১৫৬৭-৬৮ খ্রীস্টাব্দের শীতকালে আকবর যখন চিতোর আক্রমণে লিপ্ত সেই সময়ে সুলেমান তাঁহার পুত্র বায়াজিদ এবং ভূতপূর্ব মোগল সেনাধ্যক্ষ সিকন্দর উজবকের নেতৃত্বে উড়িষ্যায় এক সৈন্যবাহিনী পাঠাইলেন। ইহারা ছোটনাগপুর ও ময়ূরভঞ্জের মধ্য দিয়া অগ্রসর হইলেন। ইহাদের প্রতিরোধ করিবার জন্য মুকুন্দদেব ছোট রায় ও রঘুভঞ্জ নামক দুই ব্যক্তির অধীনে এক সৈন্যবাহিনী পাঠাইলেন, কিন্তু দুই ব্যক্তি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া তাঁহারই বিরুদ্ধতা করিল। মুকুন্দদেব তখন কটসামা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন এবং অর্থ দ্বারা বায়াজিদের অধীন একদল সৈন্যকে বশীভূত করিলেন। অতঃপর মুকুন্দদেবের সহিত বিশ্বাসঘাতকদের যুদ্ধ হইল এবং এই যুদ্ধে মুকুন্দদেব ও ছোট রায় নিহত হইলেন। লায়ঙ্গগড়ের সৈন্যাধ্যক্ষ রামচন্দ্র ভঞ্জ (বা দুর্গা ভঞ্জ) উড়িষ্যার সিংহাসনে আরোহণ করিলেন, কিন্তু সুলেমান বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া তাহাকে বন্দী ও বধ করিলেন। এইভাবে তিনি ইব্রাহিম সূরকেও প্রথমে আত্মসমর্পণ করিতে বলিয়া তাঁহার পর হাতের মুঠার মধ্যে পাইয়া বধ করিলেন।
জাজপুর অঞ্চল হইতে সুলেমানের অন্যতম সেনাপতি কালাপাহাড়ের* অধীনে একদল অশ্বারোহী আফগান সৈন্য পুরীর দিকে অসম্ভব দ্রুতগতিতে রওনা হইল এবং অল্পকালের মধ্যেই তাঁহারা একরূপ বিনা বাধায় পুরী অধিকার করিল। তাহারা জগন্নাথ-মন্দিরের ভিতর সঞ্চিত বিপুল ধনরত্ন অধিকার করিল, মন্দিরটি আংশিকভারে বিধ্বস্ত করিল এবং মূর্ত্তিগুলিকে খণ্ড খণ্ড করিয়া নোংরা স্থানে নিক্ষিপ্ত করিল। বহু সোনার মূর্ত্তি সমেত অনেক মণ সোনা তাহারা হস্তগত করিল। মোটের উপর, অল্প কিছু কালের মধ্যেই সমগ্র উড়িষ্যা সুলেমান কররানীর অধিকারভুক্ত হইল। এই প্রথম উড়িষ্যা মুসলমানের অধীনে আসিল।
——
[*সুলেমান কররানীর সেনাপতি কালাপাহাড় হিন্দু রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান এবং হিন্দুদের মন্দির ও দেবমূর্ত্তি ধ্বংস করার জন্য ইতিহাসে খ্যাত হইয়া আছেন। ইনি প্রথম জীবনে হিন্দু ও ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং পরবর্তীকালে মুসলমান হইয়াছিলেন বলিয়া, কিংবদন্তী আছে। কিন্তু এই কিংবদন্তীর কোন ভিত্তি নাই। আবুল ফজলের আকবর নামা’, বদাওনীর নন্তখ-উৎ তওয়ারিখ এবং নিয়ামতুল্লাহর মখজান-ই-আফগানী’ হইতে প্রামাণিকভাবে জানিতে পারা যায় যে, কালাপাহাড় জন্ম-মুসলমান ও আফগান ছিলেন। তিনি সিকন্দর সুরের ভ্রাতা ছিলেন; তাঁহার নামান্তর “রাজু”, শেষোক্ত বিষয়টি হইতে অনেকে কালাপাহাড়কে হিন্দু মনে করিয়াছেন কিন্তু “রাজু” নাম হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচলিত। এই কালাপাহাড় ইসলাম শাহের রাজত্বকাল হইতে সুরু করিয়া দাউদ কররানীর রাজত্বকাল পর্যন্ত বাংলার সৈন্যবাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক ছিলেন। দাউদ কররানীর মৃত্যুর সাত বৎসর পরে ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মোগল রাজশক্তির সহিত বিদ্রোহী মাসুম কাবুলীর যুদ্ধে কালাপাহাড় মাসুমের হইয়া সংগ্রাম করেন এবং তাহাতেই নিহত হন। ইনি ভিন্ন আরও একজন কালাপাহাড় ছিলেন, তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ পাদে বর্তমান ছিলেন। তিনি বাহ্লােল লোদী ও সিকন্দর লোদীর সমসাময়িক এবং তাঁহাদের রাজত্বকালে গুরুত্বপূর্ণ রাজপদসমূহে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কেন এই দুইজনের “কালাপাহাড়” নাম হইয়াছিল, তাহা বলিতে পারা যায় না। ‘রিয়াজ-উস্ সলাতীন’-এর মতে কালাপাহাড় বাবরের অন্যতম আমীর ছিলেন এবং আকবরের সেনাপতিরূপে উড়িষ্যা জয় করিয়াছিলেন : এই সব কথা একেবারে অমুলক। দুর্গাচরণ সান্যাল তাঁহার ‘বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস’ গ্রন্থে কালাপাহাড় সম্বন্ধে যে বিবরণ দিয়াছেন, তাহা সম্পূর্ণ কাল্পনিক, সত্যের বিন্দুবাষ্পও তাঁহার মধ্যে নাই।]
——–
সুলেমান কররানীর রাজত্বকালের প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে কোচবিহারে এক নূতন রাজবংশের অভ্যুদয় হইয়াছিল। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বসিংহ অত্যন্ত শক্তিশালী নৃপতি ছিলেন এবং “কামতেশ্বর” উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন, কিন্তু বাংলার সুলতান ও অহোম রাজার সহিত তিনি মৈত্রীর সম্পর্ক রক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র নরনারায়ণ (রাজত্বকাল আনুমানিক ১৫৩৮-৮৭ খ্রী) ও তৃতীয় পুত্র শুক্লধ্বজ (নামান্তর “চিলা রায়”) এই নীতি অনুসরণ করেন নাই। তাহারা অহোমরাজকে কয়েকবার আক্রমণ করিয়া পরাজিত করিলেন এবং অবশেষে সুলেমান কররানীর রাজ্য আক্রমণ করিলেন। কিন্তু সুলেমানের বাহিনী তাহাদের পরাজিত করিল এবং শুক্লধ্বজকে বন্দী করিল। অতঃপর সুলেমানের বাহিনী কোচবিহার আক্রমণ করিল এবং সুদূর তেজপুর পর্যন্ত হানা দিল, কিন্তু কোচবিহার ও কামরূপে স্থায়ী অধিকার স্থাপন না করিয়া তাহারা কেবলমাত্র হাজো, কামাখ্যা ও অন্যান্য স্থানের মন্দিরগুলি ধ্বংস করিয়া ফিরিয়া আসিল। কিংবদন্তী অনুসারে কালাপাহাড় এই অভিযানে নেতৃত্ব করিয়াছিলেন। সুলেমান স্বয়ং কোচবিহারে রাজধানী অবরোধ করিয়া প্রায় জয় করিয়া ফেলিয়াছিলেন, কিন্তু উড়িষ্যার এক অভ্যুত্থানের সংবাদ পাইয়া তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হন। কয়েক বৎসর বাদে লোদী খানের পরামর্শে সুলেমান শুক্লধ্বজকে মুক্ত করিয়া দেন। এই সময়ে মোগলদের বাংলা আক্রমণ আসন্ন হইয়া উঠিতেছিল; কোচবিহারকে খুশী রাখিতে পারিলে হয়তো এই আক্রমণে তাঁহার সাহায্য পাওয়া যাইবে–এইরূপ চিন্তাই শুক্লধ্বজকে মুক্তি দেওয়ার কারণ বলিয়া মনে হয়। যাহা হউক, সুলেমানের জীবদ্দশায় মোগলেরা বাংলা আক্রমণ করে নাই। সুলেমান ১৫৭২ খ্রীষ্টাব্দের ১১ই অক্টোবর তারিখে পরলোকগমন করেন।
