আসল কথা, হোসেন শাহ ছিলেন বিচক্ষণ ও রাজনীতিচতুর নরপতি। হিন্দুধর্ম্মের প্রতি অত্যধিক বিদ্বেষের পরিচয় দিলে অথবা হিন্দুদের মনে বেশি আঘাত দিলে তাঁহার ফল যে বিষময় হইবে, তাহা তিনি বুঝিতেন। তাই তাঁহার হিন্দুবিরোধী কার্যকলাপ সংখ্যায় অল্প না হইলেও তাহা কোনদিনই একেবারে মাত্রা ছাড়াইয়া যায় নাই।
. অনেকের ধারণা, হোসেন শাহই বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতান এবং তাঁহার রাজত্বকালে বাংলা দেশ ও বাঙালী জাতি চরম সমৃদ্ধি লাভ করিয়াছিল। এই ধারণা একেবারে অমূলক নয়। তবে বাংলার অন্যান্য শ্রেষ্ঠ সুলতানদের সম্বন্ধে হোসেন শাহের মত এত বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, সে কথাও মনে রাখিতে হইবে। হোসেন শাহের রাজত্বকালেই চৈতন্যদেবের অভ্যুদয় ঘটিয়াছিল বলিয়া চৈতন্যচরিতগ্রন্থগুলিতে প্রসঙ্গক্রমে হোসেন শাহ ও তাঁহার আমল সম্বন্ধে বহু তথ্য লিপিবদ্ধ হইয়াছে। অন্য সুলতানদের রাজত্বকালে অনুরূপ কোন ঘটনা ঘটে নাই বলিয়া তাঁহাদের সম্বন্ধে এত বেশি তথ্য কোথাও লিপিবদ্ধ হয় নাই। সুতরাং হোসেন শাহই যে বাংলার শ্রেষ্ঠ সুলতান, এ কথা জোর করিয়া বলা যায় না। ইলিয়াস শাহী বংশের প্রথম তিনজন সুলতান এবং রুকনুদ্দীন বারবক শাহ কোন কোন দিক দিয়া তাঁহার তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করিতে পারেন।
হোসেন শাহের শিলালিপির সাক্ষ্য হইতে দেখা যায়, তিনি ১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দের আগস্ট মাস পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। সম্ভবত তাঁহার কিছু পরে তিনি পরলোকগমন করিয়াছিলেন। বাবরের আত্মকাহিনী হইতে পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে, হোসেন শাহের স্বাভাবিক মৃত্যু হইয়াছিল।
২
নাসিরুদ্দীন নসরৎ শাহ
আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মৃত্যুর পর তাঁহার সুযোগ্য পুত্র নাসিরুদ্দীন নসরৎ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। মুদ্রার সাক্ষ্য হইতে দেখা যায় যে পিতার মৃত্যুর অন্ত ত তিন বৎসর পূর্বে নসরৎ শাহ যুবরাজপদে অধিষ্ঠিত হন এবং নিজ নামে মুদ্রা প্রকাশ করিবার অধিকার লাভ করেন। কোন কোন ইতিহাসগ্রন্থের মতে নসরৎ শাহ হোসেন শাহের ১৮ জন পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন এবং পিতার মৃত্যুর পরে তিনি তাঁহার ভ্রাতাদের কোন অনিষ্ট করিয়া তাহাদের পিতৃদত্ত বৃত্তি দ্বিগুণ করিয়া দেন।
‘রিয়াজ-উস্-সলাতীন’ এবং অন্য কয়েকটি সূত্র হইতে জানা যায় যে, নসরৎ শাহ ত্রিহুতের রাজা কংসনারায়ণকে বন্দী করিয়া বধ করেন এবং ত্রিহুত সম্পূর্ণভাবে অধিকার করার জন্য তাঁহার ভগ্নীপতি মখদুম আলমকে নিযুক্ত করেন। ত্রিহুতে প্রচলিত একটি শ্লোকের মতে ১৫২৭ খ্রীষ্টাব্দে এই ঘটনা ঘটিয়াছিল।
হোসেন শাহের রাজ্য বাংলার সীমা অতিক্রম করিয়া বিহারের তিতরেও অনেকখানি পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিল বটে, কিন্তু পাশেই পরাক্রান্ত লোদী সুলতানদের রাজ্য থাকায় বাংলার সুলতানকে কতকটা সশঙ্কভাবে থাকিতে হইত। নসরৎ শাহের সিংহাসনে আরোহণের দুই বৎসর পরে লোদী সুলতানদের রাজ্যে ভাঙন ধরিল; পাটনা হইতে জৌনপুর পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল প্রায় স্বাধীন হইল এবং এই অঞ্চলে লোহানী ও ফর্মুলি বংশীয় আফগান নায়করা প্রাধান্য লাভ করিলেন। নসরৎ শাহ ইঁহাদের সহিত মৈত্রী স্থাপন করিলেন।
এদিকে ১৫২৬ খ্রীষ্টাব্দে বাবর পাণিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাস্ত ও নিহত করিয়া দিল্লি অধিকার করিলেন এবং দ্রুত রাজ্যবিস্তার করিতে লাগিলেন। আফগান নায়কেরা তাঁহার হাতে পরাজিত হইয়া পূর্ব ভারতে পলাইয়া গেলেন। ক্রমশ ঘর্ঘরা নদীর তীর পর্যন্ত অঞ্চল বাবরের রাজ্যভুক্ত হইল। ঘর্ঘরা নদীর এপার হইতে নসরৎ শাহের রাজ্য আরম্ভ। বাবর কর্ত্তৃক পরাস্ত ও বিতাড়িত আফগানদের অনেকে নসরৎ শাহের কাছে আশ্রয় লাভ করিল। কিন্তু নসরৎ প্রকাশ্যে বাবরের বিরুদ্ধাচরণ করিলেন না। বাবর নসরতের কাছে দূত পাঠাইয়া তাঁহার মনোভাব জানিতে চাহিলেন, কিন্তু ঐ দূত নসরৎ শাহের সভায় বৎসরাধিককাল থাকা সত্ত্বেও নসরৎ শাহ খোলাখুলিভাবে কিছুই বলিলেন না। অবশেষে যখন বাবরের সন্দেহ জাগ্রত হইল, তখন নসরৎ বাবরের দূতকে ফেরৎ পাঠাইয়া নিজের দূতকে তাঁহার সঙ্গে দিয়া বাবরের কাছে অনেক উপহার পাঠাইয়া বন্ধুত্ব ঘোষণা করিলেন। ফলে বাবর বাংলা আক্রমণের সঙ্কল্প ত্যাগ করিলেন।
ইহার পর বিহারের লোহানী-প্রধান বহার খানের আকস্মিক মৃত্যু ঘটায় তাঁহার বালক পুত্র জলাল খান তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইলেন। শের খান সূর দক্ষিণ বিহারের জায়গীর গ্রহণ করিলেন। ইতিমধ্যে ইব্রহিম লোদীর ভ্রাতা মাহমুদ নিজেকে ইব্রাহিমের উত্তরাধিকারী বলিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন। তিনি জৌনপুর অধিকার করিলেন এবং বালক জলাল খান লোহানীর রাজ্য কাড়িয়া লইলেন। জলাল খান হাজীপুরে পলাইয়া গিয়া তাঁহার পিতৃবন্ধু নসরৎ শাহের কাছে আশ্রয় চাহিলেন, কিন্তু নসরৎ শাহ তাঁহাকে হাজীপুরে আটক করিয়া রাখিলেন। শের খান প্রমুখ বিহারের আফগান নায়কেরা মাহমুদের সহিত যোগ দিলেন। অতঃপর তাহারা বাবরের রাজ্য আক্রমণ করিলেন। কিন্তু শের খান শীঘ্রই বশ্যতা স্বীকার করিলেন। অন্যদের দমন করিবার জন্য বাবর সৈন্যবাহিনীসমেত বক্সারে আসিলেন। জলাল লোহানী অনুচরবর্গ সমেত কৌশলে নসরতের কবল হইলে মুক্তিলাভ করিয়া বক্সারে বাবরের কাছে আত্মসমর্পণ করিবার জন্য রওনা হইলেন।
