প্রতাপাদিত্য ইসলাম খানকে কথা দিয়াছিলেন যে তিনি স্বসৈন্যে অগ্রসর হইয়া মুসা খানের বিরুদ্ধে যোগ দিবেন। কিন্তু তিনি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন নাই। সুতরাং ইসলাম খান তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করিলেন। মুসা খান ও অন্যান্য জমিদারদের পরিণাম দেখিয়া প্রতাপাদিত্য ভীত হইলেন এবং ৮০টি রণতরীসহ পুত্ৰ সংগ্ৰামাদিত্যকে ক্ষমা প্রার্থনা করিবার জন্য ইসলাম খানের নিকট পাঠাইলেন। কিন্তু ইসলাম খান ইহাতে কর্ণপাত না করিয়া উক্ত রণতরীগুলি ধ্বংস করিলেন।
প্রতাপাদিত্য খুব শক্তিশালী রাজা ছিলেন; সুতরাং ইসলাম খান এক বিরাট সৈন্যদলকে তাঁহার রাজ্য আক্রমণ করিতে পাঠাইলেন; সঙ্গে সঙ্গে প্রতাপাদিত্যের জামাতা বাকলার রাজা রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে একদল সৈন্য প্রেরণ করিলেন। এই সময় চিলাজুয়ারের জমিদার অনন্ত ও পীতাম্বর বিদ্রোহ করায় যশোহর-অভিযানে কিছু বিলম্ব ঘটিল। কিন্তু ঐ বিদ্রোহ দমনের পরেই জলপথে ও স্থলপথে মুঘলসৈন্য অগ্রসর হইল। মুঘল নৌবাহিনী পদ্মা, জলঙ্গী ও ইছামতী নদী দিয়া বনগাঁর দশ মাইল দক্ষিণে যমুনা ও ইছামতীর সঙ্গমস্থলের নিকট শালকা (বর্তমান টিবি নামক স্থানে) পৌঁছিল। এইখানে প্রতাপাদিত্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র উদয়াদিত্য একটি সুদৃঢ় দুর্গ নির্মাণ করিয়া তাঁহার সৈন্যের অধিকাংশ, বহু হস্তী, কামান এবং ৫০০ রণতরী সহ। অপেক্ষা করিতেছিলেন। তিনি সহসা মুঘলের রণতরী আক্রমণ করিয়া ইহাকে বিপর্যস্ত করিয়া তুলিলেন। কিন্তু ইছামতীর দুই তীর হইতে মুঘল বাহিনীর গোলা ও বাণ বর্ষণে উদয়াদিত্যের নৌবহর বেশী দূর অগ্রসর হইতে পারিল না এবং ইহার অধ্যক্ষ খাজা কামালের মৃত্যুতে ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল। উদয়াদিত্য শালকার দুর্গ ত্যাগ করিয়া পালন করিলেন। অধিকাংশ রণতরী, গোলাগুলি প্রভৃতি মুঘলের হস্তগত হইল।
ইতিমধ্যে বাকলার বিরুদ্ধে অভিযান শেষ হইয়াছিল। বাকলার অল্পবয়স্ক রাজা রামচন্দ্রের মাতার অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুঘল বাহিনীর সহিত সাতদিন পর্যন্ত একটি দুর্গের আশ্রয়ে যুদ্ধ করিয়াছিলেন। মুঘলেরা ঐ দুর্গ অধিকার করিলে রামচন্দ্রের মাতা পুত্রকে বলিলেন মুঘলের সঙ্গে সন্ধি না করিলে তিনি বিষ পান করিবেন। রামচন্দ্র আত্মসমর্পণ করিলেন। ইসলাম খান তাঁহাকে ঢাকায় বন্দী করিয়া রাখিলেন এবং বাকলা মুঘল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইল। বাকলার যুদ্ধ শেষ করিয়া মুঘল বাহিনী পূর্বদিক হইতে প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে অগ্রসর হইল।
এই নূতন বিপদের সম্ভাবনায়ও বিচলিত না হইয়া প্রতাপাদিত্য পুনরায় রাজধানীর পাঁচ মাইল উত্তরে কাগরঘাটায় একটি দুর্গ নির্মাণ করিয়া মুঘলবাহিনীকে বাধা দিতে প্রস্তুত হইলেন। কিন্তু মুঘল সেনানায়কগণ অপূর্ব সাহস ও কৌশলের বলে এই দুর্গটিও দখল করিল। প্রতাপাদিত্য তখন মুঘলের নিকট আত্মসমর্পণ করিলেন। স্থির হইল যে মুঘল সেনাপতি গিয়াস খান নিজে তাঁহাকে ইসলাম খানের নিকট লইয়া যাইবেন, এবং যতদিন ইসলাম খান কোন আদেশ না দেন, ততদিন পর্যন্ত মুঘল বাহিনী কাগরঘাটায় এবং উদয়াদিত্য রাজধানী ধূমঘাটে থাকিবেন। ইসলাম খান প্রতাপাদিত্যকে বন্দী এবং তাঁহার রাজ্য দখল করিলেন। প্রবাদ এই যে, প্রতাপাদিত্যকে ঢাকায় একটি লোহার খাঁচায় বন্ধ করিয়া রাখা হইয়াছিল এবং পরে বন্দী অবস্থায় দিল্লি পাঠান হয়, কিন্তু পথিমধ্যে বারাণসীতে তাঁহার মৃত্যু হয়।
প্রতাপাদিত্য যথেষ্ট শক্তি ও প্রতিপত্তিশালী ছিলেন এবং শেষ অবস্থায় মুঘলদের সহিত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছিলেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তাঁহাকে যে প্রকার বীর ও স্বাধীনতাপ্রিয় দেশভক্তরূপে চিত্রিত করা হইয়াছে, উল্লিখিত কাহিনী তাঁহার সমর্থন করে না।
এক মাসের মধ্যেই (ডিসেম্বর, ১৬১১ খ্রীষ্টাব্দ–জানুয়ারী, ১৬১২ খ্রীষ্টাব্দ) যশোহর ও বাকলার যুদ্ধ শেষ হইল। কিন্তু শ্রীপুর, বিক্রমপুর ও ভুলুয়া ছাড়িয়া মুঘল বাহিনী চলিয়া আসায় সুযোগ পাইয়া আরাকানের মগ দস্যুগণ এই সমুদয় অঞ্চল আক্রমণ করিয়া বিধ্বস্ত করিল। ইসলাম খান তাহাদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন। কিন্তু সৈন্য পৌঁছিবার পূর্বেই তাহারা পলায়ন করিল।
অতঃপর ইসলাম খান পাঠান উসমানের বিরুদ্ধে এক বিপুল সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করিলেন। শ্রীহট্টের অন্তর্গত দৌলম্বাপুরে এক ভীষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে উসমানের অপূর্ব বীরত্ব ও রণকৌশলে মুঘল বাহিনী পরাস্ত হইয়া নিজ শিবিরে প্রস্থান করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে উসমান এই যুদ্ধে নিহত হন এবং রাত্রে তাঁহার সৈন্যেরা যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে (১২ই মার্চ, ১৬১২ খ্রীষ্টাব্দ)। উসমানের পুত্র ও ভ্রাতাগণ প্রথমে যুদ্ধ চালাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল, কিন্তু পাঠান নায়কদের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদের ফলে তাহা হইল না–তাঁহারা মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিলেন। ইসলাম খান উসমানের রাজ্য দখল করিলেন এবং তাঁহার ভ্রাতা ও পুত্রগণকে বন্দী করিয়া রাখিলেন। শ্রীহট্টের অন্যান্য পাঠান নায়কদের বিরুদ্ধেও ইসলাম খান সৈন্য প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহারা প্রথমে মুঘল বাহিনীকে বাধা দিয়াছিলেন, কিন্তু উসমানের পরাজয় ও মৃত্যুর সংবাদ পাইয়া বশ্যতা স্বীকার করিলেন। শ্রীহট্ট সুবে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করা হইল এবং প্রধান প্রধান পাঠানদের বন্দী করিয়া রাখা হইল। অতঃপর ইসলাম খান কাছাড়ের রাজা শত্রুদমনের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করিলেন। শত্রুদমন কিছুদিন যুদ্ধ করার পর বশ্যতা স্বীকার করিলেন এবং মুঘল সম্রাটকে কর দিতে স্বীকৃত হইলেন (১৬১২ খ্রীষ্টাব্দ)।
