বিহার ও বাংলা অধিকার করিবার পরে শের খান ১৫৩৯ খ্রীষ্টাব্দে গৌড়ে ফরিদুদ্দীন আবুল মুজাফফর শের শাহ নাম গ্রহণ করিয়া সিংহাসনে আরোহণ করিলেন। প্রায় এক বৎসরকাল গৌড়ে বাস করিয়া এবং বাংলা দেশ শাসনের উপযুক্ত ব্যবস্থা করিয়া শের শাহ হুমায়ুনের সহিত সংঘর্ষে প্রবৃত্ত হইলেন এবং হুমায়ুনকে কনৌজের যুদ্ধে পরাজিত করিয়া (১৫৪০ খ্রীষ্টাব্দ) ভারতবর্ষ ত্যাগ করিতে বাধ্য করিলেন। এই সব যুদ্ধ বাংলার বাহিরে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল বলিয়া এখানে তাহাদের বিবরণ দান নিষ্প্রয়োজন। অতঃপর শের শাহ ভারতবর্ষের সম্রাট হইলেন এবং দিল্লিতে তাঁহার রাজধানী স্থাপিত করিলেন। পাঁচ বৎসর রাজত্ব করিবার পর ১৫৪৫ খ্রীষ্টাব্দে শের শাহ কালিঞ্জর দুর্গ জয়ের সময়ে অগ্নিদগ্ধ হইয়া প্রাণত্যাগ করেন। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে যে সমস্ত ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহাদের অধিকাংশেরই বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। ১৫৪১ খ্রীষ্টাব্দে শের শাহ জানিতে পারেন যে তাঁহারই দ্বারা নিযুক্ত শাসনকর্ত্তা খিজুর খান গৌড়ের শেষ সুলতান গিয়াসুদ্দীন মাহমূদ শাহের এক কন্যাকে বিবাহ করিয়া স্বধীন সুলতানের মত আচরণ করিতেছেন এবং সিংহাসনের তুল্য উচ্চাসনে বসিতেছেন এই সংবাদ পাইয়া শের শাহ ত্বরিতে পঞ্জাব হইতে রওনা হইয়া গৌড়ে চলিয়া আসেন এবং খিজুর খানকে পদচ্যুত করিয়া কাজী ফজীলৎ বা ফজীহৎকে গৌড়ের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করেন।
শের শাহের রাজত্বকালে বাংলা দেশ অনেকগুলি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত হইয়াছিল এবং প্রতি খণ্ডে একজন করিয়া আমীর শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইয়াছিলেন। প্রাদেশিক শাসনকর্ত্তার বিদ্রোহ বন্ধ করিবার জন্যই পন্থা গৃহীত হইয়াছিল। শের শাহ ভারতবর্ষের শাসনপদ্ধতির সংস্কার সাধন করিয়াছিলেন এবং রাজস্ব আদায়ের সুবন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। সমগ্র রাজ্যকে ১১৬০০টি পরগণায় বিভক্ত করিয়া তিনি প্রতিটি পরগণায় পাঁচজন করিয়া কর্মচারী নিযুক্ত করিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য, বাংলা দেশও তাঁহার শাসন-সংস্কারের সুফল ভোগ করিয়াছিল। শের শাহ সিন্ধুনদের তীর হইতে পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁও পর্যন্ত একটি রাজপথ নির্মাণ করান*। [* এই রাজপথের মধ্যের অংশ শের শাহের বহু পূর্ব হইতেই বর্তমান ছিল।] ব্রিটিশ আমলে ঐ রাজপথ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে পরিচিত হয়। তবে ঐ রাজপথের সোনারগাঁও হইতে হাওড়া পর্যন্ত অংশ অনেকদিন পূর্বেই বিলুপ্ত হইয়াছে।
৩
শের শাহের বংশধরগণ
শের শাহের মৃত্যুর পরে তাঁহার পুত্র জলাল খান সূর ইসলাম শাহ নাম গ্রহণ করিয়া সুলতান হন এবং আট বৎসর কাল রাজত্ব করেন (১৫৪৫-৫৩ খ্রীষ্টাব্দ)। কালিদাস গজদানী নমে একজনা বাইস বংশীয় রাজপুত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়া সুলেমান খান নাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইনি ইসলাম শাহের রাজত্বকালে বাংলা দেশে আসেন এবং পূর্ববঙ্গের অংশবিশেষ অধিকার করিয়া সেখানকার স্বাধীন রাজা হইয়া বসেন। ইসলাম খান তাঁহাকে দমন করিবার জন্য তাজ খান ও দরিয়া খান নামে দুইজন সেনানায়ককে প্রেরণ করেন। ইহারা তুমুল যুদ্ধের পরে সুলেমান খানকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই সুলেমান আবার বিদ্রোহ করেন। তখন তাজ খান ও দরিয়া খান আবার সৈন্যবাহিনী লইয়া তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন এবং সুলেমানকে সাক্ষাৎকারে আহ্বান করিয়া বিশ্বাসঘাতকতার সহিত তাঁহাকে হত্যা করেন। অতঃপর সুলেমান খানের দুইটি পুত্রকে তাঁহারা তুরানী বণিকদের কাছে বিক্রয় করিয়া দেন।
অসমীয়া বুরঞ্জীর মতে ইসলাম শাহের রাজত্বকালে সিকন্দর সূরের ভ্রাতা কালাপাহাড় কামরূপ আক্রমণ করেন এবং হাজো ও কামাখ্যার মন্দিরগুলি বিধ্বস্ত করেন।
ইসলাম শাহের মৃত্যুর পরে তাঁহার দ্বাদশবর্ষীয় পুত্র ফিরোজ শাহ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন, কিন্তু মাত্র কয়েকদিন রাজত্ব করার পরেই শের শাহের ভ্রাতুষ্পুত্র মুবারিজ খান কর্ত্তৃক নিহত হন। মুবারিজ খান মুহম্মদ শাহ আদিল নাম গ্রহণ করিয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁহার নিষ্ঠুর আচরণের ফলে আফগান নায়কদের মধ্যে অনেকেই তাঁহার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং আফগানদের মধ্যে আভ্যন্তরীণ কলহ চরমে উঠে; অনেক ক্ষেত্রে তাঁহারা প্রকাশ্য সগ্রামে লিপ্ত হন এবং অনেক প্রাদেশিক শাসনকর্ত্তা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দুর্বল মুহম্মদ শাহ আদিল ইহাদের কোন মতেই দমন করিতে পারিলেন না।
৪
রাজনীতিক গোলযোগ
এই সময়ে (১৫৫৩ খ্রী) বাংলার আফগান শাসনকর্ত্তা ছিলেন মুহম্মদ খান। তিনি এখন স্বাধীনতা ঘোষণা করিলেন এবং শামসুদ্দীন মুহম্মদ শাহ গাজী নাম গ্রহণ করিয়া বাংলার সুলতান হইলেন। অতঃপর তিনি একদিকে আরাকানের উপর হানা দিলেন এবং অপরদিকে জৌনপুর অধিকার করিয়া আগ্রা অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। কিন্তু মুহম্মদ শাহের হিন্দু সেনাপতি হিমু তাঁহাকে ছাপরঘাটের যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করিলেন (১৫৫৫ খ্রী)। এই বিজয়ের পর মুহম্মদ শাহ আদিল শাহবাজ খানকে বাংলার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলেন।
শামসুদ্দীন মুহম্মদ শাহের পুত্র খিজুর খান পিতার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই ঝুসিতে (এলাহাবাদের পরপারে অবস্থিত) গিয়াসুদ্দীন বাহাদুর শাহ নাম গ্রহণ করিয়া নিজেকে সুলতান বলিয়া ঘোষণা করিলেন এবং শাহবাজ খানকে পরাভূত করিয়া এই দেশের অধিপতি হইলেন (১৫৫৬ খ্রী)।
