বাংলার নৌবহরের অধিনায়ককে বলা হইত ‘মীর বহর। বাংলার সৈন্যবাহিনীর শক্তি জোগাইত রণহস্তীগুলি। সে সময়ে বাংলার হস্তীর মত এত ভাল হস্তী ভারতবর্ষের আর কোথাও পাওয়া যাইত না।
সৈন্যেরা তখন নিয়মিত বেতন ও খাদ্য পাইত। সৈন্যবাহিনীর বেতনদাতার উপাধি ছিল আরিজ-ই-লস্কর।
আলোচ্য সময়ের বিচার-পদ্ধতি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। কাজীরা বিভিন্ন স্থানে বিচারের জন্য নিযুক্ত ছিলেন এবং তাঁহারা ঐস্লামিক বিধান অনুসারে বিচার করিতেন, এইটুকুমাত্র জানা যায়। কোন কোন সুলতান স্বয়ং কোন কোন মামলার বিচার করিতেন। অপরাধীদের জন্য যে সব শাস্তির ব্যবস্থা ছিল, তাহাদের মধ্যে প্রধান ছিল বংশদণ্ড দিয়া প্রহার ও নির্বাসন। রাজদ্রোহীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইত। কোন মুসলমান হিন্দুর দেবতার নাম করিলে তাহাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হইত এবং কখনও কখনও বিভিন্ন বাজারে লইয়া গিয়া তাহাকে বেত্রাঘাত করা হইত। সুলতানদের “বন্দিঘর”-ও ছিল, কখনও কখনও হিন্দু জমিদারদিগকে সেখানে আটক করা হইত।
স্বাধীন সুলতানদের আমলে শুধু মুসলমানরা নহে, হিন্দুরাও শাসনকার্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করিতেন। এমন কি, তাঁহারা বহু মুসলমান কর্মচারীর উপরে ‘ওয়ালি’ (প্রধান তত্ত্বাবধায়ক)-ও নিযুক্ত হইতেন। বাংলার সুলতানের মন্ত্রী, সেক্রেটারী, এমনকি সেনাপতির পদেও বহু হিন্দু নিযুক্ত হইয়াছিলেন।
০৮. হুমায়ুন ও আফগান রাজত্ব
অষ্টম পরিচ্ছেদ – হুমায়ুন ও আফগান রাজত্ব
১
হুমায়ুন
গৌড়ে প্রবেশের পর হুমায়ুন এই বিধ্বস্ত নগরীর সংস্কারসাধনে ব্রতী হন। তিনি ইহার রাস্তাঘাট, প্রাসাদ ও দেওয়ালগুলি মেরামত করিয়া এখানেই কয়েকমাস অবস্থান করেন। গৌড় নগরীর সৌন্দর্য এবং এখানকার জলহাওয়ার উৎকর্ষ দেখিয়া হুমায়ুন মুগ্ধ হইলেন। বাংলার রাজধানীর “গৌড়” নামের অর্থ ও ঐতিহ্য সম্বন্ধে হুমায়ুন অবহিত ছিলেন না। তিনি ভাবিলেন যে ঐ শহরের নাম “গোর” (অর্থাৎ ‘কবর’)। এইজন্য তিনি “গৌড়” নগরীর নাম পরিবর্তন করিয়া জন্নতাবাদ’ (স্বর্গীয় নগর) রাখিলেন। অবশ্য এ নাম বিশেষ চলিয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। অতঃপর হুমায়ুন বাংলা দেশের বিভিন্ন অংশ তাঁহার কর্মচারীদের জায়গীর দান করিয়া এবং বিভিন্ন স্থানে সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করিয়া বিলাসব্যসনে মগ্ন হইলেন।
কিন্তু ইহার অল্পকাল পরেই আফগাননায়ক শের খান সূর দক্ষিণ বিহার অধিকার করিয়া লইলেন এবং কাশী হইতে বহরাইচ পর্যন্ত যাবতীয় মোগল অধিকারভুক্ত অঞ্চলে বারবার হানা দিতে লাগিলেন। তাঁহার অশ্বারোহী সৈন্যরা গৌড় নগরীর আশপাশের উপরেও হানা দিতে লাগিল এবং ঐ নগরীর খাদ্য সরবরাহ-ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করিতে লাগিল। ইয়াকুব বেগের অধীন ৫০০০ মোগল অশ্বারোহী সৈন্যের বাহিনীকে তাহারা পরাস্ত করিল, কিন্তু শেখ বায়াজিদ তাহাদিগকে বিতাড়িত করিলেন। হুমায়ুনের সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের আর্দ্র জলবায়ু এবং ভোগবিলাসের ফলে ক্রমশ অকর্মণ্য হইয়া পড়িতে লাগিল। এদিকে হুমায়ুনের ভ্রাতা মির্জা হিন্দাল আগ্রায় বিদ্রোহ করিলেন। হুমায়ুনের অপর ভ্রাতা আসকারি হুমায়ুনের কাছে ক্রমাগত বাংলার মসলিন, খোঁজা এবং হাতি চাহিয়া চাহিয়া বিরক্ত করিতে লাগিলেন এবং আসকারির অধীন কর্মচারী ও সেনানায়কেরা বর্ধিত বেতন, উচ্চতর পদ এবং নগদ অর্থ প্রভৃতির দাবি জানাইতে লাগিলেন। হুমায়ুনের অমাত্য ও সেনানায়কেরাও খুবই দুর্বিনীত হইয়া উঠিয়াছিলেন। ইহাদের অন্যতম জাহিদ বেগকে যখন হুমায়ুন বাংলার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিলেন, তখন জাহিদ বেগ তাহা প্রত্যাখ্যান করেন।
শেষপর্যন্ত হুমায়ুন জাহাঙ্গীর কুলী বেগকে বাংলার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করিলেন এবং স্বয়ং গৌড় ত্যাগ করিলেন। মুঙ্গেরে তিনি আসকারির অধীনস্থ বাহিনীর সহিত মিলিত হইলেন এবং গঙ্গার তীর ধরিয়া মুঙ্গেরে গেলেন। চৌসায় হুমায়ুনের সহিত শের খানের যে যুদ্ধ হইল, তাহাতে হুমায়ুন পরাজিত হইলেন এবং কোন রকমে প্রাণ বাঁচাইয়া পলায়ন করিলেন (১৫৩৯ খ্রীষ্টাব্দ)।
২
শের শাহ
হুমায়ুনের সহিত যুদ্ধে সাফল্য লাভ করিবার পর আফগান বীর শের খান সূর বাংলার দিকে রওনা হইলেন এবং অবিলম্বেই গৌড় পুনরধিকার করিলেন। হুমায়ুন কর্ত্তৃক নিযুক্ত গৌড়ের শাসনকর্ত্তা জাহাঙ্গীর কুলী বেগ শের খানের পুত্র জলাল খান এবং হাজী খান বটনী কর্ত্তৃক পরাজিত ও নিহত হইলেন (অক্টোবর, ১৫৩৯ খ্রী)। বাংলা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে মোতায়েন মোগল সৈন্যদেরও শের খানের সৈন্যেরা পরাজিত করিল এবং ঐ সমস্ত অঞ্চল অধিকার করিল। চট্টগ্রাম অঞ্চল তখনও গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ শাহের কর্মচারীদের হাতে ছিল এবং ইহাদের মধ্যে দুইজন-খোদা বখশ খান ও হামজা খান (পর্তুগীজ বিবরণে কোদাবস্কাম এবং আমরু-আঁকাও নামে উল্লিখিত) চট্টগ্রামে অধিকার লইয়া বিবাদ করিতেছিলেন। ইহাদের বিবাদের সুযোগ লইয়া “নোগাজিল” (?) নামে শের খানের একজন সহকারী চট্টগ্রাম অধিকার করিলেন, কিন্তু পর্তুগীজ কুঠির অধ্যক্ষ নুনো ফার্নান্দেজ ফ্রীয়ার তাঁহাকে বন্দী করিলেন। “নোগাজিল” কোনক্রমে মুক্তিলাভ করিয়া পলায়ন করিলেন। চট্টগ্রাম তথা ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল আর কখনও শের খানের অধিকারভুক্ত হয় নাই। ইহার কিছুদিন পর আরাকানরাজ চট্টগ্রাম অধিকার করেন এবং ১৬৬৬ খ্রী পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানরাজের অধীনেই থাকে।
