিক অভিযানের ব্যয় বাবদ ২২ লক্ষ টাকা দিবেন। পেশোয়া কথা দিলেন যে ভেসলার অত্যাচার হইতে বাংলা দেশকে তিনি রক্ষা করিবেন।
রঘুজী ভেসলা এই সংবাদ পাইয়া কাটোয়া পরিত্যাগ করিয়া বীরভূমে গেলেন। বালাজী রাও তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিলেন এবং রঘুজীকে বাংলা দেশের সীমার বাহিরে তাড়াইয়া দিলেন। এই উপলক্ষে কলিকাতার বণিকগণ ২৫,০০০ টাকা চাঁদা তুলিয়া কলিকাতা রক্ষার জন্য মারাঠা ডিচ’ নামে খ্যাত পয়ঃপ্রণালী কাটাইয়াছিলেন। ১৭৪৩ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাস হইতে পরবর্তী ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বাংলা দেশ মারাঠা উৎপীড়ন হইতে রক্ষা পাইল।
ইতিমধ্যে মারাঠারাজ সাহু ভোসলা ও পেশোয়াকে ডাকাইয়া উভয়ের মধ্যে গোলমাল মিটাইয়া দিলেন (৩১শে অগস্ট, ১৭৪৩ খ্রীষ্টাব্দ)। বাংলার চৌথ আদায়ের বাঁটোয়ারা হইল। বিহারের পশ্চিম ভাগ পড়িল পেশোয়ার ভাগে, আর বাংলা, উড়িষ্যা ও বিহারের পূর্বভাগ পড়িল ভেসলার ভাগে। স্থির হইল যে, উভয়ের নিজেদের অংশে যথেচ্ছ লুঠতরাজ করিতে পারিবেন। একজন অপরজনকে বাধা দিতে পারিবেন না।
এই বন্দোবস্তের ফলে ভাস্কর পণ্ডিত পুনরায় মেদিনীপুরে প্রবেশ করিলেন (মার্চ, ১৭৪৪ খ্রীষ্টাব্দ)। সমস্ত ব্যাপার শুনিয়া আলীবর্দী প্রমাদ গণিলেন। বালাজী রাওকে যে উদ্দেশ্যে তিনি টাকা দিয়াছিলেন, তাহা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইল এবং আবার মারাঠাদের অত্যাচার আরম্ভ হইল। এদিকে তাঁহার রাজকোষ শূন্য; পুনঃ পুনঃ বর্গীর আক্রমণে দেশ বিধ্বস্ত এবং সৈন্যদল অবসাদগ্রস্ত; তখন নবাব আলীবর্দী ‘শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ’ এই নীতি অবলম্বন করিলেন। তিনি চৌথ সম্বন্ধে একটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত করিবার জন্য ভাস্কর পণ্ডিতকে তাঁহার শিবিরে আমন্ত্রণ করিলেন। ভাস্কর পণ্ডিত নবাবের তাঁবুতে পৌঁছিলে তাঁহার ২১ জন সেনানায়ক ও অনুচর সহ তাঁহাকে হত্যা করা হইল (৩১শে মার্চ, ১৭৪৪ খ্রীষ্টাব্দ)। অমনি মারাঠা সৈন্য বাংলা দেশ ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল।
নবাব আলীবর্দীর অধীনে ৯০০০ অশ্বারোহী ও কিছু পদাতিক আফগান সৈন্য ছিল। এই সৈন্যদলের অধ্যক্ষ গোলাম মুস্তাফা খান নবাবের অনুগত ও বিশ্বাসভাজন ছিলেন এবং তাঁহারই পরামর্শে ও সাহায্যে ভাস্কর পণ্ডিতকে নবাবের তাঁবুতে আনা সম্ভবপর হইয়াছিল। ভাস্কর পণ্ডিত নবাবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে ইতস্তত করিলে মুস্তাফা কোরানের শপথ করিয়া তাঁহাকে অভয় দেন এবং সঙ্গে করিয়া নবাবের তাঁবুতে আনিয়া হত্যা করেন। নবাব অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে মুস্তাফা ভাস্কর পণ্ডিত ও মারাঠা সেনানায়কদের হত্যা করিতে পারিলে তাহাকে বিহার প্রদেশের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিবেন। নবাব এই প্রতিশ্রুতি পালন না করায় মুস্তাফা বিহারে বিদ্রোহ করেন (ফেব্রুয়ারী, ১৭৪৫ খ্রীষ্টাব্দ) এবং রঘুজী ভোসলাকে বাংলা দেশ আক্রমণ করিতে উত্তেজিত করেন। মুস্তাফা পাটনার নিকট পরাজিত হন কিন্তু রঘুজী বর্ধমান পর্যন্ত অগ্রসর হন।
বর্ধমানে রাজকোষের সাত লক্ষ টাকা লুঠ করিয়া রঘুজী বীরভূমে বর্ষাকাল যাপন করেন এবং সেপ্টেম্বর মাসে বিহারে গিয়া বিদ্রোহী মুস্তাফার সঙ্গে যোগ দেন। নবাবের সৈন্য যখন বিহারে তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন, তখন উড়িষ্যার ভূতপূর্ব নায়েব মীর হবীরের সহযোগে মারাঠা সৈন্য মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করে (২১শে ডিসেম্বর, ১৭৪৫ খ্রীষ্টাব্দ)। আলীবর্দী বহু কষ্টে দ্রুতগতিতে মুর্শিদাবাদে প্রত্যাবর্তন করিলে রঘুজী কাটোয়ায় প্রস্থান করেন ও আলীবর্দীর হস্তে পরাজিত হন। পরে তিনি নাগপুরে ফিরিয়া যান কিন্তু মীর হবীর মারাঠা সৈন্যসহ কাটোয়াতে অবস্থান করেন। পরে আলীবর্দী তাহাকেও পরাজিত করেন (এপ্রিল, ১৭৪৬ খ্রীষ্টাব্দ)। এই সব গোলমালের সময় আলীবর্দীর আরও দুইজন আফগান সেনানায়ক মারাঠাদের সহিত গোপনে ষড়যন্ত্র করায় নবাব তাঁহাদিগকে পদচ্যুত করিয়া বাংলা দেশের সীমানার বাহিরে বিতাড়িত করেন।
