৩। বায়াজিদ কররানী : সুলেমানের মৃত্যুর পর তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র বায়াজিদ তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইলেন। কিন্তু বায়াজিদ তাঁহার উদ্ধত আচরণ ও কর্কশ ব্যবহারের জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই অমাত্যদের নিকট অপ্রিয় হইয়া উঠিলেন। ফলে একদল অমাত্য–ইহাদের মধ্যে লোহানীরাই প্রধানতাঁহার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করিলেন। সুলেমানের ভাগিনেয় ও জামাতা হনসু (বা হাঁসু) ইঁহাদের সঙ্গে যোগ দিয়া বায়াজিদকে হত্যা করিলেন; কিন্তু তিনি স্বয়ং লোদী খান ও অন্যান্য বিশ্বস্ত অমাত্যদের হাতে বন্দী হইয়া নিহত হইলেন। বায়াজিদ কররানী স্বল্পকালীন রাজত্বের মধ্যেই আকবরের অধীনতা অস্বীকার করিয়া নিজের নামে খুৎবা পাঠ ও মুদ্রা উৎকীর্ণ করাইয়াছিলেন।
৪। দাউদ কররানী : হসুকে বধ করিয়া অমাত্যের সুলেমানের দ্বিতীয় পুত্র দাউদকে সিংহাসনে বসাইলেন। তরুণবয়স্ক দাউদ কররানী অত্যন্ত নির্বোধ ও উত্তপ্তমস্তিষ্ক প্রকৃতির ছিলেন; উপরন্তু তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় দুশ্চরিত্র ও মদ্যপ। অমাত্যদের অপমান করিয়া এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী জ্ঞাতিদিগকে বিশ্বাসঘাতকতার সহিত হত্যা করিয়া তিনি অনতিবিলম্বেই বহু শত্রু সৃষ্টি করিলেন। কুত্ত্ব খান শুজুর কররানী প্রভৃতি স্বার্থপর অমাত্যদের কুমন্ত্রণায় দাউদ লোদী খানের মত সুযোগ্য ও বিশ্বস্ত মন্ত্রীর প্রতি অপ্রসন্ন হইলেন এবং লোদী খানের জামাতা (তাজ খানের পুত্র) য়ুসুফকে হত্যা করিলেন। দাউদও বায়াজিদের মত আকবরের অধীনতা অস্বীকার করিয়া নিজের নামে খুবা পাঠ ও মুদ্রা উত্তীর্ণ করাইলেন।
দাউদ বাংলার সিংহাসনে বসিবার পর আফগানদের প্রধান সেনাপতি গুজ্বর খান বায়াজিদের পুত্রকে বিহারের সিংহাসনে বসাইলেন। এ কথা শুনিয়া দাউদ বিহার নিজের দখলে আনিবার জন্য লোদী খানের অধীনে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী বিহারে পাঠাইলেন; ইতিমধ্যে আকবরও বিহার অধিকার করিবার জন্য খান-ই খানান মুনিম খানকে প্রেরণ করিয়াছিলেন; এই সংবাদ পাইয়া লোদী খান ও গুজুর খান নিজেদের বিরোধ মিটাইয়া ফেলিলেন এবং মুনিম খানকে অনেক উপহার দিয়া ও আনুগত্যে শপথ গ্রহণ করাইয়া শান্ত করিলেন।
তখন দাউদ লোদী খানের উপর ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাকে দমন করিবার জন্য স্বয়ং এক সৈন্যবাহিনী লইয়া বিহারে গেলেন; কোন কোন বিরোধিপক্ষীয় লোককে তিনি দমনও করিলেন। ইতিমধ্যে আকবর তাঁহার গুজরাট অভিযান সমাপ্ত করিয়া মুনিম খানকে আরও অনেক সৈন্য পাঠাইয়াছিলেন। ইহাদের পাইয়া মুনিম খান যুদ্ধযাত্রা করিলেন এবং ত্রিমোহনী (আরার ১২ মাইল উত্তরে অবস্থিত) পর্যন্ত অগ্রসর হইলেন। তখন দাউদ কুলু লোহানী ও গুজর খানের এবং শ্রীহরি নামে একজন হিন্দুর পরামর্শে লোদী খানের কাছে খুব করুণ ও বিনীতভাবে আবেদন জানাইয়া বলিলেন যে তাঁহার বংশের প্রতি আনুগত্য যেন তিনি ত্যাগ না করেন; লোদী খানকে তাঁহার শিবিরে আসিবার জন্য তিনি বিনীত অনুরোধ জানাইলেন। কিন্তু লোদী খান তাঁহার শিবিরে আসিলে দাউদ তাঁহাকে বধ করিলেন। ইহার ফলে আফগানদের মধ্যে বিরাট ভাঙন ধরিল। এদিকে মোগল বাহিনী সাবধানতার সহিত সুশৃঙ্খলভাবে অগ্রসর হইয়া পাটনার নিকটে পৌঁছিল। পাটনায় দাউদ প্রতিরক্ষা-ব্যুহ রচনা করিয়া অবস্থান করিতেছিলেন।
অতঃপর আকবর স্বয়ং বহু কামান ও বিশাল রণহস্তী সমেত এক নৌবহর লইয়া বিহারে আসিয়া মুনিম খানের সহিত যোগ দিলেন (৩রা আগস্ট, ১৫৭৪ খ্রী)। আকবর দেখিলেন যে পাটনার (গঙ্গার) ওপারে অবস্থিত হাজীপুর দুর্গ অধিকার করিতে পারিলে পাটনা অধিকার করা সহজসাধ্য হইবে। তাই তিনি ৬ই আগষ্ট কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধের পর হাজীপুর দুর্গ অধিকার করিলেন এবং তাহাতে আগুন লাগাইয়া দিলেন। ইহাতে দাউদ অত্যন্ত ভয় পাইয়া গেলেন এবং সেই রাত্রই সদলবলে জলপথে বাংলায় পলাইয়া গেলেন; পলাইবার সময় অনেক আফগান জলে ডুবিয়া মরিল। দাউদের সৈন্যদের লইয়া সেনাপতি গুজর খান স্থলপথে বাংলায় গেলেন। মোগলেরা পরদিন সকালে পাটনার পরিত্যক্ত দুর্গ অধিকার করিল। তারপর আকবর স্বয়ং মোগল বাহিনীর নেতৃত্ব করিয়া এক দিনেই দরিয়াপুরে (পাটনা ও মুঙ্গেরের মধ্যপথে অবস্থিত) পৌঁছিলেন। ইহার পর আকবর ফিরিয়া গেলেন, কিন্তু মুনিম খান ১৩ই আগস্ট তারিখে ২০,০০০ সৈন্য লইয়া বাংলার দিকে রওনা হইলেন এবং বিনা বাধায় সূরজগড়, মুঙ্গের, ভাগলপুর ও কলহগাঁও অধিকার করিয়া তেলিয়াগড়ি গিরিপথের পশ্চিমে গৌছিলেন। দাউদ এখানে প্রতিরোধ-ব্যুহ রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহার সেনাপতি খান-ই-খানান ইসমাইল খান সিলাহদার মোগল বাহিনীকে সাময়িকভাবে প্রতিহত করিলেন। কিন্তু মজনূন খান কাকশালের নেতৃত্বে মোগল অশ্বারোহী বাহিনী স্থানীয় জমিদারদের সাহায্যে রাজমহল পর্বতমালার মধ্য দিয়া তেলিয়াগড়িকে দক্ষিণে ফেলিয়া রাখিয়া চলিয়া গেল। তখন আফগানরা যুদ্ধ না করিয়াই পলাইয়া গেল এবং মুনিম খান বিনা বাধায় বাংলার রাজধানী টাণ্ডায় প্রবেশ করিলেন (২৫শে সেপ্টেম্বর, ১৫৭৪ খ্রী)।
দাউদ কররানী তখন সাতগাঁও হইয়া উড়িষ্যায় পলায়ন করিলেন। মুনিম খান রাজা তোড়রমল্ল ও মুহম্মদ কুলী খান বরলাসকে তাঁহার পশ্চাদ্ধাবনে নিযুক্ত করিলেন। অন্যান্য আফগান নায়কেরা উত্তর-পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণ বঙ্গে গিয়া সমবেত হইলেন; কালাপাহাড়, সুলেমান খান মনক্লী ও বাবুই মনক্লী ঘোড়াঘাটে গেলেন; তাঁহাদের দমন করিবার জন্য মুনিম খান মজনূন খান কাকশালকে ঘোড়াঘাটে পাঠাইলেন; মজনূন খান সুলেমান খান মনক্লীকে নিহত এবং অন্যান্য আফগানদের পরাজিত ও বিতাড়িত করিয়া ঘোড়াঘাট অধিকার করিলেন; পরাজিত আফগানরা কোচবিহারে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। ইমাদ খান কররানীর পুত্র জুনৈদ খান কররানী ইতিপূর্বে মোগলদের দলে যোগদান করিয়াছিলেন, কিন্তু এখন তিনি বিদ্রোহী হইলেন এবং ঝাড়খণ্ডের জঙ্গল হইতে বাহির হইয়া রায় বিহারমলু ও মুহম্মদ খান গখরকে পরাজিত ও নিহত করিলেন। এদিকে মাহমূদ খান ও মুহম্মদ খান নামে দুইজন আফগান নায়ক সরকার মাহমূদাবাদের অন্তর্গত সেলিমপুর নগর অধিকার করিয়াছিলেন। রাজা তোড়রমল কর্ত্তৃক প্রেরিত একদল সৈন্য মাহমূদ খানকে পরাজিত ও মুহম্মদ খানকে নিহত করিয়া সেলিমপুর অধিকার করিল। তখন জুনেদ খান আবার ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করিলেন।
