নসরৎ শাহের রাজত্বকালে পর্তুগীজরা আর একবার বাংলা দেশে ঘাঁটি স্থাপনের ব্যর্থ চেষ্টা করে। সিলভেরার আগমনের পর হইতে পর্তুগীজরা প্রতি বৎসরেই বাংলাদেশে একটি করিয়া জাহাজ পাঠাইত। ১৫২৬ খ্রীষ্টাব্দে রুই-ভাজ পেরেরার অধিনায়কত্বে এইরূপ একটি পর্তুগীজ জাহাজ চট্টগ্রামে আসে। পেরেরা চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছিয়া সেখানে অবস্থিত খাজা শিহাবুদ্দীন নামে একজন ইরানী বণিকের পর্তুগীজ রীতিতে নির্মিত একটি জাহাজ কাড়িয়া লইয়া চলিয়া যান।
১৫২৮ খ্রীষ্টাব্দে মাতিম-আফলো-দে-মেলোর পরিচালনাধীন একটি পর্তুগীজ জাহাজ ঝড়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া বাংলার উপকূলের কাছে আসিয়া পড়ে। এখানকার কয়েক জন ধীবর ঐ জাহাজে পর্তুগীজদের চট্টগ্রামে পৌঁছাইয়া দিবার নাম করিয়া চকরিয়ায় লইয়া যায়। চকরিয়ার শাসনকর্ত্তা খোদা বশ খান জনৈক প্রতিবেশী ভূস্বামীর সহিত যুদ্ধে এই পর্তুগীজদের নিয়োজিত করেন, কিন্তু যুদ্ধে জয়লাভের পর তিনি তাহাদের পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মুক্তি না দিয়া সোরে শহরে বন্দী করিয়া রাখেন। ইহার পর আর একদল পর্তুগীজ অন্য এক জাহাজে করিয়া চকরিয়ায় আসিলেন এবং তাঁহাদের সব জিনিস খোদা বখশ খানকে দিয়া আফলো-দে-মেলোকে মুক্ত করিবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু খোদা বখশ খান আরও অর্থ চাহিলেন। পর্তুগীজদের কাছে আর কিছু ছিল না। দে-মেলো সদলবলে পলাইয়া ইহাদের সহিত যোগ দিতে চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইলেন; তাঁহার রূপবান তরুণ ভ্রাতুষ্পুত্রকে ব্রাহ্মণেরা ধরিয়া দেবতার নিকট বলি দিল; অবশেষে পূর্ব্বোক্ত খাজা শিহাবুদ্দীনের মধ্যস্থতায় আফসো-দে-মেলো প্রচুর অর্থের বিনিময়ে মুক্ত হন এবং পর্তুগীজরা শিহাবুদ্দীনকে তাঁহার লুণ্ঠিত জাহাজ জিনিসপত্র সমেত ফিরাইয়া দেয়। শিহাবুদ্দীন বাংলার সুলতানের সহিত একটা বিষয়ের নিষ্পত্তি করিবার জন্য ও ওরমুজ যাইবার জন্য পর্তুগীজ জাহাজের সাহায্য চাহেন এবং তাঁহার বিনিময়ে পর্তুগীজদের বাংলায় বাণিজ্য করিবার ও চট্টগ্রামে দুর্গ নির্মাণ করিবার অনুমতি দিতে নসরৎ শাহকে সম্মত করাইবার চেষ্টা করিতে প্রতিশ্রুত হন। গোয়র পর্তুগীজ গভর্নর এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেও এ সম্বন্ধে কিছু ঘটিবার পূর্বেই নসরৎ শাহের মৃত্যু হইল।
নসরৎ শাহ ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। গৌড়ে তিনি অনেকগুলি মসজিদ নির্মাণ করাইয়াছিলেন। আহার মধ্যে বিখ্যাত বারদুয়ারী বা সোনা মসজিদ অন্যতম। অনেকের ধারণা গৌড়ের বিখ্যাত ‘কম্ রসুল’ ভবনও নসরৎ শাহ নির্মাণ করাইয়াছিলেন; কিন্তু আসলে এটি শামসুদ্দীন য়ুসুফ শাহের আমলে নির্মিত হইয়াছিল। নসরৎ শাহ কেবলমাত্র এই ভবনের প্রকোষ্ঠে একটি মঞ্চ নির্মাণ করান এবং তাঁহার উপরে হজরৎমুহম্মদের পদচিহ্ন-সংবলিত একটি কালো কারুকার্যখচিত মর্মর-বেদী বসান। নসরৎ শাহ অনেক প্রাসাদও নির্মাণ করাইয়াছিলেন।
নসরৎ শাহের নাম সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের কয়েকটি রচনায়–যেমন শ্রীকর নন্দীর মহাভারতে এবং কবিশেখরের পদে–উল্লিখিত দেখিতে পাওয়া যায়। কবিশেখর নসরৎ শাহের কর্মচারী ছিলেন।
নসরৎ শাহের রাজ্যের আয়তন খুব বেশি ছিল। প্রায় সমগ্র বাংলা দেশ বিহুত ও বিহারের অধিকাংশ এবং উত্তর প্রদেশের কিয়দংশ নসরৎ শাহের অধিকারভুক্ত ছিল।
‘রিয়াজ’এর মতে নসরৎ শাহ শেষজীবনে জনসাধারণের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচার করিয়া তাঁহার রাজত্বকে কলঙ্কিত করেন; এই কথার সত্যতা সম্বন্ধে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। বিভিন্ন বিবরণের মতে নসরৎ শাহ আততায়ীর হস্তে নিহত হইয়াছিলেন; রিয়াজে’র মতে তিনি পিতার সমাধিক্ষেত্র হইতে ফিরিতেছিলেন, এমন সময়ে তাঁহার দ্বারা দণ্ডিত জনৈক খোঁজা তাঁহাকে হত্যা করে; বুকাননের বিবরণীর মতে নসরৎ শাহ নিদ্রিতাবস্থায় প্রাসাদের প্রধান খোঁজার হাতে নিহত হন।
৩
আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ (দ্বিতীয়)
নাসিরুদ্দীন নসরৎ শাহের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ইনি দ্বিতীয় আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ, কারণ এই নামের আর একজন সুলতান ইতিপূর্বে ১৪১৪ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন।
সুলতান হইবার পূর্বে ফিরোজ শাহ যখন যুবরাজ ছিলেন, তখন তাঁহার আদেশে শ্রীধর কবিরাজ নামে জনৈক কবি একখানি ‘কালিকামঙ্গল’ বা ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য রচনা করেন–এইটিই প্রথম বাংলা ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য, এই কাব্যটিতে শ্রীধর তাঁহার আজ্ঞাদাতা যুবরাজ “পেরোজ শাহা” অর্থাৎ ফিরোজ শাহ এবং তাঁহার পিতা নৃপতি “নসীর শাহ” অর্থাৎ নাসিরুদ্দীন নসরৎ শাহের নাম উল্লেখ করিয়াছেন। শ্রীধর সম্ভবত চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোক, কারণ তাঁহার ‘কালিকামঙ্গলের পুঁথি চট্টগ্রাম অঞ্চলেই পাওয়া গিয়াছে। ইহা হইতে মনে হয়, নসরৎ শাহের রাজত্বকালে যুবরাজ ফিরোজ শাহ চট্টগ্রাম অঞ্চলের শাসনকর্ত্তা ছিলেন এবং সেই সময়েই তিনি শ্রীধর কবিরাজকে দিয়া এই কাব্যখানি লেখান।
অসমীয়া বুরঞ্জী হইতে জানা যায়, নসরৎ শাহ আসামে যে অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন, তাহা নসরতের মৃত্যুর পরেও চলিয়াছিল। ফিরোজ শাহের রাজত্বকালে বাংলার বাহিনী আসামের ভিতর দিকে অগ্রসর হয়। অতঃপর বর্ষার আগমনে তাহাদের অগ্রগতি বন্ধ হয়। ১৫৩২ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে তাহারা খলাধরিতে (দরং জেলা) উপনীত হয়। অহোমরাজ বুরাই নদীর মোহনা পাহারা দিবার জন্য শক্তিশালী বাহিনী পাঠাইলেন এবং পরিখা কাটাইলেন। মুসলমানরা তখন ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ তীরে সরিয়া গিয়া সালা দুর্গ অধিকার করিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু দুর্গের অধ্যক্ষ তাহাদের উপর গরম জল ঢালিয়া দিয়া তাহাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করিলেন। দুই মাস ইতস্তত খণ্ডযুদ্ধ চলার পর উভয় পক্ষের মধ্যে একটি বৃহৎ স্থলযুদ্ধ হইল। অহোমরা ৪০০ হাতি লইয়া মুসলমান অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ সৈন্যের সহিত যুদ্ধ করিল এবং এই যুদ্ধে তাহারা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হইয়া দুর্গের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিল। প্রায় এই সময়েই ফিরোজ শাহ প্রায় এক বৎসর রাজত্ব করিবার পর তাঁহার পিতৃব্য গিয়াসুদ্দীন মাহমূদের হস্তে নিহত হন। অতঃপর গিয়াসুদ্দীন সিংহাসনে আরোহণ করেন।
