২। ভূষণার জমিদার সত্রাজিৎ এবং সুসঙ্গের জমিদার রাজা রঘুনাথ : উঁহারা সহজেই মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করেন এবং অন্যান্য জমিদারদের বিরুদ্ধে মুঘল সৈন্যের সহায়তা করেন। সত্রাজিতের কাহিনী পরে বলা হইবে।
৩। রাজা প্রতাপাদিত্য : বর্তমান যশোহর, খুলনা ও বাখরগঞ্জ জিলার অধিকাংশই তাঁহার জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বর্তমান যমুনা ও ইছামতী নদীর সঙ্গমস্থলে ধূমঘাট নামক স্থানে তাঁহার রাজধানী ছিল। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে তাঁহার শক্তি, বীরত্ব ও দেশভক্তির যে উচ্ছ্বসিত বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়, তাঁহার অধিকাংশেরই কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই।
৪। বাখরগঞ্জ জিলার অন্তর্গত বাকলার জমিদার রামচন্দ্র : ইনি রাজা প্রতাপাদিত্যের প্রতিবেশী ও সম্পর্কে জামাতা ছিলেন। ইনি বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। কবিবর রবীন্দ্রনাথ “বৌঠাকুরাণীর হাট” নামক উপন্যাসে তাঁহার যে চিত্র আঁকিয়াছেন তাহা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও অনৈতিহাসিক।
৫। ভুলুয়ার জমিদার অনন্তমাণিক্য : বর্তমান নোয়াখালি জিলা তাঁহার জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইনি লক্ষণমাণিক্যের পুত্র।
৬। আরও অনেক জমিদার : তাঁহাদের কথা প্রসঙ্গক্রমে পরে বলা হইবে।
৭। বিদ্রোহী পাঠান নায়কগণ : বর্তমান শ্রীহট্ট (সিলেট) জিলাই ছিল ইঁহাদের শক্তির প্রধান কেন্দ্রস্থল। ইঁহাদের মধ্যে বায়াজিদ কররানী ছিলেন সর্বপ্রধান। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক পাঠান নায়কই তাহাকে নেতা বলিয়া স্বীকার করিত। তাঁহার প্রধান সহযোগী ছিলেন খাজা উসমান। বঙ্কিমচন্দ্র দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসে ইহাকে অমর করিয়া গিয়াছেন। উসমানের পিতা খাজা ঈশা উড়িষ্যার শেষ পাঠান রাজা কুলু খানের ভ্রাতা ও উজীর ছিলেন এবং মানসিংহের সহিত সন্ধি করিয়াছিলেন। সন্ধির পূর্বেই কুলু খানের মৃত্যু হইয়াছিল। খাজা ঈশার মৃত্যুর পর পাঠানেরা আবার বিদ্রোহী হইল। মানসিংহ তাহাদিগকে পরাজিত করিলেন। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য তিনি উসমান ও অন্য কয়েকজন পাঠান নায়ককে উড়িষ্যা হইতে দূরে রাখিবার জন্য পূর্ব বাংলায় জমিদারি দিলেন; পরে উড়িষ্যার এত নিকটে তাহাদিগকে রাখা নিরাপদ মনে করিয়া এই আদেশ নাকচ করিলেন। ইহাতেই বিদ্রোহী হইয়া তাহারা সাতগাঁওয়ে লুঠপাট করিতে আরম্ভ করিল, সেখান হইতে বিতাড়িত হইয়া ভূষণা লুঠ করিল এবং ঈশা খানের সঙ্গে যোগ দিল। ব্রহ্মপুত্রের পূর্বে বর্তমান মৈমনসিংহ জিলার অন্তর্গত বোকাই নগরে উসমান দুর্গ নির্মাণ করিলেন। তিনি আজীবন ঈশা খান ও মুসা খানের সহায়তায় মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছেন। পাঠান নায়ক পূর্ব্বোক্ত বায়াজিদ, বানিয়াচঙ্গের আনওয়ার খান ও শ্রীহট্টের অন্যান্য পাঠান নায়কদের সঙ্গে উসমানের বন্ধুত্ব ছিল। এইরূপে উড়িষ্যা হইতে বিতাড়িত হইয়া পাঠান শক্তি ব্রহ্মপুত্রের পূর্বভাগে প্রতিষ্ঠিত হইল।
বাংলা দেশের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত রাজধানী রাজমহল হইতে পূর্বে ত্রিপুরা ও চট্টগ্রামের সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগের অধিকাংশই মুঘল রাজশক্তির বিরুদ্ধবাদী বিদ্রোহী নায়কদের অধীন ছিল। রাজমহলের দক্ষিণে ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে তিনজন বড় জমিদার ছিলেন–মল্লভূম ও বাঁকুড়ার বীর হাম্বীর, ইঁহার দক্ষিণ পশ্চিমে পাঁচেতে শাম্স্ খান এবং ইহার দক্ষিণ-পূর্বে হিজলীতে সেলিম খান। ইহারা মুখে মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিতেন, কিন্তু কখনও সুবাদার ইসলামের খানের দরবারে উপস্থিত হইতেন না।
৪
ইসলাম খানের কার্যকলাপ-বিদ্রোহী জমিদারদের দমন
সুবাদার ইসলাম খান রাজমহলে পৌঁছিবার অল্পকাল পরেই সংবাদ আসিল যে পাঠান উসমান খান সহসা আক্রমণ করিয়া মুঘল থানা আলপসিং অধিকার করিয়াছেন ও থানাদারকে বধ করিয়াছেন। ইসলাম খান অবিলম্বে সৈন্য পাঠাইয়া থানাটি পুনরুদ্ধার করিলেন এবং বাংলাদেশে মুঘল প্রভুত্বের স্বরূপ দেখিয়া ইহা দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে মনস্থ করিলেন।
ইসলাম খান প্রথমেই মুসা খানকে দমন করিবার জন্য একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও ব্যাপক আয়োজন করিলেন। রাজা প্রতাপাদিত্য মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিয়া কনিষ্ঠ পুত্র সংগ্রামাদিত্যকে উপঢৌকনসহ ইসলাম খানের দরবারে পাঠাইলেন। স্থির হইল তিনি সৈন্যসামন্ত ও যুদ্ধের সরঞ্জাম লইয়া স্বয়ং আলাইপুরে গিয়া ইসলাম খানের সহিত সাক্ষাৎ এবং মুসা খানের বিরুদ্ধে অভিযানে যোগদান করিবেন। জামিন স্বরূপ সঞ্জামাদিত্য ইসলাম খানের দরবারে রহিল। বর্ষা শেষ হইলে ইসলাম খান এবং বৃহৎ সৈন্যদল, বহুসংখ্যক রণতরী ও বড় বড় ভারবাহী নৌকায় কামান বন্দুক লইয়া রাজমহল হইতে ভাটি অর্থাৎ পূর্ব বাংলার দিকে অগ্রসর হইলেন। মালদহ জিলায় গৌড়ের নিকট পৌঁছিয়া ইসলাম খান পশ্চিম বাংলার পূর্ব্বোক্ত তিনজন জমিদারের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন। বীর হাম্বীর ও সেলিম খান বিনা যুদ্ধে এবং শাম্স্ খান পক্ষাধিক কাল গুরুতর যুদ্ধ করার পর মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিলেন। মালদহ হইতে দক্ষিণে মুর্শিদাবাদ জিলার মধ্য দিয়া অগ্রসর হইয়া ইসলাম খান পদ্মা নদী পার হইলেন এবং রাজশাহী জিলার অন্তর্গত পদ্মা-তীরবর্তী আলাইপুরে পৌঁছিলেন (১৬০৯ খ্রী)। নিকটবর্তী পুঁটিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার পীতাম্বর, ভাতুড়িয়া রাজ-পরগণার অন্তর্গত চিলাজুয়ারের জমিদার অনন্ত ও আলাইপুরের জমিদার ইলাহ্ বখশ ইসলাম খানের বশ্যতা স্বীকার করিলেন।
