ইতিমধ্যে হুমায়ুন আফগান সুলতান সিকন্দর শাহ সূরকে পরাজিত করিয়া দিল্লি ও পঞ্জাব পুনরধিকার করিয়াছিলেন এবং তাঁহার অল্প পরেই পরলোকগমন করিয়াছিলেন (২৬শে জানুয়ারী, ১৫৫৬ খ্রী)। ইহার কয়েক মাস পরে হুমায়ুনের বালক পুত্র ও উত্তরাধিকারী আকবর এবং তাঁহার অভিভাবক বৈরাম খানের সহিত মুহম্মদ শাহ আদিলের সেনাপতি হিমুর পাণিপথ প্রাঙ্গণে সংগ্রাম হইল এবং তাহাতে হিমু পরাজিত ও নিহত হইলেন (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬ খ্রী)। মুহম্মদ শাহ আদিল স্বয়ং পরাজিত হইয়া পূর্বদিকে পশ্চাদপসরণ করিলেন, কিন্তু (সূরজগড়ের ৪ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত) ফতেহপুরে বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন বাহাদুর শাহ তাঁহাকে আক্রমণ করিয়া পরাজিত ও নিহত করিলেন।
অতঃপর বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন জৌনপুরের দিকে অগ্রসর হইলেন, কিন্তু অযোধ্যায় অবস্থিত মোগল সেনাপতি খান-ই-জামান তাঁহাকে পরাজিত করিয়া তাঁহার শিবির লুণ্ঠন করিলেন। তখন গিয়াসুদ্দীন স্বস্থানে ফিরিয়া আসিলেন এবং বাংলা ও ত্রিহুতের অধিপতি থাকিয়াই সন্তুষ্ট রহিলেন। ইহার পরবর্তী কয়েক বৎসর তিনি শান্তিতেই কাটাইলেন এবং খান-ই-জামানের সহিত পরিপূর্ণ বন্ধুত্ব রক্ষা করিলেন। তবে পূর্ব-ভারতের এখানে সেখানে ছোটখাট স্থানীয় ভূস্বামীদের অভ্যুত্থান তাঁহাকে দুই একবার বিব্রত করিয়াছিল। ১৫৬০ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হয়।
গিয়াসুদ্দীন বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তাঁহার ভ্রাতা জলালুদ্দীন দ্বিতীয় গিয়াসুদ্দীন নাম গ্রহণ করিয়া সুলতান হইলেন (১৫৬০ খ্রী)। মোগল শক্তির সহিত তিনি বন্ধুত্ব রক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু এই সময়ে কররানী-বংশীয় আফগানরা দক্ষিণ-পূর্ব বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের অনেকখানি অংশ অধিকার করিয়া দ্বিতীয় গিয়াসুদ্দীনের নিকট স্থায়ী অশান্তির কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।
১৫৬৩ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় গিয়াসুদ্দীনের মৃত্যু হয় এবং তাঁহার পুত্র তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হন। এই পুত্রের নাম জানা যায় না; ইনি কয়েক মাস রাজত্ব করার পরে এক ব্যক্তি ইহাকে হত্যা করেন এবং তৃতীয় গিয়াসুদ্দীন নাম লইয়া সুলতান হন। ইহার এক বৎসর বাদে কররানী-বংশীয় তাজ খান তৃতীয় গিয়াসুদ্দীনকে নিহত করিয়া বাংলার অধিপতি হন।
৫
কররানী বংশ
১। তাজ খান কররানী : কররানীরা আফগান বা পাঠান জাতির একটি প্রধান শাখা। তাহাদের আদি নিবাস বঙ্গাশে (আধুনিক কুররম)। শের খানের প্রধান প্রধান অমাত্য ও কর্মচারীদের মধ্যে কররানী বংশের অনেকে ছিলেন; তন্মধ্যে তাজ খান অন্যতম। ইনি মুহম্মদ শাহ আদিলের সিংহাসনে আরোহণের পরে তাঁহার রাজধানী ছাড়িয়া পলাইয়া যান এবং বর্তমান উত্তরপ্রদেশের গাঙ্গেয় অঞ্চলের একাংশ অধিকার করেন। কিন্তু মুহম্মদ শাহ আদিল তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিয়া ছিব্রামাউ-য়ের (ফরাক্কাবাদের ১৮ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত) যুদ্ধে তাঁহাকে পরাজিত করেন। তখন তাজ খান কররানী খওয়াসপুর টাণ্ডায় পলাইয়া আসিয়া তাঁহার ভ্রাতা ইমাদ, সুলেমান ও ইলিয়াসের সহিত মিলিত হন। ইহারা এই অঞ্চলের জায়গীরদার ছিলেন। ইহার পর এই চারি ভ্রাতা জনসাধারণের নিকট হইতে রাজস্ব আদায় করিতে থাকেন এবং সন্নিহিত অঞ্চলের গ্রামগুলি লুটপাট করিতে থাকেন। মুহম্মদ শাহ আদিলের এক শত হাতি ইহারা অধিকার করিয়া লন। বহু আফগান বিদ্রোহী ইহাদের দলে যোগদান করে। কিন্তু চুনারের নিকটে মুহম্মদ আদিল খানের সেনাপতি হিমু ইহাদিগকে যুদ্ধে পরাস্ত করেন (১৫৫৪ খ্রী)। তখন তাজ খান ও সুলেমান বাংলা দেশে পলাইয়া আসেন এবং দশ বৎসর ধরিয়া অনেক জোরজবরদস্তি ও জাল-জুয়াচুরি করার পরে তাঁহারা দক্ষিণ-পূর্ব বিহার ও পশ্চিম বঙ্গের অনেকাংশ অধিকার করেন। ইহার পর তাজ খান তৃতীয় গিয়াসুদ্দীনকে নিহত করিয়া বাংলার অধিপতি হইলেন (১৫৬৪ খ্রী)। কিন্তু ইহার এক বৎসরের মধ্যেই তিনি পরলোকগমন করিলেন এবং তাঁহার ভ্রাতা সুলেমান তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইলেন।
২। সুলেমান কররানী : সুলেমান কররানী অত্যন্ত দক্ষ ও শক্তিশালী শাসনকর্ত্তা ছিলেন। তাঁহার রাজ্যের সীমাও ক্রমশ দক্ষিণে পুরী পর্যন্ত, পশ্চিমে শোন নদ পর্যন্ত পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। সূর বংশের বিভিন্ন শাখা বিধ্বস্ত হইয়া যাওয়ার ফলে আফগানদের মধ্যে সুলেমানের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী এই সময়ে কেহ ছিল না। দিল্লি, অযোধ্যা, গোয়ালিয়র, এলাহাবাদ প্রভৃতি অঞ্চল মোগলদের হাতে পড়ার ফলে হতাবশিষ্ট আফগান নায়কদের অধিকাংশই বাংলাদেশে সুলেমান কররানীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহাদের পাইয়া সুলেমান বিশেষভাবে শক্তিশালী হইলেন। ইহা ভিন্ন তাঁহার সহস্রাধিক উৎকৃষ্ট হস্তী ছিল বলিয়াও তাঁহার সামরিক শক্তি অপরাজেয় হইয়া উঠিয়াছিল।
বাংলা দেশের অধিপতি হইয়া সুলেমান এই রাজ্যে শান্তি স্থাপন করিলেন। ইহার ফলে তাঁহার রাজস্বের পরিমাণ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাইল। সুলেমান ন্যায়বিচারক হিসাবে বিশেষ প্রসিদ্ধি অর্জন করিয়াছিলেন। তিনি মুসলমান আলিম ও দরবেশদের পৃষ্ঠপোষণ করিতেন। এদেশে তিনি শরিয়তের বিধান কার্যকরী করিয়াছিলেন। তিনি নিজে এই বিধান নিষ্ঠার সহিত অনুসরণ করিতেন।
