‘রিয়াজের মতে নসরৎ শাহও বাবরের বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করিয়াছিলেন। কিন্তু বাবরের আত্মকাহিনীতে এরূপ কোন কথা পাওয়া যায় না। বাবর নসরতের নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে কোন প্রকাশ্য প্রমাণ পান নাই। তিনি তিনটি সর্তে নসরৎ শাহের সহিত সিন্ধ করিতে চাহিলেন। এই সর্তগুলির মধ্যে একটি হইল, ঘর্ঘরা নদী দিয়া বাবরের সৈন্যবাহিনীর অবাধ চলাচলের অধিকার দিতে হইবে। কিন্তু বাবর বারবার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও নসরৎ শাহ সন্ধির প্রস্ত বি অনুমোদন করিলেন না অথবা অবিলম্বে এই প্রস্তাবের উত্তর দিলেন না। এদিকে বাবর চরের মারফৎ সংবাদ পাইলেন যে বাংলার সৈনাবাহিনী গণ্ডক নদীর তীরে মখদূম-ই-আলমের নেতৃত্বে ২৪টি স্থানে সমবেত হইয়া আত্মরক্ষার ব্যবস্থা সুদৃঢ় করিতেছে এবং তাহারা বাবরের নিকট আত্মসমর্পণেচ্ছু আফগানদের আটকাইয়া রাখিয়া নিজেদের দলে টানিতেছে। বাবর নসরৎ শাহকে ঘর্ঘরা নদীর এপার হইতে সৈন্য সরাইয়া লইয়া তাঁহার পথ খুলিয়া দিতে বলিয়া পাঠাইলেন এবং নসরৎ তাহা না করিলে তিনি যুদ্ধ করিবেন, ইহাও জানাইয়া দিলেন। কয়েকদিন অপেক্ষা করিয়াও যখন বাবর নসরতের কাছে কোন উত্তর পাইলেন না, তখন তিনি বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত করিলেন।
বাবর বাংলার সৈন্যদের শক্তি এবং কামান চালনায় দক্ষতার কথা জানিতেন, সেইজন্য বক্সারে খুব শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী লইয়া আসিয়াছিলেন। এই সৈন্যবাহিনী লইয়া বাবর জোর করিয়া ঘর্ঘরা নদী পার হইলেন। তাঁহার ফলে ১৫২৯ খ্রীষ্টাব্দের ২রা মে হইতে ৬ই মে পর্যন্ত বাংলার সৈন্যবাহিনীর সহিত বাবরের বাহিনীর যুদ্ধ হইল। বাংলার সৈন্যেরা প্রশংসনীয়ভাবে যুদ্ধ করিল; তাহাদের কামান-চালনার দক্ষতা দেখিয়া বাবর মুগ্ধ হইলেন; তিনি দেখিলেন বাঙালীদের কামান-চালনার হাত এত পাকা যে লক্ষ্য স্থির না করিয়া যথেচ্ছভাবে কামান-চালাইয়া তাহারা শত্রুদের পর্যুদস্ত করিতে পারে। দুইবার বাঙালীরা বাবরের বাহিনীকে পরাস্ত করিল। কিন্তু তাহারা শেষ রক্ষা করিতে পারিল না, বাবরের বাহিনীর শক্তি অধিক হওয়ায় তাহারাই শেষপর্যন্ত জয়ী হইল। যুদ্ধের শেষদিকে বসন্ত রাও নামে বাংলার একজন বিখ্যাত হিন্দু বীর অনুচরবর্গ সমেত বাবরের সৈন্যদের হাতে নিহত হইলেন। ৬ই মে দ্বিপ্রহরের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হইয়া গেল। বাবর তাঁহার সৈনাবাহিনী সমেত ঘর্ঘরা নদী পার হইয়া সারণে পৌঁছিলেন। এখানে জলাল খান লোহানী তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন বাবর জলালকে বিহারে তাঁহার সামন্ত হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিলেন।
কিন্তু নসরৎ শাহ এই সময়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিলেন। ঘর্ঘরার যুদ্ধের কয়েকদিন পরে মুঙ্গেরের শাহজাদা ও লস্কর-উজীর হোসেন খান মারফৎ তিনি বাবরের কাছে দূত পাঠাইয়া জানাইলেন যে বাবরের তিনটি সর্ত মানিয়া সন্ধি করিতে তিনি সম্মত। এই সময়ে বাবরের শত্রু আফগান নায়কদের কতকাংশ পর্যদস্ত, কতক নিহত হইয়াছিল, কয়েকজন বাবরের নিকট বশ্যতা স্বীকার করিয়াছিল এবং কয়েকজন বাংলায় আশ্রয় লইয়াছিল; তাঁহার উপর বর্ষাও আসন্ন হইয়া উঠিতেছিল। তাই বাবরও সন্ধি করিতে রাজী হইয়া অপর পক্ষকে পত্র দিলেন। এইভাবে বাবর ও নসরৎ শাহের সংঘর্ষের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি ঘটিল। বাবরের সহিত সংঘর্ষের ফলে নসরৎ শাহকে কিছু কিছু অঞ্চল হারাইতে হইল এবং এই অঞ্চলগুলি বাবরের রাজ্যভুক্ত হইল।
‘রিয়াজ’-এর মতে বাবরের মৃত্যুর পর যখন হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহণ করেন, তাঁহার কিছুদিন পরে নসরৎ শাহের কাছে সংবাদ আসে যে হুমায়ুন বাংলা আক্রমণের উদ্যোগ করিতেছেন; তখন নসরৎ হুমায়ুনের শত্রু গুজরাটের সুলতান বাহাদূর শাহের কাছে অনেক উপহার সমেত দূত পাঠান-উদ্দেশ্য তাঁহার সহিত জোট বাঁধা। এই কথা সত্য বলিয়া মনে হয় এবং সত্য হইলে ইহা হইতে নসরৎ শাহের কূটনীতিজ্ঞানের একটি প্রকৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়।
বাবর ভিন্ন আর যেসব শক্তির সহিত নসরৎ শাহের সংঘর্ষ হইয়াছিল, তন্মধ্যে ত্রিপুরা অন্যতম। ‘রাজমালা’র মতে নসরৎ শাহের সমসাময়িক ত্রিপুরারাজ দেবমাণিক্য চট্টগ্রাম জয় করিয়াছিলেন। পক্ষান্তরে মুহম্মদ খান মঞ্জুল হোসেন কাব্যে লিখিয়াছেন যে তাঁহার পূর্বপুরুষ হামজা খান ত্রিপুরার সহিত যুদ্ধে বিজয়ী হইয়াছিলেন। হামজা খান সম্ভবত চট্টগ্রামের শাসনকর্ত্তা ছিলেন এবং সময়ের দিক্ দিয়া তিনি নসরৎ শাহের সমসাময়িক। সুতরাং নসরৎ শাহের সহিত ত্রিপুরারাজের যুদ্ধ হইয়াছিল বলিয়া বুঝা যাইতেছে, তবে এই যুদ্ধে উভয়পক্ষই জয়ের দাবি করায় আসলে ইহার ফল কী হইয়াছিল তাহা বলা কঠিন।
‘অহোম বুরঞ্জী’তে লেখা আছে যে, নসরৎ শাহের রাজত্বকালে–১৫৩২ খ্রীষ্টাব্দে বাংলা কর্ত্তৃক আসাম আক্রান্ত হইয়াছিল; ঐ বৎসরে “তুরবক” নামে বাংলার সুলতানের একজন মুসলমান সেনাপতি ৩০টি হাতি, ১০০০টি ঘোড়া এবং বহু কামান লইয়া অহোম রাজ্য আক্রমণ করেন এবং তেমনি দুর্গ জয় করিয়া সিঙ্গরি নামক দুর্ভেদ্য ঘাঁটির সম্মুখে তাঁবু ফেলিয়া অপেক্ষা করিতে থাকেন। বরপাত্র গোহাইন এবং রাজপুত্র সুক্লেনের নেতৃত্বে অহোমরাজের সৈন্যেরা সিঙ্গরি রক্ষা করিতে থাকে। অল্পকালের মধ্যেই দুই পক্ষে খণ্ডযুদ্ধ শুরু হইয়া গেল। কিছুদিন খণ্ডযুদ্ধ চলিবার পর সুক্রেন ব্রহ্মপুত্র নদ পার হইয়া মুসলমানদিগকে আক্রমণ করিলেন। মুসলমানরা প্রথমে তুমুল যুদ্ধের ফলে ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেও শেষপর্যন্ত জয়ী হইল। এই যুদ্ধে আটজন অহোম সেনাপতি নিহত হইলেন, রাজপুত্র সুক্রেন কোনক্রমে প্রাণে বাঁচিয়াও মারাত্মকভাবে আহত হইলেন, বহু অহোম সৈন্য জলে ডুবিয়া মরিল, অন্যেরা সালা নামক স্থানে পলাইয়া গেল। অহোমরাজ সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠন করিয়া বরপাত্র গোহাইনের অধীনে রাখিলেন।
