নসরৎ শাহের রাজত্বকালে বাংলার সৈন্যবাহিনী আসামে যে অভিযান শুরু করিয়াছিল, মাহমূদ শাহের রাজত্বকালে তাহা ব্যর্থতার মধ্য দিয়া সমাপ্ত হয়। ফিরোজ শাহের রাজত্বকালে বাংলার বাহিনী অসমীয়া বাহিনীকে পরাস্ত করিয়া সালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য করিয়াছিল। অসমীয়া বুরঞ্জী হইতে জানা যায়, ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার মুসলমানরা জল ও স্থলে তিন দিন তিন রাত্রি অবিরাম আক্রমণ চালাইয়াও সালা দুর্গ অধিকার করিতে পারে নাই। ইহার পর অসমীয়া বাহিনী বুরাই নদীর মোহনায় মুসলমান নৌবাহিনীকে যুদ্ধে পরাস্ত করে। মুসলমানরা আর একবার সালা জয় করিবার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হয়। ইহার পর তাহারা দুইমুনিশিলার যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়; তাহাদের ২০টি জাহাজ অসমীয়ারা জয় করে এবং মুসলমানদের অন্যতম সেনাপতি ও ২৫০০ সৈন্য নিহত হয়।
ইহার পর হোসেন খানের নেতৃত্বে একদল নূতন শক্তিশালী সৈন্য যুদ্ধে যোগ দেয়। ইহাতে মুসলমানরা উৎসাহিত হইয়া অনেকদূর অগ্রসর হয়। কিছুদিন পরে ডিকরাই নদীর মোহনায় দুই পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ হইল। এই যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হইল; তাহাদের মধ্যে অনেকে নিহত হইল; অনেকে শত্রুদের হাতে ধরা পড়িল। ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে হোসেন খান অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া ভরালি নদীর কাছে অসমীয়া বাহিনীকে দুঃসাহসিকভাবে আক্রমণ করিতে গিয়া নিহত হইলেন, তাঁহার বাহিনীও ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল।
আসাম-অভিযানে ব্যর্থতার পরে মুসলমানরা পূর্বদিক হইতে অসমীয়াদের এবং পশ্চিম দিক হইতে কোচদের চাপ সহ্য করিতে না পারিয়া কামরূপও ত্যাগ করিতে বাধ্য হইল।
গিয়াসুদ্দীন মাহমূদ শাহের রাজত্বকালেই পর্তুগীজরা বাংলা দেশে প্রথম বাণিজ্যের ঘাঁটি স্থাপন করে। পর্তুগীজ বিবরণগুলি হইতে জানা যায় যে, ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে গোঁয়ার পর্তুগীজ গভর্নর নুনো-দা-কুনহা খাজা শিহাবুদ্দীনকে সাহায্য করিবার ও বাংলায় বাণিজ্য আরম্ভ করিবার জন্য মারতিম-আফসো-দে-মেলোকে পাঠান। পাঁচটি জাহাজ ও ২০০ লোক লইয়া চট্টগ্রামে পৌঁছিয়া দে-মেলো বাংলার সুলতানকে ১২০০ পাউণ্ড মূল্যের উপহার পাঠান। সদ্য ভ্রাতুষ্পুত্ৰ-হত্যাকারী মাহমূদ শাহের মন তখন খুব খারাপ। পর্তুগীজদের উপহারের মধ্যে মুসলমানদের জাহাজ হইতে লুট করা কয়েক বাক্স গোলাপ জল আছে আবিষ্কার করিয়া তিনি পর্তুগীজদের বধ করিতে মনস্থ করেন; কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি পর্তুগীজ দূতদের বধ করিয়া বন্দী করেন। অন্যান্য পর্তুগীজদের বন্দী করিবার জন্য তিনি চট্টগ্রামে একজন লোক পাঠান। এই লোকটি চট্টগ্রামে আসিয়া আফলো-দে-মেলো ও তাঁহার অনুচরদের নৈশভোজে নিমন্ত্রণ করিল। ভোজসভায় একদল সশস্ত্র মুসলমান পর্তুগীজদের আক্রমণ করিল। দে-মেলো বন্দী হইলেন। তাঁহার ৪০ জন অনুচরের অনেকে যুদ্ধ করিয়া নিহত হইলেন, অন্যেরা বন্দী হইলেন; যাঁহারা নিমন্ত্রণে আসেন নাই, তাহারা সমুদ্রতীরে শূকর শিকার করিতেছিলেন। অতর্কিতভাবে আক্রান্ত হইয়া তাঁহাদের কেহ নিহত, কেহ বন্দী হইলেন। পর্তুগীজদের এক লক্ষ পাউণ্ড মুল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিয়া হতাবশিষ্ট ত্রিশজন পর্তুগীজকে লইয়া মুসলমানরা প্রথমে অন্ধকূপের মত ঘরে বিনা চিকিৎসায় আটক করিয়া রাখিল, তাঁহার পর সারারাত্রি হাঁটাইয়া মাওয়া নামক স্থানে লইয়া গেল এবং তাঁহার পর তাহাদের গৌড়ে লইয়া গিয়া পশুর মত ব্যবহার করিয়া নরক-তুল্য স্থানে আটক করিয়া রাখিল।
পর্তুগীজ গর্ভনর এই কথা শুনিয়া ক্রুদ্ধ হইলেন। তাঁহার দূত আন্তোনিও-দে সিভা-মেনেজেস ৯টি জাহাজ ও ৩৫০ জন লোক লইয়া চট্টগ্রামে আসিয়া মাহমূদ শাহের কাছে দূত পাঠাইয়া বন্দী পর্তুগীজদের মুক্তি দিতে বলিলেন; না দিলে যুদ্ধ করিবেন বলিয়াও জানাইলেন; মাহমূদ ইহার উত্তরে গোঁয়ার গভর্নরকে ছুতার, মণিকার ও অন্যান্য মিস্ত্রী পাঠাইতে অনুরোধ জানাইলেন, বন্দীদের মুক্তি দিলেন না। মেনেজেসের দূতের গৌড় হইতে চট্টগ্রামে ফিরিতে মাসাধিককাল দেরী হইল; ইহাতে অধৈর্য হইয়া মেনেজেস চট্টগ্রামের এক বৃহৎ অঞ্চলে আগুন লাগাইলেন এবং বহু লোককে বন্দী ও বধ করিলেন। তখন মাহমূদ মেনেজেসের দূতকে বন্দী করিতে আদেশ দিলেন, কিন্তু দূত ততক্ষণে মেনেজেসের কাছে পৌঁছিয়া গিয়াছে।
ঠিক এই সময়ে শের খান সূর বাংলা আক্রমণ করেন। তাঁহার ফলে মাহমুদ শাহ গৌড়ের পর্তুগীজ বন্দীদের বধ না করিয়া তাহাদের কাছে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা সম্বন্ধে পরামর্শ চাহিলেন। ইতিমধ্যে দিয়াগো-রেবেলো নামে একজন পর্তুগীজ নায়ক তিনটি জাহাজসহ গোয়া হইতে সপ্তগ্রামে আসিয়া মাহমূদ শাহকে বলিয়া পাঠাইলেন যে পর্তুগীজ বন্দীদের মুক্তি না দিলে তিনি সপ্তগ্রামে ধ্বংসকাণ্ড বাধাইবেন। মাহমূদ তখন অন্য মানুষ। তিনি পর্তুগীজ দূতকে খাতির করিলেন এবং রেবেলোকে খাতির করিবার জন্য সপ্তগ্রামের শাসনকর্ত্তাকে বলিয়া পাঠাইলেন। গোঁয়ার গভর্নরের কাছে দূত পাঠাইয়া তিনি শের খানের বিরুদ্ধে সাহায্য চাহিলেন এবং তাঁহার বিনিময়ে বাংলায় পর্তুগীজদের কুঠি ও দুর্গ নির্মাণ করিতে দিতে প্রতিশ্রুত হইলেন। রেবেলোর কাছে তিনি ২১ জন পর্তুগীজ বন্দীকে ফেরৎ পাঠাইলেন এবং আফন্সে-দে-মেলোর পরামর্শ প্রয়োজন বলিয়া তাঁহাকে রাখিয়া দিলেন। মাহমূদ ও দে-মেলো উভয়ের নিকট হইতে পত্র পাইয়া পর্তুগীজ গভর্নর মাহমূদকে সাহায্য পাঠাইয়া দিলেন। শের খানের বিরুদ্ধে জোআঁ দে ভিল্লাললাবোস ও জোআঁ কোরীআর নেতৃত্বে দুই জাহাজ পর্তুগীজ সৈন্য যুদ্ধ করিল, তাহারা শের খানকে “গরিজ” (‘গড়ি’ অর্থাৎ তেলিয়াগড়ি) দুর্গ ও “ফারানডুজ” (পাণ্ডুয়া?) শহর অধিকার করিতে দিল না। শের খানের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইলেও মাহমূদ পর্তুগীজদের বীরত্ব দেখিয়া খুশী হইলেন। আফসো-দে-মেলোকে তিনি বিস্তর পুরস্কার দিলেন। তাঁহার নিকট হইতে পর্তুগীজরা অনেক জমি ও বাড়ী পাইল এবং কুঠি ও শুল্কগৃহ নির্মাণের অনুমতি পাইল। চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রামে তাহারা দুইটি শুল্কগৃহ স্থাপন করিল। চট্টগ্রামেরটি বড় শুল্কগৃহ, অপরটি ছোট। পর্তুগীজরা স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান অধিবাসীদের কাছে খাজনা আদায়ের অধিকার এবং আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা লাভ করিল। সুলতান পর্তুগীজদের এত সুবিধা ও ক্ষমতা দিতেছেন দেখিয়া সকলেই আশ্চর্য হইল। বলা বাহুল্য ইহার ফল ভাল হয় নাই। কারণ বাংলা দেশে এইরূপ শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করিবার পরেই পর্তুগীজরা বাংলার নদীপথে ভয়াবহ অত্যাচার করিতে সুরু করে।
