৬
সম্রাট শাহজাহান ও ঔরঙ্গজেবের আমলে বাংলা দেশের অবস্থা
সম্রাট শাহজাহানের সিংহাসনে আরোহণ (১৬২৮ খ্রী) হইতে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু (১৭০৭ খ্রী) পর্যন্ত বাংলা দেশে মুঘল শাসন মোটামুটি শান্তিতেই পরিচালিত হইয়াছিল। এই সুদীর্ঘকালের মধ্যে তিনজন সুবাদারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। (১) শাহজাহানের পুত্র শুজা (১৬৩৯-১৬৫৯ খ্রী), (২) শায়েস্তা খান (১৬৬৪-১৬৮৮ খ্রী) এবং (৩) ঔরঙ্গজেবের পৌত্র আজিমুস্সান (১৬৯৮-১৭০৭ খ্রী)। এই যুগে বাংলার কোন স্বতন্ত্র ইতিহাস ছিল না। ইহা মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসেরই অংশে পরিণত হইয়াছিল এবং ইহার শাসনপ্রণালীও মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যান্য সুবার ন্যায় নির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালিত হইত।
শাহজাহানের রাজত্বের প্রথম ভাগে হুগলি বন্দর হইতে পর্তুগীজদিগকে বিতাড়িত করা হয় (১৬৩২ খ্রী)। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা হইবে। অহহাদিগের সহিতও পুনরায় যুদ্ধ হয়। ১৬১৫ খ্রীষ্টাব্দে মুঘলসৈন্য অহোম রাজার হস্তে পরাজিত হয়। কামরূপের রাজা পরীক্ষিত্নারায়ণ কাশিম খানের হস্তে বন্দী হওয়ায় যে বিদ্রোহ উপস্থিত হইয়াছিল, তাহা পূর্বেই উক্ত হইয়াছে। ১৬১৫ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যুর পর চাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা বলিনারায়ণ মুঘল-বিজয়ী অহোম রাজার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ইহার ফলে অহোরাজ ও বাংলার মুঘল সুবাদারের মধ্যে বহুবর্ষব্যাপী যুদ্ধ চলে। বলিনারায়ণ মুঘলসৈন্যদের পরাজিত করিয়া কামরূপের ফৌজদারকে বন্দী করেন। বহুদিন যুদ্ধের পর অবশেষে মুঘলদেরই জয় হইল। মুঘলেরা কামরূপ জয় করিয়া অহোম রাজার সহিত সন্ধি করিল (১৬৩৮ খ্রী)। উত্তরে বরা নদী ও দক্ষিণে অসুরালি দুই রাজ্যের সীমানা নির্দিষ্ট হইল।
অতঃপর শুজার সুদীর্ঘ শান্তিপূর্ণ শাসনের ফলে বাংলা দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও ধনসম্পদ বৃদ্ধি হয় (১৬২৯-৫৯ খ্রী)। কিন্তু সিংহাসন লাভের জন্য ভ্রাতা ঔরঙ্গজেবের সহিত বিবাদের ফলে শুজা খাজুয়ার যুদ্ধে পরাস্ত হইয়া পলায়ন করেন (জানুয়ারী, ১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দে)। মুঘল সেনাপতি মীরজুমলা তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিয়া ঢাকা নগরী দখল করেন (মে, ১৬৬০ খ্রীষ্টাব্দ)। শুজা আরাকানে পলাইয়া গেলেন। দুই বৎসর পরে আরাকানরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার অভিযোগে তিনি নিহত হইলেন।
অতঃপর মীরজুমলা বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হইলেন (জুন, ১৬৬০ খ্রীষ্টাব্দ)। শুজা যখন ঔরঙ্গজেবের সহিত যুদ্ধ করিতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন সুযোগ বুঝিয়া কোচবিহারের রাজা কামরূপ ও অহোম্রাজ গৌহাটি অধিকার করিলেন (মার্চ, ১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দ)। তারপর এই দুই রাজার মধ্যে বিবাদের ফলে অহোরাজ কোচবিহাররাজকে বিতাড়িত করিয়া কামরূপ অধিকার করেন (মার্চ, ১৬৬০ খ্রীষ্টাব্দ)।
মীরজুমলা সুবাদার নিযুক্ত হইয়াই কোচবিহার ও কামরূপের বিরুদ্ধে এক বিপুল অভিযান প্রেরণ করিলেন (১৬৬১ খ্রীষ্টাব্দ)। কোচবিহাররাজ পলায়ন করায় বিনা যুদ্ধে মীরজুমলা এই রাজ্য অধিকার করিলেন এবং অহোম্রাজের বিরুদ্ধে অগ্রসর হইলেন। অহোরাজও পলায়ন করিলেন এবং তাঁহার রাজধানী মীরজুমলার হস্তগত হইল (মার্চ, ১৬৬২ খ্রীষ্টাব্দ)। বর্ষা আসিলে সমস্ত দেশ জলে ডুবিয়া যাওয়ায় মুঘল ঘাঁটিগুলি পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িল এবং খাদ্য সরবরাহেরও কোন উপায় রহিল না। মুঘল শিবির জলে ডুবিয়া গেল, খাদ্যভাবে বহু অশ্ব মারা গেল, সংক্রামক ব্যাধি দেখা দিল এবং বহু সৈন্যের মৃত্যু হইল। সুযোগ বুঝিয়া অহোম্ সৈন্য পুনঃপুনঃ মুঘল শিবির আক্রমণ করিল। অবশেষে বর্ষার শেষ হইলে এই দুঃখকষ্টের অবসান হইল। মীরজুমলা সৈন্যসহ অহোম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অগ্রসর হইলেন। কিন্তু অকস্মাৎ তিনি গুরুতর পীড়ায় আক্রান্ত হইয়া পড়িলেন। তখন অহোম্রাজের সহিত সন্ধি করিয়া মুঘলসৈন্য বাংলা দেশে ফিরিয়া আসিল। কিন্তু ঢাকায় পৌঁছিবার পূর্বে মাত্র কয়েক মাইল দূরে তাঁহার মৃত্যু হইল (মার্চ, ১৬৬৩ খ্রী)। এই সমুদয় গোলযোগের মধ্যে কোচবিহারের রাজা তাঁহার রাজ্য পুনরুদ্ধার করিলেন।
মীরজুমলার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রায় এক বৎসর যাবৎ বাংলা দেশের শাসনকার্যে নানা বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। ১৬৬৪ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে শায়েস্তা খান বাংলা দেশের সুবাদার হইয়া আসিলেন। মাঝখানে এক বৎসর বাদ দিয়া মোট ২২ বৎসর তিনি এই পদে নিযুক্ত ছিলেন। শায়েস্তা খান রাজোচিত ঐশ্বর্য ও জাঁকজমকের সহিত নিরুদ্বেগে জীবন কাটাইতেন এবং সম্রাটকে বহু অর্থ পাঠাইয়া খুশি রাখিতেন। বলা বাহুল্য নানা উপায়ে প্রজার রক্ত শোষণ করিয়াই এই টাকা আদায় হইত। একচেটিয়া ব্যবসায়ের দ্বারাও অনেক টাকা আয় হইত। সমসাময়িক ইংরেজদের রিপোর্টে শায়েস্তা খানের অর্থগৃধনুতার উল্লেখ আছে। তাঁহার সুবাদারীর প্রথম ১৩ বৎসরে তিনি ৩৮ কোটি টাকা সঞ্চয় করিয়াছিলেন। তাঁহার দৈনিক আয় ছিল দুই লক্ষ টাকা আর ব্যয় ছিল এক লক্ষ টাকা।
বৃদ্ধ শায়েস্তা খান নিজে যুদ্ধে যাইতেন না এবং হারেমে আরামে দিন কাটাইতেন কিন্তু উপযুক্ত কর্মচারীর সাহায্যে তিনি কঠোর হস্তে ও শৃঙ্খলার সহিত দেশ শাসন করিতেন। তিনি কুচবিহারের বিদ্রোহী রাজাকে তাড়াইয়া পুনরায় ঐ রাজ্য মুঘলের অধীনে আনয়ন করিলেন এবং ছোটখাট বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করিলেন। তাঁহার শাসনকালের প্রধান ঘটনা চট্টগ্রাম বিজয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আরাকানের রাজা চট্টগ্রাম জয় করিয়াছিলেন এবং ইহা মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। ইহারা বাংলা দেশ হইতে বহু লোক বন্দী করিয়া নিত, তাহাদের হাতে ছিদ্র করিয়া তাঁহার মধ্য দিয়া বেত চালাইয়া, অনেককে এক সঙ্গে বাধিয়া নৌকার পাটাতনের নীচে ফেলিয়া রাখিত–প্রতিদিন উপর হইতে কিছু চাউল তাহাদের আহারের জন্য ফেলিয়া দিত। পর্তুগীজরা ইহাদিগকে নানা বন্দরে, বিক্রী করিত–মগেরা তাহাদিগকে ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীর ন্যায় ব্যবহার করিত। শায়েস্তা খান প্রথমে সন্দীপ অধিকার করিলেন (নভেম্বর, ১৬৬৫ খ্রীষ্টাব্দ)। এই সময় চট্টগ্রামে মগ ও পর্তুগীজদের মধ্যে বিবাদ বাধিল এবং শায়েস্ত খান অর্থ ও আশ্রয় দান করিয়া পর্তুগীজদিগকে হাত করিলেন। প্রধানতঃ তাহাদের সাহায্যেই তিনি চট্টগ্রাম জয় করিলেন (জানুয়ারী, ১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দ)। ঔরঙ্গজেবের আজ্ঞায় চট্টগ্রামের নূতন নামকরণ হইল ইসলামাবাদ এবং এখানে একজন মুঘল ফৌজদার নিযুক্ত হইলেন। নানা কারণে ইংরেজ বণিকদের সহিত শায়েস্তা খানের বিবাদ হয়। ১৬৮৮ খ্রীষ্টাব্দে জুন মাসে তাঁহার সুবাদারী শেষ হয়।
