ভুলবশত হোসেন শাহকে মালাধর বসুর পৃষ্ঠপোষক মনে করায়ও এইরূপ ধারণা প্রচলিত হইয়াছে যে হোসেন শাহ পণ্ডিত ও কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন।
আমাদের ইহা মনে রাখিতে হইবে যে, হোসেন শাহ কোন কবি বা পণ্ডিতকে কোন উপাধি দেন নাই (যেমন রুকনুদ্দীন বারবক শাহ্ দিয়াছিলেন), এবং বৃন্দাবনদাস ‘চৈতন্যভাগবতে একজন লোককে দিয়া বলাইয়াছেন, “না করে পাণ্ডিত্যচর্চ্চা রাজা সে যবন।” সুতরাং হোসেন শাহ বিদ্যা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলিয়া সিদ্ধান্ত করা সমীচীন নহে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একটি পর্বকে অনেকে ‘হোসেন শাহী আমল’ নামে চিহ্নিত করিয়া থাকেন। কিন্তু এরূপ করার কোন সার্থকতা নাই। কারণ হোসেন শাহের রাজত্বকালে মাত্র কয়েকখানি বাংলা গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল। এই গ্রন্থগুলির রচনার মূলে যেমন হোসেন শাহের প্রত্যক্ষ প্রভাব কিছু ছিল না, তেমনি এই সমস্ত গ্রন্থ রচিত হওয়ার ফলে যে বাংলা সাহিত্যের বিরাট সমৃদ্ধি সাধিত হইয়াছিল, তাহাও নহে। কেহ কেহ ভুল করিয়া বলিয়াছেন যে হোসেন শাহের আমলে বাংলার পদাবলী-সাহিত্যের চরম উন্নতি ঘটে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পদাবলী সাহিত্যের চরম উন্নতি ঘটে হোসেন শাহের রাজত্ব অবসানের কয়েক দশক বাদে,–জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রভৃতি কবিদের আবির্ভাবের পর। অতএব বাংলা সাহিত্যের একটি অধ্যায়ের সঙ্গে বিশেষভাবে হোসেন শাহের নাম যুক্ত করার কোন সার্থকতা নাই।
হোসেন শাহ সম্বন্ধে আর প্রচলিত মত এই যে, তিনি ধর্ম্মের ব্যাপারে অত্যন্ত উদার ছিলেন এবং হিন্দু-মুসলমানে সমদর্শী ছিলেন। কিন্তু এই ধারণাও কোন বিশিষ্ট তথ্য দ্বারা সমর্থিত নহে। হোসেন শাহের শিলালিপিগুলির সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, তিনি একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন এবং ইসলামধর্ম্মের মাহাত্ম প্রতিষ্ঠা ও মুসলমানদের মঙ্গল সাধনের জন্যই বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন। হোসেন শাহ গোঁড়া মুসলমান ও পরধর্মদ্বেষী দরবেশ নূর কুত্ত্ব আলমকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন এবং প্রতি বৎসর নূর কুল্ আলমের সমাধি প্রদক্ষিণ করিবার জন্য তিনি পদব্রজে একডালা হইতে পাণ্ডুয়ায় যাইতেন।
হোসেন শাহ হিন্দুদের উচ্চপদে নিয়োগ করিতেন, ইহা দ্বারা তাঁহার হিন্দু মুসলমানে সমদর্শিতা প্রমাণিত হয় না। হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের প্রথা ইলিয়াস শাহী আমল হইতেই চলিয়া আসিতেছিল। সব সময়ে সমস্ত পদের জন্য যোগ্য মুসলমান কর্মচারী পাওয়া যাইত না, অযোগ্যদের নিয়োগ করিলে শাসনকার্যের ক্ষতি হইবে, এই কারণে সুলতানরা ঐসব পদে হিন্দুদের নিয়োগ করিতেন। হোসেন শাহও তাহাই করিয়াছিলেন। সুতরাং এ ব্যাপারে তিনি পূর্ববতী সুলতানদের তুলনায় কোনরূপ স্বাতন্ত্রের পরিচয় দেন নাই।
হোসেন শাহের রাজত্বকালে চৈতন্যদেবের অভ্যুদয় ঘটিয়াছিল। চৈতন্যচরিত গ্রন্থগুলি হইতে জানা যায় যে, চৈতন্যদেব যখন গৌড়ের নিকটে রামকেলি গ্রামে আসেন, তখন কোটালের মুখে চৈতন্যদেবের কথা শুনিয়া হোসেন শাহ চৈতন্যদেবের অসাধারণত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন। কিন্তু ইহা হইতেও তাঁহার ধর্মবিষয়ে উদারতা প্রমাণিত হয় না। কারণ চৈতন্যদেব হোসেন শাহের কাজীর কাছে দুর্ব্যবহার পাইয়াছিলেন। হোসেন শাহের সরকার তাঁহার অভ্যুদয়ে কোনরূপ সাহায্য করে নাই, বরং নানাভাবে তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছিল। এ ব্যাপারও বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে সন্ন্যাসগ্রহণের পরে চৈতন্যদেব আর বাংলায় থাকেন নাই, হিন্দু রাজার দেশ উড়িষ্যা চলিয়া গিয়াছিলেন; বাংলায় থাকিলে বিধর্মী রাজশক্তি তাঁহার ধর্মচর্চ্চার বিঘ্ন ঘটাইতে পারে ভাবিয়াই তিনি হয়তো উড়িষ্যায় গিয়াছিলেন। হোসেন শাহ কর্ত্তৃক চৈতন্যদেবের মাহাত্ম স্বীকার যে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সে কথা চৈতন্যচরিতকারেরাই বলিয়াছেন। ইহাও লক্ষণীয় যে হোসেন শাহ চৈতন্যদেবের ক্ষতি না করিবার আশ্বাস দিলেও তাঁহার হিন্দু কর্মচারীরা তাঁহার উপর আস্থা স্থাপন করিতে পারেন নাই।
চৈতন্যচরিগ্রন্থগুলির রচয়িতারা কোন সময়েই বলেন নাই যে হোসেন শাহ ধর্মবিষয়ে উদার ছিলেন। বরং তাঁহারা ইহার বিপরীত কথা লিখিয়াছেন। বৃন্দাবনদাস চৈতন্যভাগবতে’ হোসেন শাহকে “পরম দুর্বার” “যবন রাজা” বলিয়াছেন এবং চৈতন্যদেব ও তাঁহার সম্প্রদায় যে হোসেন শাহের নিকটে রামকেলি গ্রামে থাকিয়া হরিধ্বনি করিতেছিলেন, এজন্য তাঁহাদের সাহসের প্রশংসা করিয়াছেন। চৈতন্যচরিতগুলি পড়িলে বুঝা যায় যে, হোসেন শাহকে তাঁহার সমসাময়িক হিন্দুরা মোটেই ধর্মবিষয়ে উদার মনে করিত না, বরং তাঁহাকে অত্যন্ত ভয় করিত। অবৈষ্ণবরা প্রায়ই বৈষ্ণবদের এই বলিয়া ভয় দেখাইত যে, “যবন রাজা” অর্থাৎ হোসেন শাহ তাঁহাদের ধরিয়া লইয়া যাইবার জন্য তোক পাঠাইতেছেন।
সমসাময়িক পর্তুগীজ পর্যটক বারবোসা হোসেন শাহ সম্বন্ধে লিখিয়াছেন যে, তাঁহার ও তাঁহার অধীনস্থ শাসনকর্ত্তাদের আনুকূল্য অর্জনের জন্য প্রতিদিন বাংলায় অনেক হিন্দু ইসলামধর্ম গ্রহণ করিত। সুতরাং হোসেন শাহ যে হিন্দু-মুসলমানে সমদর্শী ছিলেন, সে কথা বলিবার কোন উপায় নাই।
উড়িষ্যার ‘মাদলা পাঞ্জী’ ও বাংলার চৈতন্যচরিগ্রন্থগুলি হইতে জানা যায় যে, হোসেন শাহ উড়িষ্যা-অভিযানে গিয়া বহু দেবমন্দির ও দেবমূর্ত্তি ধ্বংস করিয়াছিলেন। শেষবারের উড়িষ্যা-অভিযানে হোসেন শাহ সনাতনকে তাঁহার সহিত যাইতে বলিলে সনাতন বলেন যে, সুলতান উড়িষ্যায় গিয়া দেবতাকে দুঃখ দিবেন, এই কারণে তাঁহার সহিত তিনি যাইতে পারিবেন না।
