সুলতানের অমাত্য, সভাসদ ও অন্যান্য অভিজাত রাজপুরুষগণ আমীর মালিক প্রভৃতি অভিধায় ভূষিত হইতেন। ইঁহাদের ক্ষমতা নিতান্ত অল্প ছিল না, বহুবার ইহাদের ইচ্ছায় বিভিন্ন সুলতানের সিংহাসনলাভ ও সিংহাসনচ্যুতি ঘটিয়াছে। কোন সুলতানের মৃত্যুর পর তাঁহার ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারীর সিংহাসনে আরোহণের সময়ে আমীর, মালিক ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন আবশ্যক হইত।
রাজ্যের বিশিষ্ট পদাধিকারিগণ উজীর’ আখ্যা লাভ করিতেন। উজীর’ বলিতে সাধারণত মন্ত্রী বুঝায়, কিন্তু আলোচ্য সময়ে অনেক সেনানায়ক এবং আঞ্চলিক শাসনকর্ত্তাও ‘উজীর’ আখ্যা লাভ করিয়াছেন দেখিতে পাওয়া যায়। যুদ্ধবিগ্রহের সময়ে বাংলার সীমান্ত অঞ্চলে সামরিক শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করা হইত; তাঁহাদের উপাধি ছিল লস্কর-উজীর,; কখনও কখনও তাহারা শুধুমাত্র ‘লস্কর’ নামেও অভিহিত হইতেন। সুলতানের প্রধান মন্ত্রীরা (অন্তত কেহ কেহ) ‘খান-ই-জহান’ উপাধি লাভ করিতেন। প্রধান আমীরকে বলা হইত ‘আমীর-উল-উমারা’।
সুলতানের মন্ত্রী, অমাত্য ও পদস্থ কর্মচারিগণ খান মজলিস’, ‘মজলিস-অল আলা’, ‘মজলিস-আজম’, ‘মজলিস-অল-মুআজ্জম’, মজলিস-অল-মজালিস’, মজলিস-বারবক’ প্রভৃতি উপাধি লাভ করিতেন।
সুলতানের সচিব (সেক্রেটারী)-দের বলা হইত ‘দবীর। প্রধান সেক্রেটারীকে ‘দবীর খাস’ (দবীর-ই-খাস) বলা হইত।
‘বঙ্গালহ্’ রাজ্য আলোচ্য সময়ে কতকগুলি ‘ইকলিম’-এ বিভক্ত ছিল।
প্রতিটি ইকলিম’-এর আবার কতকগুলি উপবিভাগ ছিল, ইহাদের বলা হইত ‘অসহ’। সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে রাজ্যের উপবিভাগগুলিকে ‘মুলুক’ এবং তাহাদের শাসনকর্ত্তাদিগকে ‘মুলুক-পতি’ ও ‘অধিকারী’ বলা হইয়াছে। মুলুক’ ও ‘অসহ্’ সম্ভবত একার্থক, কিংবা হয়ত ‘অসহ্’র উপবিভাগের নাম ছিল মুলুক’ (মুল)। কোন কোন প্রাচীন বাংলা গ্রন্থে (যেমন, বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গলে)মুলুক এর একটি উপবিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁহার নাম তকসিম।
আলোচ্য যুগে দুর্গহীন শহরকে বলা হইত কাহ্’ এবং দুর্গযুক্ত শহরকে বলা হইত ‘খিটাহ’। সীমান্তরক্ষার ঘটিকে বলা হইত ‘থানা’। বঙ্গালহ্’ রাজ্যটি অনেকগুলি রাজস্ব-অঞ্চলে বিভক্ত ছিল; এই অঞ্চলগুলিকে ‘মহল’ বলা হইত; কয়েকটি মহল’ লইয়া এক একটি ‘শিক’ গঠিত হইত; ‘শিকদার’ নামক কর্মচারীরা ইহাদের ভারপ্রাপ্ত হইতেন। রাজস্ব দুই ধরণের হইত-গনীমাহ্’ অর্থাৎ লুণ্ঠনলব্ধ অর্থ এবং খরজ’ অর্থাৎ খাজনা। সাধারণত যুদ্ধবিগ্রহের সময়ে সৈন্যেরা লুঠ করিয়া যে অর্থ সংগ্রহ করিত, তাঁহার চারি-পঞ্চমাংশ সৈন্যবাহিনীর মধ্যে বণ্টিত হইত এবং এক-পঞ্চমাংশ রাজকোষে যাইত, ইহাই ‘গনীমাহ্। খরজ’ এক বিচিত্র পদ্ধতিতে সংগৃহীত হইত। সুলতান বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির উপর ঐ অঞ্চলের খরজ’ সংগ্রহের ভার দিতেন-যেমন হোসেন শাহ দিয়াছিলেন হিরণ্য ও গোবর্ধন মজুমদারকে। ইঁহারা সপ্তগ্রাম মুলুকের জন্য বিশ লক্ষ টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করিয়া হোসেন শাহকে বার লক্ষ টাকা দিতেন এবং বাকী আট লক্ষ টাকা নিজেদের আইনসঙ্গত প্রাপ্য হিসাবে গ্রহণ করিতেন। সুলতানের প্রাপ্য অর্থ লইয়া যাইবার জন্য রাজধানী হইতে যে কর্মচারীরা আসিত, তাহাদের ‘আরিন্দা বলা হইত। সুলতানের রাজস্ব বিভাগের প্রধান কর্মচারীর উপাধি ছিল ‘সর-ই গুমাশতাহ’; জলপথে যে সব জিনিস আসিত, সুলতানের কর্মচারীরা তাহাদের উপর শুল্ক আদায় করিতেন, যে সব ঘাটে এই শুল্ক আদায় করা হইত, তাহাদের বলা হইত কুতঘাট’। বিভিন্ন শহরে ও নদীর ঘাটে সুলতানের বহু কর্মচারী রাজস্ব আদায়ের জন্য নিযুক্ত ছিল। সে যুগে হাটকর’, ‘ঘাটকর’, ‘পথকর’ প্রভৃতি করও ছিল বলিয়া মনে হয়। অনেক জিনিস অবাধে বাহির হইতে বাংলায় লইয়া আসা বা বাংলা হইতে বাহিরে লইয়া যাওয়া যাইত না, যেমন চন্দন। আলোচ্য সময়ে বাংলায় অমুসলমানদের নিকট হইতে ‘জিজিয়া কর আদায় করা হইত বলিয়া কোন প্রমাণ মিলে না।
রাজ্যের সৈন্যবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন সুলতান স্বয়ং। বিভিন্ন অভিযানের সময়ে যে সব বাহিনী প্রেরিত হইত, তাহাদের অধিনায়কদিগকে ‘সর-ই-লস্কর’ বলা হইত।
সৈন্যবাহিনী চারি ভাগে বিভক্ত ছিল–অশ্বারোহী বাহিনী, গজারোহী বাহিনী, পদাতিক বাহিনী এবং নৌবহর। বাংলার পদাতিক সৈন্যদের বিশিষ্ট নাম ছিল ‘পাইক’, ইহারা সাধারণত স্থানীয় লোক হইত এবং খুব ভাল যুদ্ধ করিত।
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বাংলার সৈন্যেরা প্রধানত তীর-ধনুক দিয়াই যুদ্ধ করিত। ইহা ভিন্ন তাহারা বর্শা, বল্লম ও শূল প্রভৃতি অস্ত্রও ব্যবহার করিত। শর ও শূল ক্ষেপণের যন্ত্রের নাম ছিল যথাক্রমে “আরাদা” ও “মালিক”। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিক হইতে বাংলার সৈন্যেরা কামান চালনা করিতে শিখে এবং ১৫২৯ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যেই কামান-চালনায় দক্ষতার জন্য দেশবিদেশে খ্যাতি অর্জন করে।
বাংলার সৈন্যবাহিনীতে দশ জন অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া এক একটি দল গঠিত হইত। তাহাদের নায়কের উপাধি ছিল ‘সর-ই-খেল। বুঘরা খান তাঁহার পুত্র কায়কোবাদকে বলিয়াছিলেন, প্রত্যেক খানের অধীনে দশজন মালিক, প্রত্যেক মালিকের অধীনে দশজন আমীর, প্রত্যেক আমীরের অধীনে দশজন সিপাহ্-সলার, প্রত্যেক সিপাহ্-সলারের অধীনে দশজন সর-ই-খেল এবং প্রত্যেক সর-ই-খেলের অধীনে দশজন অশ্বারোহী সৈন্য থাকিবে। এই নীতি ঠিকমত পালিত হইত কিনা, তাহা বলিতে পারা যায় না।
