যুদ্ধের সময়ে হোসেন শাহ হিন্দুধর্ম্মের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাইয়াছেন দেবমন্দির ও দেবমূর্ত্তি ধ্বংস করিয়া। শান্তির সময়েও তাঁহার হিন্দুর প্রতি অনুদার ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। তাঁহার মনিব সুবুদ্ধি রায় তাঁহাকে একদা বেত্রাঘাত করিয়াছিলেন, এইজন্য, তিনি সুবুদ্ধি রায়ের জাতি নষ্ট করেন। হোসেন শাহ যখন কেশব ছত্রীকে চৈতন্যদেবের কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তখন কেশব ছত্রী তাঁহার, কাছে চৈতন্যদেবের মহিমা লাঘব করিয়া বলিয়াছিলেন। ইহা হইতে মনে হয়, হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি হোসেন শাহের পূর্ব-ব্যবহার খুব সন্তোষজনক ছিল না।
হোসেন শাহের অধীনস্থ আঞ্চলিক শাসনকর্ত্তা ও রাজকর্মচারীদের আচরণ সম্বন্ধে যে সব তথ্য পাই, সেগুলি হইতেও হোসেন শাহের হিন্দু-মুসলমানে সমদর্শিতা সম্বন্ধীয় ধারণা সমর্থিত হয় না। চৈতন্যভাগবত’ হইতে জানা যায়, যখন চৈতন্যদেব নবদ্বীপে হরি-সঙ্কীর্তন করিতেছিলেন এবং তাঁহার দৃষ্টান্ত অনুসরণে অন্যেরাও কীর্তন করিতেছিল, তখন নবদ্বীপের কাজী কীর্তনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেন। ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’র মতে কাজী একজন কীর্তনীয়ার খোল ভাঙিয়া দিয়াছিলেন এবং কেহ কীর্তন করিলেই তাঁহার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিয়া জাতি নষ্ট করিবেন বলিয়া শাসাইয়াছিলেন।
‘‘চৈতন্যচরিতামৃত’ হইতে জানা যায় যে, হোসেন শাহের অথবা তাঁহার পুত্র নসরৎ শাহের রাজত্বকালে বেনাপোলের জমিদার রামচন্দ্র খানের রাজকর বাকী পড়ায় বাংলার সুলতানের উজীর তাঁহার বাড়ীতে আসিয়া তাহাকে স্ত্রী-পুত্র সমেত বন্দী করেন এবং তাঁহার দুর্গামণ্ডপে গরু বধ করিয়া তিন দিন ধরিয়া তাঁহার মাংস রন্ধন করান; এই তিন দিন তিনি রামচন্দ্র খানের গৃহ ও গ্রাম নিঃশেষে লুণ্ঠন করিয়া তাঁহার জাতি নষ্ট করিয়া অবশেষে তাঁহাকে লইয়া চলিয়া যান। ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ হইতে আরও জানা যায় যে, সপ্তগ্রামের মুসলমান শাসকর্ত্তা নিছক গায়ের জোরে ঐ অঞ্চলের ইজারাদার হিরণ্য মজুমদার ও গোবর্ধন মজুমদারের নিকট সুলতানের কাছে তাঁহাদের প্রাপ্য আট লক্ষ টাকার ভাগ চাহিয়াছিলেন, তাঁহার মিথ্যা নালিশ শুনিয়া হোসেন শাহের উজীর হিরণ্য ও গোবর্ধনকে বন্দী করিতে আসিয়াছিলেন এবং তাঁহাদের না পাইয়া গোবর্ধনের পুত্র নিরীহ রঘুনাথকে বন্দী করিয়াছিলেন; সর্বাপেক্ষা আশ্চর্যের বিষয়, সুলতানের কারাগারে বন্দী হইবার পরেও সপ্তগ্রামের শাসনকর্ত্তা রঘুনাথকে তর্জনগর্জন ও ভীতি-প্রদর্শন করিতে থাকেন।
বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের ‘মনসামঙ্গল’ হোসেন শাহের রাজত্বকালে রচিত হয়। এই গ্রন্থের “হাসন-হুসেন” পালায় লেখা আছে যে মুসলমানরা “জুলুম” করিত এবং “ছৈয়দ মোল্লা”রা হিন্দুদের কলমা পড়াইয়া মুসলমান করিত।
হোসেন শাহের রাজত্বকালে তাঁহার মুসলমান কর্মচারীরা হিন্দুদের ধর্মকর্ম লইয়া উপহাস করিত। বৈষ্ণবদের কীর্তনকে তাহারা বলিত “ভূতের সংকীর্তন”।
কেহ কেহ বলিতে পারেন যে হোসেন শাহের মুসলমান কর্মচারীদের বা প্রজাদের হিন্দু-বিদ্বেষ হইতে সুলতানের হিন্দু-বিদ্বেষ প্রমাণিত হয় না। কিন্তু হোসেন শাহ যদি হিন্দুদের উপর সহানুভূতি-সম্পন্ন হইতেন, তাহা হইলে তাঁহার কর্মচারীরা বা অন্য মুসলমানরা হিন্দু-বিদ্বেষের পরিচয় দিতে ও হিন্দুদের উপর নির্যাতন করিতে সাহস পাইত বলিয়া মনে হয় না। তাহা ছাড়া, হোসেন শাহও যে খুব বেশি হিন্দুদের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না, সে কথাও চৈতন্যচরিগ্রন্থগুলিতে লেখা আছে। ‘চৈতন্যচরিতামৃতের এক জায়গায় দেখা যায়, নবদ্বীপের মুসলমানরা স্থানীয় কাজীকে বলিতেছে যে নবদ্বীপে হিন্দুরা “হরি হরি” বলিয়া কোলাহল করিতেছে একথা শুনিলে বাদশাহ (অর্থাৎ হোসেন শাহ) কাজীকে শাস্তি দিবেন। চৈতন্যভাগবতে দেখা যায়, হোসেন শাহের হিন্দু কর্মচারীরা বলিতেছে যে হোসেন শাহ “মহাকালযবন” এবং তাঁহার ঘন ঘন “মহাতমোগুণবুদ্ধি জন্মে”। নৈষ্ঠিক বৈষ্ণবরা হোসেন শাহকে কোনদিনই উদার মনে করেন নাই। তাহাদের মতে হোসেন শাহ দ্বাপর যুগের কৃষ্ণলীলার সময়ে জরাসন্ধ ছিলেন।
সুতরাং হোসেন শাহ যে অসাম্প্রদায়িক-মনোভাবসম্পন্ন ছিলেন এবং হিন্দুদের প্রতি অপক্ষপাত আচরণ করিতেন, এই ধারণা একেবারেই ভুল।
অবশ্য হোসেন শাহ যে উকট রকমের হিন্দু-বিদ্বেষী বা ধর্মোন্মাদ ছিলেন না, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তিনি যদি ধর্মোন্মাদ হইতেন, তাহা হইলে নবদ্বীপের কীর্তন বন্ধ করায় সেখানকার কাজী ব্যর্থতা বরণ করার পর স্বয়য়ং অকুস্থলে উপস্থিত হইতেন এবং বলপূর্বক কীর্তন বন্ধ করিয়া দিতেন। তাঁহার রাজত্বকালে কয়েকজন মুসলমান হিন্দু-ভাবাপন্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন। চৈতন্যচরিতগ্রন্থগুলি হইতে জানা যায় যে শ্রীবাসের মুসলমান দর্জি চৈতন্যদেবের রূপ দেখিয়া প্রেমোন্মাদ হইয়া মুসলমানদের বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করিয়া হরিনাম কীর্তন করিয়াছিল; উৎকল সীমান্তের মুসলমান সীমাধিকারী ১৫১৫ খ্রীষ্টাব্দে চৈতন্যদেবের ভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল; ইতিপূর্বে-নির্যাতিত যবন হরিদাস হোসেন শাহের রাজত্বকালে স্বাধীনভাবে ঘুরিয়া বেড়াইতেন এবং নবদ্বীপে নগর-সংকীর্তনের সময়ে সম্মুখের সারিতে থাকিতেন। তাঁহার পর, হোসেন শাহেরই রাজত্বকালে চট্টগ্রামের শাসনকর্ত্তা পরাগল খান ও তাঁহার পুত্র ছুটি খান হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ মহাভারত শুনিতেন। হোসেন শাহের রাজধানীর খুব কাছেই রামকেলি, কানাই-নাটশালা প্রভৃতি গ্রামে বহু নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব বাস করিতেন। ত্রিপুরা-অভিযানে গিয়া হোসেন শাহের হিন্দু সৈন্যেরা গোমতী নদীর তীরে পাথরের প্রতিমা পূজা করিয়াছিল। হোসেন শাহ ধর্মোন্মাদ হইলে এ সব ব্যাপার সম্ভব হইত না।
