পর্তুগীজরা ঘাঁটি স্থাপনের পর দলে দলে পর্তুগীজ বাংলায় আসিতে লাগিল। কিন্তু কাম্বের সহিত পর্তুগীজদের যুদ্ধ বাধায় পর্তুগীজ গভর্নর আফসো-দে মেলোকে ফেরৎ চাহিলেন এবং মাহমূদকে বলিলেন যে এখন তিনি বাংলায় সাহায্য পাঠাইতে পারিতেছেন না, পরের বৎসর পাঠাইবেন। মাহমূদ পাঁচজন পর্তুগীজকে সাহায্যদানের প্রতিশ্রুতির জামিন স্বরূপ রাখিয়া দে-মেলো সমেত অন্যান্যদের ছাড়িয়া দিলেন। ইহার ঠিক পরেই শের শাহ আবার গৌড় আক্রমণ ও অধিকার করেন। পর্তুগীজ গভর্নর পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাহমূদকে সাহায্য করিবার জন্য ৯ জাহাজ সৈন্য পাঠাইয়াছিলেন। কিন্তু এই নয়টি জাহাজ যখন চট্টগ্রামে পৌঁছিল, তাঁহার পূর্বেই মাহমূদ শের খানের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইয়া পরলোকগমন করিয়াছেন।
গিয়াসুদ্দীন মাহমূদ শাহ নিষ্ঠুরভাবে নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রকে বধ করিয়া সুলতান হইয়াছিলেন। তিনি যে অত্যন্ত নির্বোধও ছিলেন, তাহা তাঁহার সমস্ত কার্যকলাপ হইতে বুঝিতে পারা যায়। ইহা ভিন্ন তিনি যৎপরোনাস্তি ইন্দ্রিয়পরায়ণও ছিলেন; সমসাময়িক পর্তুগীজ বণিকদের মতে তাঁহার ১০,০০০ উপপত্নী ছিল।
মাহমূদ শাহের কর্মচারীদের মধ্যে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। বিখ্যাত পদকর্ত্তা কবিশেখর-বিদ্যাপতি যে মাহমূদ শাহের কর্মচারী ছিলেন, তাহা ‘বিদ্যাপতি’ নামাঙ্কিত একটি পদের ভণিতা হইতে অনুমিত হয়।
০৭. বাংলার মুসলিম রাজত্বের প্রথম যুগের রাজ্যশাসনব্যবস্থা (১২০৪-১৫৩৮ খ্রী)
সপ্তম পরিচ্ছেদ – বাংলার মুসলিম রাজত্বের প্রথম যুগের রাজ্যশাসনব্যবস্থা (১২০৪-১৫৩৮ খ্রী)
১২০৪ খ্রীষ্টাব্দে মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী বাংলা দেশে প্রথম মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময় হইতে ১২২৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা কার্যত স্বাধীন থাকে, যদিও বখতিয়ার ও তাঁহার কোন কোন উত্তরাধিকারী দিল্লির সুলতানের নামমাত্র অধীনতা স্বীকার করিয়াছিলেন। এই সময়কার শাসনব্যবস্থা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। এইটুকু মাত্র জানা যায় যে, বাংলার এই মুসলিম রাজ্যের দ উল্-মুলক (রাজধানী) ছিল কখনও লখনৌতি, কখনও দেবকোট এবং এই রাজ্য কতকগুলি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। এই অঞ্চলগুলিকে ‘ইক্তা’ বলা হইত এবং এক একজন আমীর এক একটি ইক্তা’র ‘মোক্তা অর্থাৎ শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইতেন। রাজ্যটি লখনৌতি’ নামে পরিচিত ছিল। এই সময়ের মধ্যে বোধ হয়। আলী মর্দানই প্রথম নিজেকে সুলতান বলিয়া ঘোষণা করেন এবং নিজের নামে খুত্ব পাঠ করান। তাঁহার পরবর্তী সুলতান গিয়াসুদ্দীন ইউয়জ শাহ মুদ্রাও উৎকীর্ণ করাইয়াছিলেন। তাঁহার মুদ্রা পাওয়া গিয়াছে। সে সব-মুদ্রায় সুলতানের নামের সঙ্গে বাগদাদের খলিফার নামও উত্তীর্ণ আছে।
১২২৭ হইতে ১২৮৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত লখনৌতি রাজ্য মোটামুটিভাবে দিল্লির সুলতানের অধীন ছিল, যদিও মাঝে মাঝে কোন কোন শাসনকর্ত্তা স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াছিলেন। এই সময়ে সমগ্র লখনৌতি রাজ্যই দিল্লির অধীনে একটি ‘ইক্তা’ বলিয়া গণ্য হইত।
বলবন তুঘিল খাঁর বিদ্রোহ দমন করিয়া তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র বুঘরা খানকে বাংলার শাসনকর্ত্তার পদে অধিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। (১২৮০ খ্রী)। ১২৮৫ খ্রীষ্টাব্দে বলবনের মৃত্যুর পর বুঘরা খান স্বাধীন হন। লখনৌতি রাজ্যের এই স্বাধীনতা ১৩২২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। এই সময়ে সমগ্র লখনৌতি রাজ্যকে ‘ইকলিম লখনৌতি’ বলা হইত এবং উহা অনেকগুলি ‘ইক্তা’য় বিভক্ত ছিল। পূর্ববঙ্গের যে অংশ এই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাহাকে ‘অহ্ বঙ্গালহ্’ বলা হইত। এই সময়ে কোন কোন আঞ্চলিক শাসনকর্ত্তা অত্যন্ত ক্ষমতাবান হইয়া উঠিয়াছিলেন।
১৩২২ খ্রীষ্টাব্দে মুহম্মদ তুগলক বাংলা দেশ অধিকার করিয়া উহাকে লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও-এই তিনটি ইক্তায় বিভক্ত করেন।
১৩৩৮ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার দ্বিশতবর্ষব্যাপী স্বাধীনতা সুরু হয় এবং ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার অবসান ঘটে। সমসাময়িক সাহিত্য, শিলালিপি ও মুদ্রা হইতে এই সময়ের শাসনব্যবস্থা সম্বন্ধে কিছু কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
এই সময় হইতে বাংলার মুসলিম রাজ্য ‘লখনৌতি’র পরিবর্তে ‘বঙ্গালহ্’ নামে অভিহিত হইতে সুরু করে। এই রাজ্যের সুলতানরা ছিলেন স্বাধীন এবং সর্বশক্তিমান। প্রথম দিকে বাঁহারা খলিফার আনুষ্ঠানিক আনুগত্য স্বীকার করিতেন; জলালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ কিন্তু নিজেকেই ‘খলীফৎ আল্লাহ্’ (আল্লার খলিফা) বলিয়া ঘোষণা করেন এবং তাঁহার পরবর্তী কয়েকজন সুলতান এ ব্যাপারে তাহাকে অনুসরণ করেন।
সুলতান বাস করিতেন বিরাট রাজপ্রাসাদে। সেখানেই প্রশস্ত দরবার-কক্ষে তাঁহার সভা অনুষ্ঠিত হইত। শীতকালে কখনও কখনও উন্মুক্ত অঙ্গনে সুলতানের সভা বসিত। সভায় সুলতানের পাত্রমিত্রসভাসদরা উপস্থিত থাকিতেন। চীনা বিবরণী শিং-ছা-শ্যং-লান’ এবং কৃত্তিবাসের আত্মকাহিনীতে বাংলার সুলতানের সভার মনোরম বর্ণনা পাওয়া যায়।
সুলতানের প্রাসাদে সুলতানের হাজিব’, ‘সিলাহ্দার’, শরাবদার’, ‘জমাদার, ‘দরবান’ প্রভৃতি কর্মচারীরা থাকিতেন। হাজিব’রা সভার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত ছিলেন; “সিলাদার’রা সুলতানের বর্ম্ম বহন করিতেন; শরাবদার’রা সুলতানের সুরাপানের ব্যবস্থা করিতেন; জমাদার’রা ছিলেন তাঁহার পোশাকের তত্ত্বাবধায়ক এবং ‘দরবান’রা প্রাসাদের ফটকে পাহারা দিত। ইহা ভিন্ন সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে ছত্রী’ উপাধিধারী এক শ্রেণীর রাজকর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়; ইঁহারা সম্ভবত সভায় যাওয়ার সময় সুলতানের ছত্র ধারণ করিতেন; মালাধর বসু (গুণরাজ খান), কেশব বসু (কেশব খান) প্রভৃতি হিন্দুরা বিভিন্ন সময়ে ছত্রীর পদ অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন। সুলতানের চিকিৎসক সাধারণত বৈদ্য-জাতীয় হিন্দু হইতেন; তাঁহার উপাধি হইত ‘অন্তরঙ্গ। কয়েকজন সুলতানের হিন্দু সভাপণ্ডিতও ছিল। সুলতানের প্রাসাদে অনেক ক্রীতদাস থাকিত। ইহারা সাধারণত খোঁজা অর্থাৎ নপুংসক হইত।
