এক বৎসরের মধ্যেই বিহারের বিদ্রোহ অনেকটা প্রশমিত হইল। ১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে আকবর খান-ই-আজমকে সুবাদার নিযুক্ত করিয়া বাংলায় পাঠাইলেন। তিনি তেলিয়াগড়ির নিকট যুদ্ধে মাসুম-কাবুলীর অধীনে সম্মিলিত পাঠান বিদ্রোহীদিগকে পরাজিত করিলেন (২৪ এপ্রিল, ১৫৮৩ খ্রী)। কিন্তু বিদ্রোহ একেবারে দমিত হইল না। মাসুম কাবুলী ঈশা খানের সঙ্গে যোগ দিলেন। পরবর্তী সুবাদার শাহবাজ খান বহুদিন যাবৎ ঈশা খানের সঙ্গে যুদ্ধ করিলেন। কিন্তু তাঁহাকে পরাস্ত করিতে না পারিয়া রাজধানী টাণ্ডায় ফিরিয়া গেলেন। সুযোগ বুঝিয়া মাসুম ও অন্যান্য পাঠান নায়কেরা মালদহ পর্যন্ত অগ্রসর হইলেন। উড়িষ্যায় পাঠান কুলু খান লোহানী বিদ্রোহ করিয়া প্রায় বর্ধমান পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন কিন্তু পরাজিত হইয়া মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিলেন (জুন, ১৫৮৪ খ্রী)।
১৫৮৫ খ্রীষ্টাব্দে বাংলায় বিদ্রোহ দমন করিবার জন্য আকবর অনেক নূতন ব্যবস্থা করিলেন, কিন্তু বিশেষ কোন ফল হইল না। অবশেষে শাহবাজ খান যুদ্ধের পরিবর্তে তোষণ-নীতি অবলম্বন ও উৎকোচ প্রদান দ্বারা বহু পাঠান বিদ্রোহী নায়ককে বশীভূত করিলেন। ঈশা খান ও মাসুম কাবুলী উভয়েই মুঘলের বশ্যতা স্বীকার করিলেন (১৫৮৬ খ্রী)। কিন্তু পাঠান নায়ক কুলু উড়িষ্যায় নিরুপদ্রবে রাজ্য করিতে লাগিলেন। তিনিও বাংলার দিকে অগ্রসর হইলেন না-শাহবাজ খানও তাঁহার বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন না। সুতরাং ১৫৮৬ খ্রীষ্টাব্দে বাংলায় মুঘল আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হইল। ১৫৮৭ খ্রীষ্টাব্দের শেষভাগে বাংলা দেশে অন্যান্য সুবার ন্যায় নূতন শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইল। শাসন-সংক্রান্ত সমস্ত কার্য কতকগুলি বিভাগে বিভক্ত হইল এবং প্রত্যেক বিভাগ নির্দিষ্ট একজন কর্মচারীর অধীনস্থ হইল। সর্বোপরি সিপাহসালার (পরে সুবাদার নামে অভিহিত) এবং তাঁহার অধীনে দিওয়ান (রাজস্ব বিভাগ), বশী সৈন্যবিভাগ), সদর ও কাজী (দিওয়ানী ও ফৌজদারী বিচার), কোতোয়াল (নগর রক্ষা) প্রভৃতি অধ্যক্ষগণ নিযুক্ত হইলেন।
নূতন ব্যবস্থা অনুসারে ওয়াজিব খান প্রথম সিপাহসালার নিযুক্ত হইলেন–কিন্তু অনতিকাল মধ্যেই তাঁহার মৃত্যু হইলে (আগস্ট, ১৫৮৭ খ্রী) সৈয়দ খান ঐ পদে নিযুক্ত হইলেন। তাঁহার সুদীর্ঘ শাসনকাল (১৫৮৭-১৫৯৪ খ্রী) বাংলা দেশে আবার পাঠানরা ও জমিদারগণ শক্তিশালী হইয়া উঠিল।
২
মানসিংহ ও বাংলা দেশে মুঘল রাজ্যের গোড়াপত্তন
১৫৯৪ খ্রীষ্টাব্দে রাজা মানসিংহ বাংলাদেশের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইলেন। পাঁচ হাজার মুঘলসৈন্যকে বাংলাদেশে জায়গীর দিয়া প্রতিষ্ঠিত করা হইল। রাজধানী টাণ্ডায় পৌঁছিয়াই তিনি বিদ্রোহীদিগকে দমন করিবার জন্য চতুর্দিকে সৈন্য পাঠাইলেন। তাঁহার পুত্র হিম্মৎসিংহ ভূষণা দুর্গ দখল করিলেন (এপ্রিল, ১৫৯৫ খ্রী)। ১৫৯৫ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই নভেম্বর মানসিংহ রাজমহলে নূতন এক রাজধানীর পত্তন করিয়া ইহার নাম দিলেন আকবরনগর। শীঘ্রই এই নগরী সমৃদ্ধ হইয়া উঠিল। অতঃপর তিনি ঈশা খানের বিরুদ্ধে অগ্রসর হইলেন এবং পাঠানদিগকে ব্রহ্মপুত্রের পূর্বে আশ্রয় লইতে বাধ্য করিলেন। ঈশা খানের জমিদারীর অধিকাংশ মুঘল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইল। অন্যান্য স্থানেও বিদ্রোহীরা পরাজিত হইল। ১৫৯৬ খ্রীষ্টাব্দের বর্ষাকালে মানসিংহ ঘোড়াঘাটের শিবিরে গুরুতররূপে পীড়িত হন। এই সংবাদ পাইয়া মাসুম খান ও অন্যান্য বিদ্রোহীরা বিশাল রণতরী লইয়া অগ্রসর হইল। মুঘলদের রণতরী না থাকায় বিদ্রোহীরা বিনা বাধায় ঘোড়াঘাটের মাত্র ২৪ মাইল দূরে আসিয়া পৌঁছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে জল কমিয়া যাওয়ায় তাহারা ফিরিয়া যাইতে বাধ্য হইল। মানসিংহ সুস্থ হইয়াই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাইলেন। তাহারা বিতাড়িত হইয়া এগারসিন্দুরের (ময়মনসিংহ) জঙ্গলে পলাইয়া আত্মরক্ষা করিল।
অতঃপর ঈশা খান নূতন এক কূটনীতি অবলম্বন করিলেন। শ্রীপুরের জমিদারবারো ভূঞার অন্যতম কেদার রায়কে ঈশা খান আশ্রয় দিলেন। কোচবিহারের রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ মুঘলের পক্ষে ছিলেন। তাঁহার জ্ঞাতি ভ্রাতা রঘুদেবের সঙ্গে একযোগে ঈশা খান কোচবিহার আক্রমণ করিলেন। লক্ষ্মীনারায়ণ মানসিংহের সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। ১৫৯৬ খ্রীষ্টাব্দের শেষভাগে মানসিংহ সৈন্য লইয়া অগ্রসর হওয়ায় ঈশা খান পলায়ন করিলেন। কিন্তু মুঘলসৈন্য ফিরিয়া গেলে আবার রঘুদেব ও ঈশা খান কোচবিহার আক্রমণ করিলেন। ইহার প্রতিরোধের জন্য মানসিংহ তাঁহার পুত্র দুর্জনসিংহের অধীনে ঈশা খানের বাসস্থান কাভু দখল করিবার জন্য স্থলপথে ও জলপথে সৈন্য পাঠাইলেন। ১৫৯৭ খ্রীষ্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর ঈশা খান ও মাসুম খানের সমবেত বিপুল রণতরী মুঘল রণতরী ঘিরিয়া ফেলিল। দুর্জনসিংহ নিহত হইলেন এবং অনেক মুঘলসৈন্য বন্দী হইল। কিন্তু চতুর ঈশা খান বন্দীদিগকে মুক্তি দিয়া এবং কোচবিহার আক্রমণ বন্ধ করিয়া মুঘল সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার পূর্বক সন্ধি করিলেন। ইহার দুই বৎসর পর ঈশা খানের মৃত্যু হইল (সেপ্টেম্বর, ১৫৯৯ খ্রী)।
ভূষণা-বিজেতা মানসিংহের বীর পুত্র হিম্মৎসিংহ কলেরায় প্রাণত্যাগ করেন। (মার্চ, ১৫৯৭ খ্রী)। ছয় মাস পরে দুর্জনসিংহের মৃত্যু হইল। দুই পুত্রের মৃত্যুতে শোকাতুর মানসিংহ সম্রাটের অনুমতিক্রমে বিশ্রামের জন্য ১৫৯৮ খ্রীষ্টাব্দে আজমীর গেলেন। তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র জগৎসিংহ তাঁহার স্থানে নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে আগ্রায় তাঁহার মৃত্যু হইলে তাঁহার বালক পুত্র মহাসিংহ মানসিংহের অধীনে বাংলার শাসনকর্ত্তার পদে নিযুক্ত হইলেন। এই সুযোগে বাংলা দেশে পাঠান বিদ্রোহীরা আবার মাথা তুলিল এবং একাধিকবার মুঘলসৈন্যকে পরাজিত করিল। উড়িষ্যার উত্তর অংশ পর্যন্ত পাঠানের হস্তগত হইল।
