শোন নদ ছিল মোগল অধিকার ও সুলেমানের অধিকারের সীমারেখা। সুলেমান মোগল সম্রাট আকবর এবং তাঁহার অধীনস্থ (সুলেমানের রাজ্যের প্রতিবেশী অঞ্চলের) শাসনকর্ত্তা খান-ই-জমান আলী কুলী খান ও খান-ই-খানান মুনিম খানকে উপহার দিয়া সন্তুষ্ট রাখিতেন। তিনি দুই একবার ভিন্ন আর কখনও প্রকাশ্যে মোগল শক্তির বিরুদ্ধাচরণ করেন নাই, তবে ভিতরে ভিতরে অনেকবার মোগল-বিরোধীদের সাহায্য করিয়াছেন। ১৫৬৫ খ্রীষ্টাব্দে খান-ই-জমান আলী কুলী খান আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং হাজীপুরে অবস্থান করিয়া আত্মরক্ষা করিতে থাকেন। তিনি সুলেমান কররানীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আকবর সুলেমানকে আলী কুলী খানের সহিত যোগদান না করিতে অনুরোধ জানাইবার জন্য হাজী মুহম্মদ খান সীস্তানী নামে একজন দূতকে প্রেরণ করেন। কিন্তু এই দূত সুলেমানের নিকট পৌঁছিতে পারেন নাই; তিনি রোটাস দুর্গের নিকটে পৌঁছিলে একদল বিদ্রোহী আফগান তাঁহাকে বন্দী করিয়া আলী কুলী খানের নিকট প্রেরণ করেন। অতঃপর সুলেমান কররানী আলী কুলী খানের সহিত যোগ দিয়া রোটাস দুর্গ জয়ের জন্য এক সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। রোটাস দুর্গের পতন আসন্ন হইয়া আসিতেছিল, এমন সময়ে সংবাদ আসিল যে আকবরের বাহিনী আসিতেছে। তখন সুলেমান রোটাস হইতে তাঁহার সৈন্যবাহিনী সরাইয়া লইলেন। ইহার পর আলী কুলী খান, হাজী মুহম্মদ সীস্তানী ও খান-ই-খানান মুনিম খানের মধ্যস্থতায় আকবরের সহিত সন্ধিস্থাপন করেন। সন্ধিস্থাপনের পূর্বাহ্ন পর্যন্ত সুলেমান কররানীর অন্যতম সেনাপতি কালাপাহাড় আলী কুলী খানের নিকট উপস্থিত ছিলেন। ইহার পর ১৫৬৭ খ্রীষ্টাব্দে আলী কুলী খান আবার আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং আকবর কর্ত্তৃক পরিচালিত বাহিনীর সহিত যুদ্ধ করিয়া পরাজিত ও নিহত হন। তখন আলী কুলী খান কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত জমানীয়া নগরের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আসাদুল্লাহ্ সুলেমান কররানীর নিকটে লোক পাঠাইয়া জমানীয়া নগর সুলেমানকে সমর্পণ করিবার প্রস্তাব করেন। সুলেমান এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং জমানীয়া নগর অধিকারের জন্য এক সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে খান-ই-খানান মুনিম খান দূত প্রেরণ করিয়া আসাদুল্লাহকে বশীভূত করেন; তখন সুলেমানের সেনাবাহিনী প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হয়। সুলেমানের প্রধান উজীর লোদী খান এই সময়ে শোন নদের তীরে উপস্থিত ছিলেন; তিনি খান-ই-খানানের সহিত সন্ধি করিলেন। ইহার পর সুলেমান কররানী খান-ই খানান মুনিম খানের সহিত পাটনার নিকটে দেখা করিলেন এবং আকবরের নামে মুদ্রাঙ্কন করাইতে ও খুৎবা পাঠ করাইতে প্রতিশ্রুত হইলেন। এই প্রতিশ্রুতি সুলেমান বরাবর পালন করিয়াছিলেন। সুলেমানের সহিত যখন মুনিম খান সাক্ষাৎ করেন, তিনি তাঁহার লোকজন লইয়া পাটনার ৫/৬ ক্রোশ দূরে পৌঁছিলে সুলেমান স্বয়ং গিয়া তাঁহাকে স্বাগত জানান এবং তাঁহার সহিত আলিঙ্গনবদ্ধ হন। অতঃপর মুনিম খান সুলেমানকে নিজের শিবিরে নিমন্ত্রণ করিয়া এক ভোজ দেন। পরদিন তিনি সুলেমানের শিবিরে যান। এই সময়ে কোন কোন আফগান নায়ক মুনিম খানকে বন্দী করিতে পরামর্শ দেন, কিন্তু লোদী খানের পরামর্শ অনুসারে সুলেমান এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেন; অতঃপর লোদী খান ও সুলেমানের পুত্র বায়াজিদ মুনিম খানের শিবিরে যান। ইহার পর মুনিম খান জৌনপুরে এবং সুলেমান বাংলায় প্রত্যাবর্তন করেন। সুলেমান ইহার পর আর কখনও আকবরের অধীনতা অস্বীকার করেন নাই। তিনি সিংহাসনে বসেন নাই, যদিও ‘আলা হজরৎ’ উপাধি লইয়াছিলেন এবং সম্পূর্ণভাবে রাজার মতই আচরণ করিতেন। বিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত প্রধান উজীর লোদী খানের পরামর্শের দরুণই সুলেমান কূটনৈতিক ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করিয়াছিলেন এবং কোন বিপজ্জনক অভিযানে প্রবৃত্ত হন নাই। সুলেমানের আমলে গৌড় নগরী অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হইয়া পড়ায় সুলেমান টাণ্ডাতে তাঁহার রাজধানী স্থানান্তরিত করিয়াছিলেন।
এই সময়ে বাংলার প্রতিবেশী হিন্দু রাজ্য উড়িষ্যা একের পর এক শক্তিহীন রাজার সিংহাসনে আরোহণ এবং অমাত্য ও সেনানায়কদের আভ্যন্তরীণ কলহের ফলে দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল। হরিচন্দন মুকুন্দদেব নামে একজন মন্ত্রী এই সময়ে খুব শক্তিশালী হইয়া উঠিয়াছিলেন। চক্রপ্রতাপ দেব ও নরসিংহ জেনা নামে দুইজন রাজা অল্পকাল রাজত্ব করিয়া নিহত হইবার পর মুকুন্দদেব রঘুরাম জেনা নামে একজন রাজপুত্রকে সিংহাসনে বসাইলেন। কিন্তু ১৫৬০-৬১ খ্রীষ্টাব্দে মুকুন্দদেব নিজেই সিংহাসনে আরোহণ করিলেন এবং রাজ্যে শৃঙ্খলা আনয়ন করিলেন। ইব্রাহিম সূর নামে মুহম্মদ শাহ আদিলের একজন প্রতিদ্বন্দ্বী উড়িষ্যায় আশ্রয় লইয়াছিলেন। মুকুন্দদেব তাঁহাকে জমি দিয়াছিলেন এবং বাংলার সুলতানের নিকট তাঁহাকে সমর্পণ করিতে রাজী হন নাই। ১৫৬৫ খ্রীষ্টাব্দে মুকুন্দদেব আকবরের আনুগত্য স্বীকার করেন এবং আকবরকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, সুলেমান কররানী যদি আকবরের শত্রুতা করেন, তবে তিনি ইব্রাহিম সূরকে দিয়া বাংলা আক্রমণ করাইবেন। মুকুন্দদেব নিজে একবার পশ্চিমবঙ্গের সাতগাঁও পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং গঙ্গার কূলে একটি ঘাট নির্মাণ করেন।
