শায়েস্তা খানের নাম বাংলা দেশে এখনও খুব পরিচিত। তাঁহার সময় বাংলা দেশে টাকায় আট মণ চাউল পাওয়া যাইত। ১৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে বাংলা দেশের চাউলের দাম ছিল টাকায় পাঁচ মণ। পূর্ববঙ্গে বহু চাউল উৎপন্ন হয় সুতরাং ঢাকায় চাউল আরও সস্তা হইবার কথা। এই চাউলের দামের কথা স্মরণ রাখিলে শায়েস্তা খানের দৈনিক আয় দুই লক্ষ আর দৈনিক ব্যয় এক লক্ষ টাকার প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাইবে। এই এক লক্ষ টাকা ব্যয়ের পশ্চাতে যে দালান-ইমারত নির্মাণ, জাঁকজমক, দান-দক্ষিণা, আশ্রিত-পোষণ প্রভৃতি ছিল তাহাই সম্ভবত শায়েস্তা খানের লোকপ্রিয়তার কারণ।
শায়েস্তা খানের পর ঔরঙ্গজেবের ধাত্রীপুত্র অপদার্থ খান-ই-জহান বাহাদুর বাংলার সুবাদার হইলেন। এক বৎসর পরেই এই অপদার্থকে পদচ্যুত করা হইল। কিন্তু তিনি যাওয়ার সময় দুই কোটি টাকা লইয়া গেলেন। তাঁহার পর আসিলেন ইব্রাহিম খান। ইহার শাসনকালের প্রধান ঘটনা মেদিনীপুর জিলার অন্তর্গত ঘাটালের চন্দ্রকোণা বিভাগের একজন সাধারণ জমিদার শোভাসিংহের বিদ্রোহ। রাজা কৃষ্ণরাম নামে একজন পাঞ্জাবী বর্ধমান জিলার রাজস্ব আদায়ের ইজারা লইয়া ছিলেন। শোভসিংহ পার্শ্ববর্তী স্থানে লুঠতরাজ আরম্ভ করিলে কৃষ্ণরাম তাঁহাকে বাধা দিতে গিয়া নিহত হন (জানুয়ারী, ১৬৯৬ খ্রীষ্টাব্দ) এবং শোভারাম বর্ধমান দখল করেন। এইরূপে অর্থসংগ্রহ করিয়া শোভসিংহ অনুচরের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন এবং রাজা উপাধি ধারণ করেন। উড়িষ্যার পাঠান সর্দার রহিম খান তাঁহার সহিত যোগদান করায় তাঁহার শক্তি বৃদ্ধি হয় এবং গঙ্গানদীর পশ্চিম তীরে হুগলির উত্তর ও দক্ষিণে ১৮০ মাইল বিস্তৃত ভূখণ্ড তাঁহার হস্তগত হয়। সুবাদার ইব্রাহিম খান এই বিদ্রোহের ব্যাপারে কোনরূপ গুরুত্ব আরোপ না করিয়া পশ্চিম বাংলার ফৌজদারকে বিদ্রোহ দমন করিতে আদেশ দিলেন। উক্ত ফৌজদার প্রথমে হুগলি দুর্গে আশ্রয় লইলেন, পরে বেগতিক দেখিয়া একরাত্রে পলায়ন করিলেন। শোভাসিংহের সৈন্য হুগলিতে প্রবেশ করিয়া শহর লুঠ করিল। ওলন্দাজ বণিকেরা পলায়মান ফৌজদার ও হুগলির লোকদের কাতর প্রার্থনায় একদল সৈন্য পাঠাইলে শোভসিংহ হুগলি ত্যাগ করিয়া বর্ধমানে গেলেন। তিনি রাজা কৃষ্ণরামের কন্যার উপর বলাৎকার করিতে উদ্যত হইলে এই তেজস্বিনী নারী প্রথমে ছুরিকা দ্বারা শোভসিংহকে হত্যা করেন–তারপর নিজের বুকে ছুরি বসাইয়া প্রাণত্যাগ করেন। শোভাসিংহের পর তাঁহার ভ্রাতা হিম্মৎসিংহ দলের কর্ত্তা হইলেন, কিন্তু সৈন্যেরা রহিম খানকেই নায়ক মনোনীত করিল। রহিম খান রহিম শাহ নাম ধারণ করিয়া নিজেকে রাজপদে অভিষিক্ত করিলেন। চারিদিক হইতে নানা শ্রেণীর লোক দলে দলে আসিয়া তাঁহার সঙ্গে যোগ দিল এবং ক্রমে তিনি দশ সহস্র ঘোড়সওয়ার ও ৬০,০০০ পদাতিক সংগ্রহ করিয়া নদীয়ার মধ্য দিয়া মখসুদাবাদ (বর্তমান মুর্শিদাবাদ) অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। পথে একজন জায়গীরদার ও পাঁচ হাজার মুঘলসৈন্যকে পরাজিত করিয়া তিনি মখসুদাবাদ লুণ্ঠন করিলেন এবং রাজমহল ও মালদহ অধিকার করিলেন। তাঁহার অনুচরেরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হইয়া চারিদিকে লুঠপাট করিয়া ফিরিতে লাগিল (১৬৯৬-৯৭ খ্রিস্টাব্দ)।
এই সংবাদ পাইয়া ঔরঙ্গজেব ইব্রাহিম খানকে পদচ্যুত করিয়া পরবর্তীকালে আজিমুসসান নামে পরিচিত নিজের পৌত্র আজিমুদ্দীনকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করিলেন এবং রহিম খানের পুত্র জবরদস্ত খানকে অবিলম্বে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে আদেশ দিলেন। জবরদস্ত খান বিদ্রোহী রহিম শাহকে পরাজিত করিয়া রাজমহল, মালদহ, মখসুদাবাদ, বর্ধমান প্রভৃতি স্থান অধিকার করিলেন। রহিম শাহ পলাইয়া জঙ্গলে আশ্রয় লইলেন।
আজিমুসসান বাংলা দেশে পৌঁছিয়া জবরদস্ত খানের কৃতিত্বের সম্মান করা দূরে থাকুক, তাঁহার প্রতি তাচ্ছিল্যের ভাব দেখাইলেন। ইহাতে ক্ষুণ্ণ হইয়া জবরদস্ত খান বাংলা দেশ ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। ফলে রহিম শাহ জঙ্গল হইতে বাহির হইয়া আবার লুঠপাট আরম্ভ করিলেন এবং বর্ধমানের দিকে অগ্রসর হইয়া সন্ধির প্রস্তাব আলোচনার ছলে সুবাদারের প্রধান মন্ত্রীকে হত্যা করিলেন। তখন আজিমুসসান তাঁহার বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী পাঠাইলেন। এই বাহিনীর সহিত যুদ্ধে রহিম শাহ পরাজিত ও নিহত হইলেন। বিদ্রোহীদের দল ভাঙ্গিয়া গেল। (অগস্ট, ১৬৯৮ খ্রীষ্টাব্দ)।
ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষভাগে বাংলা (ও অন্যান্য) সুবার শাসনপ্রণালীর কিরূপ অবনতি হইয়াছিল, তাহা বুঝাইবার জন্য শোভাসিংহের বিদ্রোহ বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইল। আর একটি বিষয়ও উল্লেখযোগ্য। এই বিদ্রোহের সময় কলিকাতা, চন্দননগর উঁচড়ার ইংরেজ, ফরাসী ও ওলন্দাজ বণিকেরা সুবাদারের অনুমতি লইয়া নিজেদের বাণিজ্য-কুঠিগুলি দুর্গের ন্যায় সুরক্ষিত করিল এবং এই সমস্ত স্থানই এই ঘোর দুর্দিনে বাঙালীর একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল হইয়া উঠিল। বাংলার ভবিষ্যৎ ইতিহাসে ইহার প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হইয়াছিল।
আজিমুসসান ১৬৯৮ খ্রীষ্টাব্দ হইতে ১৭১২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার সুবাদার ছিলেন। শেষ দশ বৎসর তিনি বিহারেরও সুবাদার ছিলেন এবং ১৭০৪ খ্রীষ্টাব্দ হইতে পাটনায় বাস করিতেন। তিনি জানিতেন যে বৃদ্ধ সম্রাটের মৃত্যু হইলেই সিংহাসন লইয়া যুদ্ধ বাধিবে এবং এই জন্যই তিনি নানা অবৈধ উপায়ে এবং অনেক সময় প্রজাদের উৎপীড়ন করিয়া অর্থ সংগ্রহ করিতেন। কিন্তু দিওয়ান মুর্শিদকুলী খান খুব দক্ষ ও নিষ্ঠাবান কর্মচারী ছিলেন। তিনি আজিমুসসানের অবৈধ অর্থ সংগ্রহের পথ বন্ধ করিয়া দিলেন। ইহাতে ক্রুদ্ধ হইয়া আজিমুসসান মুর্শিদকুলী খানকে হত্যা করিবার জন্য ষড়যন্ত্র করিলেন। ইহা ব্যর্থ হইল, কিন্তু মুর্শিদকুলী খান সমস্ত ব্যাপার সম্রাটকে জানাইয়া অবিলম্বে দিওয়ানী বিভাগ মখসুদাবাদে সরাইয়া নিলেন। বহু বৎসর পরে সম্রাটের অনুমতিক্রমে মুর্শিদকুলীর নাম অনুসারে এই নগরীর নাম হয় মুর্শিদাবাদ।
