এই সময়ে আকবর হাসান কুলী বেগ ওরফে খান-ই-জহানকে বাংলার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলেন। তিনি ভাগলপুরে পৌঁছিয়া কিছু মুস্কিলে পড়িলেন। তিনি শিয়া বলিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নী সৈন্যাধ্যক্ষেরা তাঁহার কথা শুনিতে চাহিত না। তোড়মল্ল মধ্যস্থ হইয়া মিষ্ট বাক্য, চতুর ব্যবহার এবং অকৃপণ অর্থদানের দ্বারা তাহাদের বশীভূত করিলেন।
খান-ই-জহান সংবাদ পাইলেন যে দাউদ কররানী আবার বিদ্রোহ করিয়াছেন এবং ভদ্রক, জলেশ্বর প্রভৃতি মোগল অধিকারভুক্ত অঞ্চল জয় করার পরে সমগ্র বাংলা দেশ পুনরধিকার করিয়াছেন; ঈশা খান পূর্ববঙ্গের নদীপথ হইতে শাহ বরদী কর্ত্তৃক পরিচালিত মোগল নৌবহরকে বিতাড়িত করিয়াছেন; জুনৈদ কররানী দক্ষিণ-পূর্ব বিহারে দৌরাত্ম করিতেছেন এবং গজপতি শাহ ডাকাতি করিতেছেন, কেবলমাত্র হাজীপুরে মুজাফফর খান তুরবতী অনেক কষ্টে মোগল ঘাঁটি রক্ষা করিতেছেন।
যুদ্ধ করিতে অনিচ্ছুক সৈন্যাধ্যক্ষদের তোড়রমল্লের সাহায্যে অনেক কষ্টে বুঝাইবার পরে খান-ই-জহান তাঁহাদের লইয়া বাংলার দিকে অগ্রসর হইলেন। তেলিয়াগড়ি তাঁহারা সহজেই অধিকার করিলেন এবং এখানকার আফগান সৈন্যাধ্যক্ষকে তাঁহারা বধ করিলেন। দাউদ পশ্চাদপসরণ করিয়া রাজমহলে গিয়া সেখানে পরিখা খনন করিয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। খান-ই-জহান তাঁহার মুখোমুখি হইয়া অনেকদিন রহিলেন, কিন্তু আক্রমণ করিতে পারিলেন না। তখন আকবর বিহারের সৈন্যবাহিনীকে খান-ই-জহানের সাহায্যে যাইতে বলিলেন এবং খান-ই-জহানকে কয়েক নৌকা বোঝাই অর্থ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম পাঠাইলেন। গজপতির ডাকাতির ফলে মোগলদের যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হইতেছিল, আকবর তাঁহাকে দমন করিবার জন্য তাঁহার অন্যতম সভাসদ শাহবাজ খানকে প্রেরণ করিলেন।
১০ই জুলাই, ১৫৭৬ খ্রী তারিখে বিহারের মোগল সৈন্যবাহিনী রাজমহলে খান-ই-জহানের সহিত যোগ দিল। ১২ই জুলাই মোগলদের সহিত আফগানদের এক প্রচণ্ড যুদ্ধ হইল। বহুক্ষণ যুদ্ধ করিবার পরে আফগানরা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হইল। এই যুদ্ধে জুনৈদ কররানী গোলার আঘাতে নিহত হইলেন, উড়িষ্যার শাসনকর্ত্তা জহান খানও মারা পড়িলেন, কালাপাহাড় ও কুলু লোহানী আহত অবস্থায় পলায়ন করিলেন। দাউদ কররানী বন্দী হইলেন। খান-ই-জহান তাঁহার প্রাণ রক্ষা করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু আমীরদের নিবন্ধে তিনি দাউদকে সন্ধিভঙ্গের অপরাধে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করিলেন। দাউদের মাথা কাটিয়া ফেলিয়া আকবরের নিকট পাঠানো হইল।
অতঃপর খান-ই-জহান সপ্তগ্রামে গেলেন এবং যে সব আফগান সেখানে তখনও গোলযোগ বাধাইতেছিল, তাহাদের দমন করিলেন। দাউদের সম্পদ ও পরিবারের জিম্মাদার মাহমুদ খান খাস-খেল ওরফে “মাটি” তাঁহার নিকট পর্যদস্ত হইলেন। তখন আফগানদের নিজেদের মধ্যেই বিরোধ বাধিল এবং তাহাদের অন্যতম নেতা জমশেদ তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতেই নিহত হইলেন। অবশেষে দাউদের জননী নৌলাখা ও দাউদের পরিবারের অন্যান্য লোকেরা খান-ই-জহানের কাছে আত্মসমর্পণ করিলেন। “মাটি” আত্মসমর্পণ করিতে আসিয়া খান-ই জহানের আজ্ঞায় নিহত হইলেন।
বাংলার প্রথম আফগান শাসক শের শাহ এবং শেষ আফগান শাসক দাউদ কররানী। আফগানরা সাঁইত্রিশ বৎসর এদেশ শাসন করিয়াছিলেন। ১৫৭৬ খ্রীস্টাব্দে দাউদের পরাজয় ও নিধনের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার ইতিহাসের আফগান যুগ সমাপ্ত হইল। অবশ্য দাউদের মৃত্যুর পরেও বাংলা দেশের অনেক অংশে আফগান নায়কেরা নিজেদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছিলেন। তাঁহাদের সম্পূর্ণভাবে দমন বা বশীভূত করিতে মোগল শক্তির অনেক সময় লাগিয়াছিল।* [* বর্তমান পরিচ্ছেদে উল্লিখিত বিভিন্ন তথ্য জৌহরের ‘তজকিরৎ-উল্ ওয়াকৎ’, আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’, আবদুল্লাহর ‘তারিখ-ই-দাউদী’ প্রভৃতি গ্রন্থ হইতে সংগৃহীত হইয়াছে।]
০৯. মুঘল (মোগল) যুগ
নবম পরিচ্ছেদ – মুঘল (মোগল) যুগ
১
মুঘল শাসনের আরম্ভ ও অরাজকতা
১৫৭৬ খ্রীষ্টাব্দে দাউদ খানের পরাজয় ও নিধনের ফলে বাংলাদেশে মুঘল সম্রাটের অধিকার প্রবর্তিত হইল। কিন্তু প্রায় কুড়ি বত্সর পর্যন্ত মুঘলের রাজ্যশাসন এদেশে দৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। বাংলাদেশে একজন মুঘল সুবাদার ছিলেন এবং অল্প কয়েকটি স্থানে সেনানিবাস স্থাপিত হইয়াছিল। কিন্তু কেবল রাজধানী ও এই সেনানিবাসগুলির নিকটবর্তী জনপদসমূহ মুঘল শাসন মানিয়া চলিত; অন্যত্র অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছিয়াছিল। দলে দলে আফগান সৈন্য লুটতরাজ করিয়া ফিরিত–মুঘল সৈন্যেরাও এইভাবে অর্থ উপার্জন করিত। বাংলার জমিদারগণ স্বাধীন হইয়া “জোর যার মুল্লুক তার” এই নীতি অনুসরণপূর্বক পার্শ্ববর্তী অঞ্চল দখল করিতে সর্বদাই সচেষ্ট ছিলেন। এক কথায় বাংলা দেশে আটশত বৎসর পরে আবার মাৎস্য-ন্যায়ের আবির্ভাব হইল।
দাউদ খানকে পরাজিত ও নিহত করিবার পরে, তিন বৎসরের অধিককাল দক্ষতার সহিত শাসন করিবার পর খান-ই-জহানের মৃত্যু হইল (১৯শে ডিসেম্বর, ১৫৭৮ খ্রী)। পরবর্তী সুবাদার মুজাফফর খান এই পদের সম্পূর্ণ অযোগ্য ছিলেন। এই সময় সম্রাট আকবর এক নূতন শাসননীতি মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বত্র প্রচলিত করেন–সমগ্র দেশ কতকগুলি সুবায় বিভক্ত হইল এবং প্রতি সুবায় সিপাহসালার বা সুবাদার ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগের প্রধান অধ্যক্ষগণ দিল্লি হইতে নির্বাচিত হইয়া আসিল। রাজস্ব আদায়েরও নূতন ব্যবস্থা হইল। এতদিন পর্যন্ত প্রাদেশিক মুঘল কর্মচারিগণ যে রকম বেআইনী ক্ষমতা যথেচ্ছ পরিচালনা ও অন্যান্য রকমে অর্থ উপার্জন করিতেন তাহা রহিত হইল। ফলে সুবে বাংলা ও বিহারের মুঘল কর্মচারিগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করিল। আকবরের ভ্রাতা, কাবুলের শাসনকর্ত্তা মীর্জা হাকিম একদল ষড়যন্ত্রকারীর প্ররোচনায় নিজে দিল্লির সিংহাসনে বসিবার উদ্যোগ করিতেছিলেন। তাঁহার দলের লোকেরা বিদ্রোহীদের সাহায্য করিল। মুজাফফর খান বিদ্রোহীদের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইলেন। বিদ্রোহীরা তাঁহাকে বধ করিল (১৯শে এপ্রিল, ১৫৮০ খ্র.)। মীর্জা হাকিম সম্রাট বলিয়া বিঘোষিত হইলেন। বাংলায় নূতন সুবাদার নিযুক্ত হইল। মীর্জা হাকিমের পক্ষ হইতে একজন উকিল রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। এইরূপে বাংলা ও বিহার মুঘল সাম্রাজ্য হইতে বিচ্ছিন্ন হইল। ইহার ফলে আবার অরাজকতা উপস্থিত হইল। আফগান বা পাঠানরা আবার উড়িষ্যা দখল করিল।
