আলাইপুরে অবস্থানকালে ইসলাম খান ভূষণার জমিদার রাজা সত্রাজিতের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন। সত্রাজিতের পিতা মুকুন্দলাল পার্শ্ববর্তী ফতেহাবাদের (ফরিদপুর) মুঘল ফৌজদারের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্রগণকে হত্যা করিয়া উক্ত স্থান অধিকার করিয়াছিলেন। মানসিংহের নিকট বশ্যতা স্বীকার করিলেও তিনি স্বাধীন রাজার ন্যায় আচরণ করিতেন। তিনি ভূষণা দুর্গ সুদৃঢ় করিয়াছিলেন। মুঘলসৈন্য আক্রমণ করিলে সত্রাজিৎ প্রথমে বীরবিক্রমে তাহাদিগকে বাধা দিলেন কিন্তু পরে মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিলেন এবং ইসলাম খানের সৈন্যের সঙ্গে যোগ দিয়া পাবনা জিলার কয়েকজন জমিদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিলেন।
পূর্ব প্রতিশ্রুতি মত রাজা প্রতাপাদিত্য আত্রাই নদীর তীরে ইসলাম খানের শিবিরে উপস্থিত হইলেন। স্থির হইল তিনি নিজ রাজ্যে ফিরিয়াই চারশত রণতরী পাঠাইবেন। পুত্ৰ সংগ্ৰামাদিত্যের অধীনে মুঘল নৌ-বহরের সহিত একত্র মিলিত হইয়া তাহারা যুদ্ধ করিবে। তারপর ইসলাম খান যখন পশ্চিমে ঘোড়াঘাট হইতে মুসা খানের রাজ্য আক্রমণ করিবেন, সেই সময় প্রতাপাদিত্য আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড় দিয়া ২০,০০০ পাইক, ১০০০ ঘোড়সওয়ার এবং ১০০ রণতরী লইয়া ঈশা খানের রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত শ্রীপুর ও বিক্রমপুর আক্রমণ করিবেন।
বর্ষাকাল শেষ হইলে ইসলাম খান প্রধান মুঘল বাহিনীসহ করতোয়ার তীর দিয়া দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হইয়া পদ্মা, ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদীর সঙ্গমস্থল কাটাসগড়ে উপস্থিত হইলেন-মুঘল নৌ-বাহিনীও তাঁহার অনুসরণ করিল। ইহার নিকটবর্তী যাত্রীপুরে ইছামতীর তীরে মুসা খানের এক সুদৃঢ় দুর্গ ছিল। এই দুর্গ আক্রমণ করাই মুঘল বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু মুসা খানকে বিপথে চালিত করিবার জন্য ক্ষুদ্র একদল সৈন্য ও রণতরী ঢাকা নগরীর দিকে পাঠানো হইল।
মুসা খান যাত্রীপুর রক্ষার বন্দোবস্ত করিয়া তাঁহার বিশ্বস্ত ১০/১২ জন জমিদারের সঙ্গে ৭০০০ রণতরী লইয়া কাটাসগড়ে মুঘলের শিবির আক্রমণ করিলেন। প্রথম দিন যুদ্ধের পর মুসা খান রাতারাতি নিকটবর্তী ডাকচেরা নামক স্থানে পরিখাবেষ্টিত একটি সুরক্ষিত মাটির দুর্গ নির্মাণ করিলেন এবং পর পর দুই দিন প্রভাতে এই দুর্গ হইতে বাহির হইয়া ভীমবেগে মুঘলসৈন্যদিগকে আক্রমণ করিলেন। গুরুতর যুদ্ধে উভয় পক্ষেই বহু সৈন্য হতাহত হইল। অবশেষে মুসা খান ডাকচেরা ও যাত্রীপুর দুর্গে আশ্রয় লইলেন। মুঘলসৈন্য পুনঃ পুনঃ ডাকচেরা দুর্গ আক্রমণ করিয়াও অধিকার করিতে পারিল না। কিন্তু যখন মুসা খান ডাকচেরা রক্ষায় ব্যাপৃত তখন অকস্মাৎ আক্রমণ করিয়া ইসলাম খান যাত্রীপুর দুর্গ দখল করিলেন। তারপর অনেকদিন যুদ্ধের পর বহু সৈন্য ক্ষয় করিয়া ডাকচেরা দুর্গও দখল করিলেন। এই দুর্গ দখলের ফলে মুসা খানের শক্তি ও প্রতিপত্তি যথেষ্ট হ্রাস পাইল। ঢাকা নগরীও মুঘল বাহিনী দখল করিল। ইসলাম খান ঢাকায় পৌঁছিয়া শ্রীপুর ও বিক্রমপুর আক্রমণের জন্য সৈন্য পাঠাইলেন। মুসা খান রাজধানী রক্ষার ব্যবস্থা করিয়া লক্ষ্যা নদীতে তাঁহার রণতরী সমবেত করিলেন। এই নদীর অপর তীরে শক্রদলের সম্মুখীন হইয়া কিছুদিন থাকিবার পর মুঘলসৈন্য রাত্রিকালে অকস্মাৎ আক্রমণ করিয়া মুসা খানের পৈত্রিক বাসস্থান কাভু এবং পর পর আরও কয়েকটি দুর্গ দখল করায় মুসা খান পলায়ন করিতে বাধ্য হইলেন এবং তাঁহার রাজধানী সোনারগাঁও সহজেই মুঘলের করতলগত হইল। মুসা খান ইহার পরও মুঘলদের কয়েকটি থানা আক্রমণ করিলেন, কিন্তু পরাস্ত হইয়া মেঘনা নদীর একটি দ্বীপে আশ্রয় হইলেন। তাঁহার পক্ষে জমিদারেরাও একে একে মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিলেন।
অতঃপর ইসলাম খান ভুলুয়ার জমিদার অনন্তমাণিক্যের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন। আরাকানের রাজা অনন্তমাণিক্যকে সাহায্য করিলেন। অনন্তমাণিক্য একটি সুদৃঢ় দুর্গের আশ্রয়ে থাকিয়া ঘোরতর যুদ্ধ করিলেন। মুঘলসৈন্য ঐ দুর্গ দখল করিতে না পারিয়া উৎকোচদানে ভুলুয়ার একজন প্রধান কর্মচারীকে হস্তগত করিল। ফলে অনন্তমাণিক্যের পরাজয় হইল। তিনি আরাকান রাজ্যে পলাইয়া গেলেন। এখন তাঁহার রাজ্য ও সম্পদ সকলই মুঘলের হস্তগত হইল।
অনন্তমাণিক্যের পরাজয়ে মুসা খান নিরাশ হইয়া মুঘলের নিকট আত্মসমর্পণ করিলেন। ইসলাম খান মুসা খান ও তাঁহার মিত্রগণের রাজ্য তাহাদিগকে জায়গীর রূপে ফিয়াইয়া দিলেন। কিন্তু মুঘলসৈন্য এই সকল জায়গীর রক্ষায় নিযুক্ত হইল, জায়গীরদারদের রণতরী মুঘল নৌ-বহরের অংশ হইল এবং সৈন্যদের বিদায় করিয়া দেওয়া হইল। মুসা খানকে ইসলাম খানের দরবারে নজরবন্দী করিয়া রাখা হইল। এইরূপে এক বৎসরের (১৬১০-১১ খ্রী) যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশে মুঘলের প্রধান শত্রু দূরীভূত হইল।
মুসা খানের সহিত যুদ্ধ শেষ হইবার পরেই ইসলাম খান পাঠান উসমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। উসমান পদে পদে বাধা দেওয়া সত্ত্বেও মুঘল বাহিনী তাঁহার রাজধানী বোকাইনগর দখল করিল (নভেম্বর, ১৬১১ খ্রী)। উসমান শ্রীহট্টের পাঠান নায়ক বায়াজিদ কররানীর আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। ক্রমে ক্রমে অন্যান্য বিদ্রোহী পাঠান নায়কেরাও মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিল। কিন্তু পাঠান বিদ্রোহীদের সমূলে ধ্বংস করা আপাতত স্থগিত রাখিয়া ইসলাম খান যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্যকে দমন করিতে অগ্রসর হইলেন।
