এদিকে মোগল সৈন্যাধ্যক্ষ মুহম্মদ কুলী খান বরলাস সাতগাঁওয়ের ৪০ মাইল দূরে গিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন আফগানরা সাতগাঁও ছাড়িয়া পলায়ন করিল। মোগল বাহিনী সাতগাঁও অধিকার করিবার পর সংবাদ আসিল যে দাউদের অন্যতম প্রধান কর্মচারী ও পরামর্শদাতা শ্রীহরি (প্রতাপাদিত্যের পিতা) “চতর” (যশোর) দেশের দিকে পলায়ন করিতেছেন; তখন মুহম্মদ কুলী খান শ্রীহরির পশ্চাদ্ধাবন করিলেন, কিন্তু তাঁহাকে বন্দী করিতে পারিলেন না। রাজা তোড়রমন্ত্র বর্ধমান হইতে রওনা হইয়া মান্দারণে উপস্থিত হইলেন; দাউদ ইহার ২০ মাইল দূরে দেবরাকসারী গ্রামে শিবির ফেলিয়াছিলেন। তোড়মল্ল মুনিম খানের নিকট হইতে সৈন্য আনাইয়া মান্দারণ হইতে কোলিয়া গ্রামে গেলেন। দাউদ তখন হরিপুর (দাঁতনের ১১ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবিস্থত) গ্রামে চলিয়া গেলেন। তখন তোড়রমল্ল মেদিনীপুরে গেলেন। এখানে মুহম্মদ কুলী খান বরলাস দেহত্যাগ করিলেন, ফলে মোগল সৈন্যেরা খুব হতাশ ও বিশৃঙ্খল হইয়া পড়িল। তখন তোড়রমল্ল বাধ্য হইয়া মান্দারণে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এই সংবাদ পাইয়া মুনিম খান নূতন একদল সৈন্য লইয়া বর্ধমান হইতে রওনা হইলেন, তোড়রমলুও মান্দারণ হইতে সসৈন্যে রওনা হইলেন, চেতোতে মুনিম খান ও তোড়মল্ল মিলিত হইলেন। তাঁহাদের কাছে সংবাদ আসিল যে, দাউদ হরিপুরে পরিখা খনন, প্রতিরোধ প্রাচীর নির্মাণ, এবং বনময় পথের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলি অবরুদ্ধ করিয়া প্রস্তুত হইয়া আছেন। মোগল সৈন্যেরা এই কথা শুনিয়া ভগ্নমনোরথ হইয়া পড়িল এবং আর যুদ্ধ করিতে চাহিল না। মুনিম খান ও হোড়রমল্ল তাহাদের অনেক করিয়া বুঝাইয়া যুদ্ধে উৎসাহিত করিলেন এবং স্থানীয় লোকদের সাহায্যে জঙ্গলের মধ্য দিয়া একটি ঘুর-পথ আবিষ্কার করিলেন। এই পথ চলাচলের উপযুক্ত করিয়া লইবার পর মোগল বাহিনী ইহা দিয়া দক্ষিণ-পূর্বে অগ্রসর হইল এবং নানজুর (দাঁতনের ১১ মাইল পূর্বে অবস্থিত) গ্রামে পৌঁছিল। এখন দাউদকে পশ্চাৎ দিক হইতে আক্রমণের সুযোগ উপস্থিত হইল। দাউদ ইতিপূর্বে তাঁহার পরিবারবর্গকে কটকে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি এখন উপায়ান্তর না দেখিয়া মোগল বাহিনীর সহিত যুদ্ধ করিলেন। সুবর্ণরেখা নদীর নিকটে তুকরোই (দাঁতনের ৯ মাইল দূরে অবস্থিত) গ্রামের প্রান্তরে ৩রা মার্চ, ১৫৭৫ খ্রী তারিখে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হইল। এই যুদ্ধে দাউদের বাহিনীই প্রথমে আক্রমণ চালাইয়া আশাতীত সাফল্য অর্জন করিল। তাহারা খান-ই-জহানকে নিহত করিল ও মুনিম খানকে পশ্চাদপসরণে বাধ্য করিল। কিন্তু দাউদের নির্বুদ্ধিতার ফলে তাঁহার বাহিনী শেষপর্যন্ত পরাজিত হইল। তাঁহার প্রধান সেনাপতি গুজ্বর খান যুদ্ধে অসংখ্য সৈন্যসমেত নিহত হইলেন। পরাজিত হইয়া দাউদ পলাইয়া গেলেন। তাঁহার বাহিনীও ছত্রভঙ্গ হইয়া পলাইতে লাগিল। মোগল সৈন্যেরা তাঁহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া বিনা বাধায় বেপরোয়া হত্যা ও লুণ্ঠন চালাইতে লাগিল এবং বহু আফগানকে বন্দী করিল। পরের দিন ৮২ বৎসর বয়স্ক মোগল সেনাপতি মুনিম খান অভূতপূর্ব নিষ্ঠুরতার সহিত সমস্ত আফগান বন্দীকে বধ করিয়া তাহাদের ছিন্নমুণ্ড সাজাইয়া আটটি সুউচ্চ মিনার প্রস্তুত করিলেন।
তোড়রমল দাউদের পশ্চাদ্ধাবন করিলেন। দাউদ কোথাও দাঁড়াইতে না পারিয়া শেষপর্যন্ত কটকে গিয়া সেখানকার দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। কিন্তু মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে সাফল্যলাভের কোন সম্ভাবনা নাই দেখিয়া তিনি ১২ই এপ্রিল তারিখে কটকের দুর্গ হইতে বাহির হইয়া আসিলেন এবং মুনিম খানের কাছে বশ্যতা স্বীকার করিলেন। ২১শে এপ্রিল তারিখে মুনিম খান দাউদকে উড়িষ্যায় জায়গীর প্রদান করিয়া টাণ্ডায় ফিরিয়া আসিলেন।
দাউদ খান নতি স্বীকার করিলেও ইতিমধ্যে ঘোড়াঘাটে মোগল বাহিনীর শোচনীয় বিপর্যয় ঘটিয়াছিল; মুনিম খানের রাজধানী হইতে অনুপস্থিতির সুযোগ লইয়া কালাপাহাড় ও বাবুই মনক্লী প্রভৃতি আফগান নায়কেরা কুচবিহার হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া ঘোড়াঘাটে অবস্থিত মোগলদের পরাজিত ও বিতাড়িত করিছিল। এই সংবাদ পাইয়া মুনিম খান সৈন্যবাহিনী লইয়া ঘোড়াঘাটের দিকে রওনা হইলেন। কিন্তু ঘোড়াঘাটে পৌঁছিবার পূর্বে তিনি গৌড় জয় করিলেন। বর্ষার সময় টাণ্ডার জলো জমিতে থাকার অসুবিধা হইত বলিয়া মুনিম খান ভাবিয়াছিলেন গৌড় জয় করিয়া সেখানেই রাজধানী স্থাপন করিবেন। কিন্তু গৌড় নগরী বহুকাল পরিত্যক্ত হইয়া পড়িয়াছিল বলিয়া সেখানকার ঘরবাড়ীগুলি অস্বাস্থ্যকর হইয়া উঠিয়াছিল। সেখানে কয়েকদিন থাকার ফলে মুনিম খানের লোকেরা অসুস্থ হইয়া পড়িল এবং কয়েক শত লোক মারা গেল। ফলে মুনিম খানের আর ঘোড়াঘাটে যাওয়া হইল না, তিনি টাণ্ডায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। প্রত্যাবর্তনের দশদিন পরে ২৩শে অক্টোবর, ১৫৭৫ খ্রী তারিখে মুনিম খান পরলোকগমন করিলেন। তাঁহার ফলে মোগলদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। তাহাদের ঐক্যও নষ্ট হইয়া গেল। তখন শত্রুরা চারিদিক হইতে আক্রমণ করিতে লাগিল। বেগতিক দেখিয়া মোগলরা সকলে গৌড়ে সমবেত হইল এবং সেখান হইতে বাংলা দেশ ছাড়িয়া সকলেই ভাগলপুর চলিয়া গেল। সেখানে গিয়া তাহারা দিল্লি ফিরিবার উদ্যোগ করিতে লাগিল।
