৪
আলীবর্দী খান
আলীবর্দী খানও সুখে বা শান্তিতে বাংলার নবাবী করিতে পারেন নাই। নবাব শুজাউদ্দীনের জামাতা রুস্তম জং উড়িষ্যার নায়েব নাজিম ছিলেন–তিনি সসৈন্যে কটক হইতে বাংলা দেশ অভিমুখে যাত্রা করিলেন (ডিসেম্বর, ১৭৪০ খ্রীষ্টাব্দ)। আলীবর্দী নিজে তাঁহার বিরুদ্ধে অগ্রসর হইয়া বালেশ্বরের অনতিদূরে ফলওয়ারির যুদ্ধে তাঁহাকে পরাজিত করিলেন (মার্চ, ১৭৪১ খ্রীষ্টাব্দ)। আলীবর্দী তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্রকে উড়িষ্যার নায়েব নাজিম নিযুক্ত করিয়া মুর্শিদাবাদে ফিরিলেন। কিন্তু এই নূতন নায়েব নাজিমের অযোগ্যতা ও দুর্ব্যবহারে প্রজাগণ অসন্তুষ্ট হওয়ায় রুস্ত ম জং একদল মারাঠা সৈন্যের সাহায্যে পুনরায় উড়িষ্যা দখল করিলেন। নূতন নায়েব নাজিম সপরিবারে বন্দী হইলেন (অগস্ট, ১৭৪১ খ্রীষ্টাব্দ)। আলীবর্দী আবার উড়িষ্যায় গিয়া রুস্তম জংয়ের সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করিলেন (ডিসেম্বর, ১৭৪১ খ্রীষ্টাব্দ)। মুর্শিদাবাদ ফিরিবার পথে আলীবর্দী সংবাদ পাইলেন যে নাগপুর হইতে ভেঁসলারাজের মারাঠা সৈন্য বাংলা দেশের অভিমুখে আসিতেছে।
মারাঠা সৈন্য পাঁচেকের মধ্য দিয়া বর্ধমান জিলায় পৌঁছিয়া লুঠপাট আরম্ভ করিল। নবাব দ্রুতগতিতে বর্ধমানে পৌঁছিলেন (এপ্রিল, ১৭৪২ খ্রীষ্টাব্দ), কিন্তু অসংখ্য মারাঠা সৈন্য তাঁহাকে ঘিরিয়া ফেলিল। তাঁহার সঙ্গে ছিল মাত্র তিন হাজার অশ্বারোহী ও এক হাজার পদাতিক–বাকী সৈন্য পূর্বেই মুর্শিদাবাদে ফিরিয়া গিয়াছিল। আলীবর্দী বর্ধমানে অবরুদ্ধ হইয়া রহিলেন এবং মারাঠারা তাঁহার রসদ সরবরাহ বন্ধ করিয়া ফেলিল। অবশেষে কোন মতে মারাঠা ব্যুহ ভেদ করিয়া বহু কষ্টে তিনি কাটোয়ায় পৌঁছিলেন। মারাঠা বাহিনীর নায়ক ভাস্কর পণ্ডিত ফিরিয়া যাইতে মনস্থ করিলেন, কিন্তু পরাজিত ও বিতাড়িত রুস্তম জংয়ের বিচক্ষণ নায়েব মীর হবীবের পরামর্শ ও সাহায্যে পুনরায় যুদ্ধ চালাইলেন। একদল মারাঠা নবাবের পশ্চাদ্ধাবন করিল-বাকী মারাঠারা চতুর্দিকে গ্রাম জ্বালাইয়া ধনসম্পত্তি লুঠ করিয়া ফিরিতে লাগিল। মীর হবীরের সহায়তায় মারাঠা নায়ক ভাস্কর পণ্ডিত এক রাত্রির মধ্যে ৭০০ অশ্বারোহী সৈন্যসহ ৪০ মাইল পার হইয়া মুর্শিদাবাদ শহর আক্রমণ করিয়া সারাদিন লুঠ করিলেন–পরদিন সকালে (৭ই মে, ১৭৪২ খ্রীষ্টাব্দ) আলীবর্দী মুর্শিদাবাদে পৌঁছিলে, মারাঠা সৈন্য কাটোয়া অধিকার করিল এবং ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে রাজমহল হইতে মেদিনীপুর ও জলেশ্বর পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ড মারাঠাদের শাসনাধীন হইল। এই অঞ্চলে মারাঠারা অকথ্য অত্যাচার করিতে লাগিল। ব্যবসায় বাণিজ্য ও শিল্প পোপ পাইল। লোকেরা ধন, প্রাণ ও মান রক্ষার জন্য দলে দলে ভাগীরথীর পূর্ব দিকে পলাইতে লাগিল। সমসাময়িক ইংরেজ ও বাঙালী লেখকরা এই বীভৎস অত্যাচারের যে কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়াছেন তাহা চিরদিন মারাঠা জাতির ইতিহাসে কলঙ্কের বিষয় হইয়া থাকিবে। বাঙালীরা মারাঠা সৈন্যদিগকে ‘বর্গী’ বলিত। বাংলা দেশে মারাঠা সৈন্যদের মধ্যে এক শ্রেণীর নাম ছিল শিলাদার। ইহারা নিজেদের ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র লইয়া যুদ্ধ করিত। নিম্নশ্রেণীর যে সমুদয় সৈন্যদের অশ্ব ও অস্ত্র মারাঠা সরকার দিতেন তাহাদের নাম ছিল বার্গীর! বর্গী এই বার্গীরেরই অপভ্রংশ। বর্গীদের অত্যাচার সম্বন্ধে সমসাময়িক গঙ্গারাম কর্ত্তৃক রচিত মহারাষ্ট্র পুরাণ হইতে কয়েক ছত্র উদ্ধৃত করিতেছি :
ছোট বড় গ্রামে জত লোক ছিল।
বরগির ভএ সব পলাইল ॥
চাইর দিগে তোক পলাঞ ঠাঞি ঠাঞি।
ছত্তিস বর্ণের লোক পলাএ তার অন্ত নাঞি ॥
এই মতে সব লোক পলাইয়া জাইতে।
আচম্বিতে বরগি ঘেরিলা আইসা সাথে ॥
মাঠে ঘেরিয়া বরগি দেয় তবে সাড়া।
সোনা রূপা লুটে নেএ আর সব ছাড়া ॥
কারূ হাত কাটে কারূ নাক কান।
একি চোটে কারা বধএ পরাণ ॥
ভাল ভাল স্ত্রীলোক জত ধইরা লইয়া জাএ।
অঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলাএ।
একজনে ছাড়ে তারে আর জনা ধরে।
রমণের ভরে ত্রাহি শব্দ করে ॥
এই মতে বরগি কত পাপ কৰ্ম্ম কইরা।
সেই সব স্ত্রীলোকে জত দেয় সব ছাইড়া ॥
তবে মাঠে লুটিয়া বরগি গ্রামে সাধাএ।
বড় বড় ঘর আইসা আগুনি লাগাএ।
বাঙ্গালা চৌআরি জত বিষ্ণু মোণ্ডব।
ছোট বড় ঘরে আদি পোড়াইল সব ॥
এই মতে জতসব গ্রাম পোড়াইয়া।
চতুর্দিগে বরগি বেড়াএ লুটিয়া ॥
কাহুকে বাঁধে বরগি দিআ পিঠ মোড়া।
চিত কইরা মারে লাথি পাএ জুতা চড়া ॥
রূপি দেহ দেহ বোলে বারে বারে।
রূপি না পাইয়া তবে নাকে জল ভরে ॥
কাহুকে ধরিয়া বরগি পখইরে ডুবা।
ফাঁকর হইঞা তবে কারু প্রাণ জাএ।
–মহারাষ্ট্র পুরাণ, চিন্তয়সী সংস্করণ, ১৩৭৩
আলীবর্দী নিশ্চিত ছিলেন না। বর্ষাকালে পাটনা ও পূর্ণিয়া হইতে সৈন্য সংগ্রহ করিয়া বর্ষাশেষে তিনি কাটোয়া আক্রমণ করিলেন। মারাঠা লুঠপাটের টাকায় খুব ধুমধামের সহিত দুর্গা পূজা করিতেছিল–কিন্তু সারারাত্রি চলিয়া ঘোরাপথে আসিয়া আলীবর্দীর সৈন্য সহসা নবমী পূজার দিন সকালবেলা নিদ্রিত মারাঠা সৈন্যকে আক্রমণ করিল। মারাঠারা বিনা যুদ্ধে পলাইয়া গেল। ভাস্কর পণ্ডিত পলাতক মারাঠা সৈন্য সংগ্রহ করিয়া মেদিনীপুর অঞ্চল লুঠিতে লাগিলেন এবং কটক অধিকার করিলেন। আলীবর্দী সসৈন্যে অগ্রসর হইয়া কটক পুনরধিকার করিলেন এবং মারাঠারা চিল্কা হ্রদের দক্ষিণে পলাইয়া গেল (ডিসেম্বর, ১৭৪২ খ্রীষ্টাব্দ)।
