এই সমুদয় বিপর্যয়ের ফলে মানসিংহ বাংলায় ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইলেন। পূর্ববঙ্গের বিদ্রোহীরা গুরুতররূপে পরাজিত হইল (ফেব্রুয়ারী, ১৬০১ খ্রী)। পরবর্তী বৎসর মানসিংহ ঢাকা জিলায় শিবির স্থাপন করিলেন। শ্রীপুরের জমিদার কেদার রায় বশ্যতা স্বীকার করিলেন। মানসিংহের পৌত্র মালদহের বিদ্রোহীদিগকে পরাস্ত করিলেন। এদিকে উড়িষ্যার পরলোকগত পাঠান নায়ক কুলু খানের ভ্রাতুষ্পুত্র উসমান ব্ৰহ্মপুত্র নদী পার হইয়া মুঘল থানাদারকে পরাজিত করিয়া ভাওয়ালে আশ্রয় লইতে বাধ্য করিলেন। মানসিংহ তৎক্ষণাৎ ভাওয়াল যাত্রা করিলেন এবং উসমান গুরুতররূপে পরাজিত হইলেন। অনেক পাঠান নিহত হইল এবং বহুসংখ্যক পাঠান রণতরী ও গোলাবারুদ মানসিংহের হস্তগত হইল। ইতিমধ্যে কেদার রায় বিদ্রোহী হইয়া ঈশা খানের পুত্র মুসা খান, কুলু খানের উজীরের পুত্র দাউদ খান এবং অন্যান্য জমিদারগণের সহিত যোগ দিলেন। মানসিংহ ঢাকায় পৌঁছিয়াই ইহাদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করিলেন। কিন্তু বহুদিন পর্যন্ত তাহারা ইছামতী নদী পার হইতে না পারায় মানসিংহ স্বয়ং শাহপুরে উপস্থিত হইয়া নিজের হাতি ইছামতীতে নামাইয়া দিলেন। মুঘল সৈনিকেরা ঘোড়ায় চড়িয়া তাঁহার অনুসরণ করিল। এইরূপ অসম সাহসে নদী পার হইয়া মানসিংহ বিদ্রোহীদিগকে পরাস্ত করিয়া বহুদূর পর্যন্ত তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিলেন (ফেব্রুয়ারী, ১৬০২ খ্রী)।
এই সময় আরাকানের মগ জলদস্যুরা জলপথে ঢাকা অঞ্চলে বিষম উপদ্রব সৃষ্টি করিল এবং ডাঙ্গায় নামিয়া কয়েকটি মুঘল ঘাঁটি লুঠ করিল। মানসিংহ তাহাদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইয়া বহুকষ্টে তাহাদিগকে পরাস্ত করিলেন এবং তাহারা নৌকায় আশ্রয় গ্রহণ করিল। কেদার রায় তাঁহার নৌবহর লইয়া মগদের সঙ্গে যোগ দিলেন এবং শ্রীনগরের মুঘল ঘাঁটি আক্রমণ করিলেন। মানসিংহও কামান ও সৈন্য পাঠাইলেন। বিক্রমপুরের নিকট এক ভীষণ যুদ্ধে কেদার রায় আহত ও বন্দী হইলেন। তাঁহাকে মানসিংহের নিকট লইয়া যাইবার পূর্বেই তাঁহার মৃত্যু হইল (১৬০৩ খ্রী)। তাঁহার অধীনস্থ বহু পর্তুগীজ জলদস্যু ও বাঙালী নাবিক হত হইল।
অতঃপর মানসিংহ মগ রাজাকে নিজ দেশে ফিরিয়া যাইতে বাধ্য করিলেন। তারপর তিনি উসমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করিলেন। উসমান পলাইয়া গেলেন। এইরূপে বাংলাদেশে অনেক পরিমাণে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়া আসিল।
৩
জাহাঙ্গীরের রাজত্বের প্রারম্ভে বাংলা দেশের অবস্থা
মুঘল সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র সেলিম জাহাঙ্গীর’ নাম ধারণ করিয়া সিংহাসনে আরোহণ করিলেন (১৬০৫ খ্রী)। এই সময় শের আফগান ইস্তলজু নামক একজন তুর্কী জায়গীরদার বর্ধমানে বাস করিতেন। তাঁহার পত্নী অসামান্য রূপবতী ছিলেন। কথিত আছে, জাহাঙ্গীর তাহাকে বিবাহের পূর্বেই দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলেন। সম্ভবত এই নারীর হস্তগত করিবার জন্যই মানসিংহকে সরাইয়া জাহাঙ্গীর তাঁহার বিশ্বস্ত ধাত্রী-পুত্র কুলুদ্দীন খান কোকাকে বাংলা দেশের সুবাদার নিযুক্ত করিলেন। কুলুদ্দীন খান বর্ধমানে শের আফকানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উভয়ের মধ্যে বচসা ও বিবাদ হয় এবং উভয়েই নিহত হন (১৬০৭ খ্র)। শের আফকানের পত্নী আগ্রায় মুঘল হারেমে কয়েক বৎসর অবস্থান করার পর জাহাঙ্গীরের সহিত তাঁহার বিবাহ হয় এবং পরে নূরজাহান নামে তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হন।
কুলুদ্দীনের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর কুলী খান বাংলা দেশের সুবাদার হইয়া আসেন। কিন্তু এক বৎসরের মধ্যেই তাঁহার মৃত্যু হয় এবং তাঁহার স্থলে ইসলাম খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হইয়া ১৬০৮ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসে কার্যভার গ্রহণ করেন। তাঁহার কার্যকাল মাত্র পাঁচ বৎসর–কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মানসিংহের আরব্ধ কার্য সম্পূর্ণ করিয়া বাংলা দেশে মুঘলরাজের ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ইসলাম খানের সুবাদারীর প্রারম্ভে বাংলা দেশ নাম ত মুঘল সাম্রাজ্যের অন্ত ভুক্ত হইলেও প্রকৃতপক্ষে রাজধানী রাজমহল, মুঘল ফৌজদারদের অধীনস্থ অল্প কয়েকটি থানা অর্থাৎ সুরক্ষিত সৈন্যের ঘাটি ও তাঁহার চতুর্দিকে বিস্তৃত সামান্য ভূখণ্ডেই মুঘলরাজের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল। ইহার বাহিরে অসংখ্য বড় ও ছোট জমিদার এবং বিদ্রোহী পাঠান নায়কেরা প্রায় স্বাধীনভাবেই রাজ্য পরিচালনা করিতেন। মুঘল থানার মধ্যে করতোয়া নদীর তীরবর্তী ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর জিলা), আলপসিং ও সেরপুর অতাই (ময়মনসিংহ), ভাওয়াল (ঢাকা), ভাওয়ালের ২২ মাইল উত্তরে অবস্থিত টোক এবং পদ্মা, লক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত বর্তমান নারায়ণগঞ্জের নিকটবর্তী ত্রিমোহানি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
যে সকল জমিদার মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিলেও সুযোগ ও সুবিধা পাইলেই বিদ্রোহী হইতেন, তাঁহাদের মধ্যে ইঁহারা সমধিক শক্তিশালী ছিলেন।
১। পূর্ব্বোক্ত ঈশা খানের পুত্র মুসা খান : বর্তমান ঢাকা ও ত্রিপুরা জিলার অর্ধেক, প্রায় সমগ্র মৈমনসিংহ জিলা এবং রংপুর, বগুড়া ও পাবনা জিলার কতকাংশ তাঁহার জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলা দেশের তৎকালীন জমিদারগণ বারো ভূঞা নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন, যদিও সংখ্যায় তাঁহারা ঠিক বারো জন ছিলেন না। মুসা খান ছিলেন ইহাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও অনেকেই তাহাকে নেতা বলিয়া মানিত। এই সকল সহায়ক জমিদারের মধ্যে ভাওয়ালের বাহাদুর গাজী, সরাইলের সুনা গাজী, চাটমোহরের মীর্জা মুমিন (মাসুম খান কাপুলীর পুত্র), খলসির মধু রায়, চাঁদ প্রতাপের বিনোদ রায়, ফতেহাবাদের (ফরিদপুর) মজলিস কুত্ত্ব এবং মাতঙ্গের জমিদার পলওয়ানের নাম করা যাইতে পারে।
