৪
গিয়াসুদ্দীন মাহমূদ শাহ
‘রিয়াজ’-এর মতে গিয়াসুদ্দীন মাহমূদ শাহ নসরৎ শাহের কাছে ‘আমীর’ উপাধি লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু মাহমূদ শাহ সম্ভবত নসরৎ শাহের রাজত্বকালে বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছিলেন–মুদ্রার সাক্ষ্য হইতে এই কথা মনে হয়। গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ শাহের পূর্ব নাম আবদুল বদ্। তিনি আব্দ্ শাহ ও বদর শাহ নামেও পরিচিত ছিলেন।
গিয়াসুদ্দীন মাহমূদ শাহ শের শাহ ও হুমায়ুনের সমসাময়িক। তাঁহাদের সহিত মাহমুদ শাহের ভাগ্য পরিণামে এক সূত্রে জড়িত হইয়া পড়িয়াছিল। প্রামাণিক ইতিহাসগ্রন্থগুলি হইতে এ সম্বন্ধে যাহা জানা যায়, তাঁহার সারমর্ম নিম্নে প্রদত্ত হইল।
গিয়াসুদ্দীন মাহমূদ শাহ বিহার প্রদেশ আফগানদের নিকট হইতে জয় করিবার পরিকল্পনা করেন এবং এই উদ্দেশ্যে কুত্ত্ব খান নামে একজন সেনাপতিকে প্রেরণ করেন। শের খান সূর ইহার বিরুদ্ধে প্রথমে ব্যর্থ প্রতিবাদ জানান, তারপর অন্যান্য আফগানদের সঙ্গে মিলিয়া কুত্ত্ব খানের সহিত যুদ্ধ করিয়া তাঁহাকে বধ করেন। বাংলার সুলতানের অধীনস্থ হাজীপুরের সরলস্কর মখদূম-ই-আলম (মাহমূদ শাহের ভগ্নীপতি) মাহমূদ শাহ্ ভ্রাতুষ্পুত্রকে হত্যা করিয়া সুলতান হওয়ার জন্য তাঁহার বিরুদ্ধে ত্রিহুতে বিদ্রোহ করিয়াছিলেন; মখদূম-ই-আলম ছিলেন শের খানের বন্ধু। তিনি কুত্ত্ব খানকে সাহায্য করেন নাই, এই অপরাধে মাহমূদ শাহ তাঁহার বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী পাঠাইলেন। এইসময়ে শের খান বিহারের অধিপতি নাবালক জলাল খান লোহানীর অমাত্য ও অভিভাবক ছিলেন। শের খানের কাছে নিজের ধনসম্পত্তি জিম্মা রাখিয়া মখদূম-ই-আলম মাহমূদ শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে গেলেন, এই যুদ্ধে তিনি নিহত হইলেন।
এদিকে জলাল খান লোহানী শের খানের অভিভাবকত্ব সহ্য করিতে না পারিয়া মাহমূদের কাছে গিয়া তাঁহার অধীনতা স্বীকার করিলেন এবং তাহাকে অনুরোধ জানাইলেন শের খানকে দমন করিতে। মাহমূদ জলাল খানের সহিত কুত্ত্ব খানের পুত্র ইব্রাহিম খানকে বহু সৈন্য, হাতি ও কামান সঙ্গে দিয়া শের খানের বিরুদ্ধে পাঠাইলেন। শের খানও সসৈন্যে অগ্রসর হইলেন। পূর্ব বিহারের সূরজগড়ে দুই পক্ষের সৈন্য পরস্পরের সম্মুখীন হইল। শের খান চারিদিকে মাটির প্রাকার তৈরী করিয়া ছাউনী ফেলিলেন; ঐ ছাউনী ঘিরিয়া ফেলিয়া ইব্রাহিম খান তোপ বসাইলেন এবং মাহমূদ শাহকে নূতন সৈন্য পাঠাইতে অনুরোধ জানাইলেন। প্রাকারের মধ্য হইতে কিছুক্ষণ যুদ্ধ করিয়া শের খান ইব্রাহিমকে দূত মারফৎ জানাইলেন যে পর দিন সকালে তিনি আক্রমণ করিবেন; তারপর তিনি প্রকারের মধ্যে অল্প সৈন্য রাখিয়া অন্য সৈন্যদের লইয়া উঁচু জমির আড়ালে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। সকালে ইব্রাহিম খানের সৈন্যদের প্রতি একবার তীর ছুঁড়িয়া শের খানের অশ্বারোহী সৈন্যেরা পিছু হটিল; তাহারা পলাইতেছে ভাবিয়া বাংলার অশ্বারোহী সৈন্যেরা তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিল। তখন শের খান তাঁহার লুক্কায়িত সৈন্যদের লইয়া বাংলার সৈন্যদের আক্রমণ করিলেন, তাহারা স্থিরভাবে যুদ্ধ করিতে লাগিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত পরাজিত হইল এবং ইব্রাহিম খান নিহত হইলেন। বাংলার বাহিনীর হাতি, তোপ ও অর্থ-ভাণ্ডার সব কিছুই শের খানের দখলে আসিল। ইহার পর শের খান তেলিয়াগড়ি (সাহেবগঞ্জের নিকটে অবস্থিত) পর্যন্ত মাহমূদ শাহের অধিকারভুক্ত সমস্ত অঞ্চল অধিকার করিলেন। মাহমূদ শাহের সেনাপতিরা–বিশেষত পর্তুগীজ বীর জোআঁ-দে-ভিল্লালোবোস ও জোআঁ কোরীয়া–শের খানকে তেলিয়াগড়ি ও সকরিগলি গিরিপথ পার হইতে দিলেন না। তখন শের খান অন্য এক অপেক্ষাকৃত অরক্ষিত পথ দিয়া বাংলা দেশে প্রবেশ করিলেন এবং ৪০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য, ১৬,০০০ হাতি, ২০,০০০ পদাতিক ও ৩০০ নৌকা লইয়া রাজধানী গৌড় আক্রমণ করিলেন। নির্বোধ মাহমূদ শাহ তখন ১৩ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দিয়া শের খানের সহিত সন্ধি করিলেন। শের খান তখনকার মত ফিরিয়া গেলেন। ইহার পর তিনি মাহমুদ শাহেরই অর্থে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করিয়া এক বৎসর বাদে মাহমুদের কাছে “সার্বভৌম নৃপতি হিসাবে তাঁহার প্রাপ্য নজরানা বাবদ” এক বিরাট অর্থ দাবি করিলেন এবং মাহমূদ তাহা দিতে রাজী না হওয়ায় তিনি আবার গৌড় আক্রমণ করিলেন। শের খানের পুত্র জলাল খান এবং সেনাপতি খওয়াস খানের নেতৃত্বে প্রেরিত এক সৈন্যবাহিনী গৌড় নগরীর উপর হানা দিয়া নগরীটি ভস্মীভূত করিল এবং সেখানে লুঠ চালাইয়া ষাট মণ সোনা হস্ত গত করিল।
এই সময়ে হুমায়ুন শের খানকে দমন করিবার জন্য বিহার অভিমুখে রওনা হইয়াছিলেন। তিনি চুনার দুর্গ জয় করিয়াছেন, এই সংবাদ শুনিয়া শের খান বিচলিত হইলেন। তিনি ইতিমধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা দ্বারা রোটাস দুর্গ জয় করিয়াছিলেন। মাহমূদ শাহ গৌড় নগরীকে প্রাকার ও পরিখা দিয়া ঘিরিয়া আত্মরক্ষা করিতেছিলেন। শের খানের সেনাপতি খওয়াস খান একদিন পরিখায় পড়িয়া মারা গেলেন। তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মোসাহেব খানকে ‘খওয়াস খান’ উপাধি দিয়া শের খান গৌড়ে পাঠাইলেন। ইনি ৬ই এপ্রিল, ১৫৩৮ খ্রী তারিখে গৌড় নগরী জয় করিলেন। তখন শের খানের পুত্র জলাল খান মাহমূদের পুত্রদের বন্দী করিলেন; মাহমূদ শাহ স্বয়ং পলায়ন করিলেন, শের খান তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করায় মাহমুদ শের খানের সহিত যুদ্ধ করিলেন এবং এই যুদ্ধে পরাজিত ও আহত হইলেন। শের খান হুমায়ুনের নিকট দূত পাঠাইলেন, কিন্তু মাহমূদ হুমায়ুনের সাহায্য চাহিলেন এবং তাঁহাকে জানাইলেন যে শের খান গৌড় নগরী অধিকার করিলেও বাংলার অধিকাংশ তাঁহারই দখলে আছে। হুমায়ুন মাহমূদের প্রস্তাবে রাজী হইয়া গৌড়ের দিকে রওনা হইলেন। শের খান বকুণ্ডা দুর্গে গিয়াছিলেন; তাঁহার বিরুদ্ধে হুমায়ুন এক বাহিনী পাঠাইলেন। তখন শের খান তাঁহার বাহিনীকে রোটাস দুর্গে পাঠাইয়া স্বয়ং পার্ব্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় লইলেন। শোণ ও গঙ্গার সঙ্গমস্থলে আহত মাহমূদ শাহের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া হুমায়ুন গৌড়ের দিকে রওনা হইলেন। জলাল খান হুমায়ুনকে তেলিয়াগড়ি গিরিপথে এক মাস আটকাইয়া রাখিয়া অবশেষে পথ ছাড়িয়া দিলেন। এই এক মাসে শের খান গৌড় নগরের লুণ্ঠনলব্ধ ধনসম্পত্তি লইয়া ঝাড়খণ্ড হইয়া রোটাস দুর্গে গমন করেন। হুমায়ুন তেলিয়াগড়ি গিরিপথ অধিকার করিবার পরেই গিয়াসুদ্দীন মাহমূদ শাহের মৃত্যু হইল। অতঃপর হুমায়ুন বিনা বাধায় গৌড় অধিকার করেন (জুলাই, ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দ)।
