ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বাহাদুর শাহ সম্রাট হইলেন (১৭০৭ খ্রীষ্টাব্দ)। পুত্র আজিমুসসানের প্ররোচনায় সম্রাট মুর্শিদকুলী খানকে দাক্ষিণাত্যের দিওয়ান করিয়া পাঠাইলেন। কিন্তু বাংলার নতুন দিওয়ান বিদ্রোহী সেনার হস্তে নিহত হওয়ায় মুর্শিদকুলী খান পুনরায় বাংলার দিওয়ান নিযুক্ত হইলেন (১৭১০ খ্রীষ্টাব্দ)।
১০. নবাবী আমল
দশম পরিচ্ছেদ – নবাবী আমল
১
মুর্শিদকুলী খান
১৭১৭ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদকুলী খান বাংলার সুবাদার বা নবাব নিযুক্ত হইলেন। এই সময়ে দিল্লির অকর্মণ্য সম্রাটগণের দুর্বলতায় ও আত্মকলহে মুঘল সাম্রাজ্য চরম দুর্দশায় পৌঁছিয়াছিল। সুতরাং এখন হইতে বাংলার সুবাদারেরা প্রায় স্বাধীন ভাবেই কার্য করিতে লাগিলেন এবং বংশানুক্রমে সুবাদার বা নবাবের পদ অধিকার করিতে লাগিলেন। ইহার ফলে বাংলায় নবাবী আমল আরম্ভ হইল। কিন্তু বাংলা হইতে দিল্লি দরবারে রাজস্ব পাঠান হইত এবং বাদশাহী সনদের বলেই সুবাদারী পদে নূতন নিয়োগ হইত।
মুর্শিদকুলী খান ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু বাল্যকালে একজন মুসলমান তাঁহাকে ক্রয় করিয়া পুত্রবৎ পালন করে এবং পারস্য দেশে লইয়া যান। সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া মুর্শিদকুলী খান বহু উচ্চ পদ অধিকার করেন এবং অবশেষে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। মুর্শিদকুলী বহুকাল সুযোগ্যতার সহিত দিওয়ানী কার্য করিয়াছিলেন, সুতরাং সুবাদার হইয়াও রাজস্ব-বিভাগের দিকে তিনি খুব বেশি ঝোঁক দিতেন। পরে এ সম্বন্ধে বিশদভাবে আলোচনা করা হইবে। তাঁহার সময়ে দেশে শান্তি বিরাজ করিত এবং ছোটখাট বিদ্রোহ সহজেই দমিত হইত। এইরূপ ঘটনার মধ্যে সীতারাম রায়ের সহিত যুদ্ধই প্রধান। ইহাও পরে আলোচিত হইবে। মুর্শিদকুলী খানের শাসনকালে আর কোনও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে নাই।
২
শুজাউদ্দীন মুহম্মদ খান
মুর্শিদকুলী খানের কোন পুত্র-সন্তান ছিল না। তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার জামাতা শুজাউদ্দীন মুহম্মদ খান মুর্শিদকুলীর দৌহিত্র ও মনোনীত উত্তরাধিকারী সরফরাজ খানকে না মানিয়া নিজেই বাংলা ও উড়িষ্যার সুবাদারের পদে অধিষ্ঠিত হইলেন (জুন, ১৭২৭ খ্রীষ্টাব্দ)। হাজী আহমদ এবং আলীবর্দী নামক দুই ভ্রাতা, রাজস্ব বিভাগের বিচক্ষণ কর্মচারী আলমচাঁদ এবং বিখ্যাত ধনী জগৎশেঠ ফতোদ তাঁহার সভায় খুব প্রতিপত্তি লাভ করিলেন।
শুজাউদ্দীনের অনেক গুণ ছিল, কিন্তু তিনি বিলাসী ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ হওয়ায় ক্রমে রাজকার্য বিশেষ কিছু দেখিতেন না এবং উপরোক্ত চারিজনের উপরই নির্ভর করিতেন। দিল্লির বাদশাহও প্রাদেশিক ব্যাপারে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করিতেন না। সুতরাং নবাবের অনুগ্রহভাজন বিশ্বস্ত কর্মচারীরা নিজেদের স্বার্থ সাধন করার প্রচুর সুযোগ পাইলেন এবং ইহার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিলেন। নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য ইহারা নবাবের সহিত তাঁহার পুত্রদ্বয়ের কলহ ঘটাইতেন।
১৭৩৩ খ্রীস্টাব্দে বিহার প্রদেশ বাংলা সুবার সহিত যুক্ত হইল। তখন শুজাউদ্দীন বাংলাকে দুই ভাগ করিয়া পশ্চিম, মধ্য ও উত্তর বাংলার কতক অংশের শাসনভার নিজের হাতে রাখিলেন; পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর বাংলায় অবশিষ্ট অংশের জন্য ঢাকায় একজন এবং বিহার ও উড়িষ্যা শাসনের জন্য আরও দুইজন নায়েব নাজিম নিযুক্ত হইলেন। আলীবর্দী খান বিহারের প্রথম নায়েব নাজিম হইলেন। মীর হবীর গ্রামে ঢাকার নায়েব নাজিমের একজন দক্ষ কর্মচারী ত্রিপুরার রাজপরিবারের অন্তর্কলহের সুযোগ লইয়া সহসা ত্রিপুরা আক্রমণ করিয়া রাজধানী চণ্ডগড় ও রাজ্যের অন্যান্য অংশ দখল ও বহু ধনরত্ন লুণ্ঠন করিয়া আনিলেন। বীরভূমের আফগান জমিদার বদিউজ্জমান বিদ্রোহ করিয়াছিলেন, কিন্তু শীঘ্রই বশ্যতা স্বীকার করিতে বাধ্য হইলেন। শুজাউদ্দীনের শাসনকালে ঢাকায় চাউলের দর আবার টাকায় আট মণ হইয়াছিল।
৩
সরফরাজ খান
শুজাউদ্দীনের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র সরফরাজ খান বাংলার নবাব হইলেন (মার্চ, ১৭৩৯ খ্রীষ্টাব্দ)। সরফরাজ একেবারে অপদার্থ এবং নবাবী পদের সম্পূর্ণ অযোগ্য ছিলেন এবং অধিকাংশ সময়েই হারেমে কাটাইতেন। সুতরাং শাসন কার্যে বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইল এবং নানা প্রকার ষড়যন্ত্রের সৃষ্টি হইল। হাজী আহ্মদ ও আলীবর্দী খান এই সুযোগে বাংলা দেশে প্রভুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। হাজী আহমদ মুর্শিদাবাদ দরবারে নবাবের বিশ্বস্ত কর্মচারীরূপে তাঁহাকে স্তে কিবাক্যে তুষ্ট রাখিলেন–ওদিকে আলীবর্দী খান পাটনা হইতে সসৈন্যে বাংলার দিকে যাত্রা করিলেন (মার্চ, ১৭৪০ খ্রীষ্টাব্দ)। হাজী আহমদ মিথ্যা আশ্বাসে নবাবকে ভুলাইয়া অবশেষে সপরিবারে আলীবর্দীর সঙ্গে যোগ দিলেন।
সরফরাজ খান সসৈন্যে অগ্রসর হইয়া বর্তমান সুতীর নিকটে গিরিয়াতে পৌঁছিলেন। ১৭৪০ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই এপ্রিল গিরিয়াতে দুই পক্ষের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হইল। এই যুদ্ধে সরফরাজ পরাজিত ও নিহত হইলেন। দুই তিন দিন পরে আলীবর্দী মুর্শিদাবাদ অধিকার করিলেন। তিনি মৃত নবাবের পরিবারবর্গের প্রতি খুব সদয় ব্যবহার করিলেন এবং তাঁহারা যাহাতে যথোচিত মর্যাদার সহিত জীবন যাপন করিতে পারেন, তাঁহার ব্যবস্থা করিলেন। আলীবর্দী তাঁহার উপকারী প্রভুর পুত্রকে হত্যা করিয়া মহাপাপ করিয়াছিলেন, সন্দেহ নাই। তিনিও তাহা স্বীকার করিয়া সরফরাজের আত্মীয় স্বজনের নিকট দুঃখ ও অনুতাপ প্রকাশ করিলেন। তাঁহার দুষ্কর্মের জন্য তাঁহার প্রতি জনসাধারণের বিরাগ ও অশ্রদ্ধা দূর করিতে তিনি সকলের সহিত সদয় ব্যবহার ও অনেককে অর্থ দিয়া তুষ্ট করিলেন। দিল্লির বাদশাহ এবং তাঁহার প্রধান সভাসদগণকে প্রচুর উৎকোচ প্রদান করিয়া তিনি সুবাদারী পদের বাদশাহী সনদ পাইলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের যে কতদূর অবনতি ঘটিয়াছিল ইহা হইতেই তাহা বুঝা যায়।
