এইরূপে ইসলাম খান সমগ্র বাংলা দেশে মুঘল শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করিলেন। এই সমুদয় অভিযানের সময় ইসলাম খান অধিকাংশ সময় ঢাকা নগরীতেই বাস করিতেন, কারণ তিনি নিজে কখনও সৈন্য চালনা অর্থাৎ যুদ্ধ করিতেন না। মানসিংহও প্রায় দুই বৎসর ঢাকায় ছিলেন (১৬০২-৪ খ্রীষ্টাব্দ) এবং ইহাকে সুরক্ষিত করিয়াছিলেন। ইসলাম খান ঢাকায় একটি নূতন দুর্গ ও ভাল ভাল রাস্তা নির্মাণ করিয়াছিলেন। ওদিকে গঙ্গানদীর স্রোত পরিবর্তন রাজধানী রাজমহলে আর বড় বড় রণতরী যাইতে পারিত না। আরাকানের মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্যও ঢাকা রাজমহল অপেক্ষা অধিকতর উপযোগী স্থান ছিল। এই সমুদয় বিবেচনা করিয়া ১৬১২ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ইসলাম খান রাজমহলের পরিবর্তে ঢাকায় সুবে বাংলার রাজধানী প্রতিষ্ঠা করিলেন এবং সম্রাটের নামানুসারে এই নগরীর নূতন নাম রাখিলেন জাহাঙ্গীরনগর।
বাংলা দেশে মুঘল রাজ্য দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়া ইসলাম খান অতঃপর কামরূপ রাজ্য জয়ের আয়োজন করিলেন। কামরূপে পূর্বে যে মুসলমান রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়, পরে কোচবিহারের হিন্দু রাজা উহা দখল করেন। কোচবিহার রাজবংশের এক শাখা কামরূপে একটি স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল। ইহা পশ্চিমে সঙ্কোশ হইতে পূর্বে বরা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইহার অধিপতি পরীক্ষিৎ নারায়ণের বহু সৈন্য, হস্তী ও রণতরী ছিল। কোচবিহার রাজ কি কারণে মুঘলের দাসত্ব স্বীকার করেন এবং কিরূপে তাঁহার প্ররোচণায় ও সাহায্যে ইসলাম খান কামরূপ রাজ্য আক্রমণ ওজয় করেন তাহা দ্বাদশ অধ্যায়ে বর্ণিত হইয়াছে।
ইহাই ইসলাম খানের শেষ বিজয়। কামরূপ জয়ের অনতিকাল পরেই ঢাকার নিকটবর্তী ভাওয়ালে তাঁহার মৃত্যু হয় (আগস্ট, ১৬১৩ খ্রীষ্টাব্দ)। মাত্র পাঁচ বৎসরের মধ্যে ইসলাম খান সমগ্র বাংলা দেশে মুঘল রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি–শৃঙ্খলা ও সুশাসনের প্রবর্তন করিয়া অদ্ভুত দক্ষতা, সাহস ও রাজনীতিজ্ঞানের পরিচয় দিয়াছিলেন। আকবরের সময় মুঘলেরা বাংলা দেশ জয় করিয়াছিল বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাংলা জয়ের গৌরব ইসলাম খানেরই প্রাপ্য এবং তিনিই বাংলা দেশের মুঘল সুবাদারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হইবার যোগ্য। অবশ্য ইহাও সত্য যে মানসিংহই তাঁহার সাফল্যের পথ প্রশস্ত করিয়াছিলেন।
৫
সুবাদার কাশিম খান ও ইব্রাহিম খান
ইসলাম খানের মৃত্যুর পর তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা কাশিম খান তাঁহার স্থানে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু জ্যেষ্ঠের বুদ্ধি ও যোগ্যতার বিন্দুমাত্রও তাঁহার ছিল না। তিনি স্বীয় কর্মচারী ও পরাজিত রাজাদিগের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করিতেন। কোচবিহার ও কামরূপের দুই রাজাকে ইসলাম খান যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন তাহা ভঙ্গ করিয়া কাশিম খান তাহাদিগকে বন্দী করিলেন। ইহার ফলে উভয় রাজ্যেই বিদ্রোহ উপস্থিত হইল এবং তাহা দমন করিতে কাশিম খানকে বেগ পাইতে হইল। অতঃপর কাশিম খান কাছাড়ের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন। সম্ভবতঃ কাছাড়ের রাজা শত্রুদমন মুঘলের অধীনতা অস্বীকার করিয়া বিদ্রোহী হইয়াছিলেন। কিন্তু সেখান হইতে মুঘলসৈন্য ব্যর্থ হইয়া ফিরিয়া আসিল-শত্রুদমন বহুদিন পর্যন্ত স্বাধীনতা রক্ষা করিলেন। বীরভূমের জমিদারগণও সম্ভবতঃ মুঘলের অধীনতা অস্বীকার করিয়াছিলেন। কাশিম খান তাঁহাদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন, কিন্তু বিশেষ কোন ফল লাভ হইল না। আরাকানের মগ রাজা ও সন্দীপের অধিপতি পর্তুগীজ জলদস্যু সিবাষ্টিয়ান গোঞ্জালেস একযোগে আক্রমণ করিয়া ভুলুয়া প্রদেশ বিধ্বস্ত করিলেন (১৬১৪ খ্রীষ্টাব্দ)। পর বৎসর আরাকানরাজ পুনরায় আক্রমণ করিলেন, কিন্তু দৈবদুর্বিপাকে মুঘলের হস্তে বন্দী হইলেন এবং নিজের সমস্ত লোকজন ও ধনসম্পত্তি মুঘলদের হাতে সমর্পণ করিয়া মুক্তিলাভ করিলেন।
কাশিম খান আসাম জয় করিবার জন্য একদল সৈন্য পাঠাইলেন। তাহারা অহোম্রাজ কর্ত্তৃক পরাস্ত হইল। চট্টগ্রামের বিরুদ্ধে প্রেরিত মুঘল বাহিনীও পরাস্ত হইয়া ফিরিয়া আসিল। এইরূপে কাশিম খানের আমলে (১৬১৪-১৭ খ্রীষ্টাব্দ) বাংলায় মুঘল শাসন অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িল।
পরবর্তী সুবাদার ইব্রাহিম খান ফতেজঙ্গ ত্রিপুরা দেশ জয় করিয়া ত্রিপুরার রাজাকে সপরিবারে বন্দী করেন। এদিকে আরাকানরাজ মেঘনার তীরবর্তী গ্রামগুলি আক্রমণ করেন কিন্তু ইব্রাহিম তাঁহাকে তাড়াইয়া দেন। মোটের উপর ইব্রাহিম খানের আমলে বাংলা দেশে সুখ ও শান্তি বিরাজ করিত এবং মুঘলরাজের শক্তি ও প্রতিপত্তি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল।
কিন্তু এই সময়ে এক অদ্ভুত ব্যাপারে বাংলা দেশের সুবাদার ইব্রাহিম খান এক জটিল সমস্যায় পড়িলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহজাহান পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিলেন এবং পরাজিত হইয়া বাংলা অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। শাহজাহান বাংলার পুরাতন বিদ্রোহী মুসা খানের পুত্র এবং শত্রু আরাকানরাজ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের সহায়তায় বাংলায় স্বাধীন রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে বদ্ধপরিকর হইলেন। ইব্রাহিম প্রভু-পুত্রের সহিত বিবাদ করিতে প্রথমত ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। কিন্তু অবশেষে শাহজাহান রাজমহল দখল করিলে দুই পক্ষে যুদ্ধ হইল। ইব্রাহিম পরাজিত ও নিহত হইলেন এবং শাহজাহান রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর অধিকার করিয়া স্বাধীন রাজার ন্যায় রাজত্ব করিতে লাগিলেন (এপ্রিল, ১৬২৪ খ্রীষ্টাব্দ)। তিনি পূর্বেই উড়িষ্যা অধিকার করিয়াছিলেন। এবার তিনি বিহার ও অযোধ্যা অধিকার করিলেন। কিন্তু কিছুকালের মধ্যেই বাদশাহী ফৌজের হস্তে পরাজিত হইয়া তিনি বাংলা দেশ ত্যাগ করিয়া দাক্ষিণাত্যে ফিরিয়া গেলেন (অক্টোবর, ১৬২৪ খ্রী)। ইহার চারি বৎসর পরে পিতার মৃত্যুর পর শাহজাহান সম্রাট হইলেন।
