অনেকে মনে করিয়া থাকেন হোসেন শাহ সর্বপ্রথম সত্যপীরের উপাসনা প্রবর্তন করেন। এই ধারণার কোন ভিত্তি আছে বলিয়া মনে হয় না। প্রকৃতপক্ষে, সত্যপীরের উপাসনা যে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পূর্বে প্রবর্তিত হয় নাই, তাহা মনে করিবার যথেষ্ট কারণ আছে।
হোসেন শাহের বহু মন্ত্রী অমাত্য ও কর্মচারীর নাম এপর্যন্ত জানিতে পারা গিয়াছে। ইহাদের মধ্যে মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়েরই লোক ছিলেন। নিম্নে কয়েকজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া গেল।
১। পরাগল খান : ইনি হোসেন শাহের সেনাপতি ছিলেন এবং হোসেন শাহ কর্ত্তৃক চট্টগ্রাম অঞ্চলের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ইঁহারই আদেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় মহাভারত রচনা করেন।
২। ছুটি খান : ইনি পরাগল খানের পুত্র। ইহার প্রকৃত নাম নসরৎ খান। ইহার আদেশে শ্রীকর নন্দী বাংলা ভাষায় মহাভারত রচনা করিয়াছিলেন। শ্রীকর নন্দীর বিবরণ অনুসারে ছুটি খান লস্করের পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন এবং ত্রিপুরার রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়াছিলেন।
৩। সনাতন : সনাতন হোসেন শাহের মন্ত্রী ও সভাসদ ছিলেন এবং তাঁহার বিশিষ্ট উপাধি ছিল “সাকর মল্লিক” (‘সগীর মালিক’, অর্থ ছোট রাজা)। সনাতন হোসেন শাহের অন্যতম ‘দবীর খাস’ বা প্রধান সেক্রেটারীও ছিলেন। হোসেন শাহ তাঁহাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন ও তাঁহার উপর বিশেষভাবে নির্ভর করিতেন। চৈতন্যদেবের সঙ্গে দেখা হইবার পর সনাতন রাজকার্যে অবহেলা করেন এবং উড়িষ্যা-অভিযানে সুলতানের সহিত যাইতে অস্বীকার করেন। তাঁহার এই “অপরাধের” জন্য হোসেন শাহ তাঁহাকে বন্দী করিয়া রাখিয়া উড়িষ্যায় চলিয়া যান। কারারক্ষককে উৎকোচদানে বশীভূত করিয়া সনাতন মুক্তিলাভ করেন ও বৃন্দাবন যাত্রা করেন। তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুর একজন প্রিয় ভক্ত ছিলেন।
৪। রূপ : ইনি সনাতনের অনুজ। ইনিও হোসেন শাহের মন্ত্রী এবং দবীর খাস’ ছিলেন। দীর্ঘকাল চাকুরী করিবার পরে রূপ-সনাতনের সংসারে বিরাগ জন্মে এবং চৈতন্যের উপদেশে সংসার ত্যাগ করিয়া বৃন্দাবনে চলিয়া যান। অতঃপর রূপ সনাতন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম্মের ভাষ্য রচনায় অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করেন।
বল্লভ (সনাতন-রূপের ভ্রাতা), শ্রীকান্ত (ইহাদের ভগ্নীপতি), চিরঞ্জীব সেন (গোবিন্দদাস কবিরাজের পিতা), কবিশেখর, দামোদর, যশোরাজ খান (সকলেই পদকর্ত্তা), মুকুন্দ (বৈদ্য), কেশব খান (ছত্রী) প্রভৃতি বিশিষ্ট হিন্দুগণ হোসেন শাহের অমাত্য, কর্মচারী চিকিৎসক প্রভৃতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। অনেকের ধারণা, ‘পুরন্দর খান’ নামে হোসেন শাহের একজন হিন্দু উজীর ছিলেন। এই ধারণা সত্য নহে।
হোসেন শাহের রাজ্যের আয়তন অত্যন্ত বিশাল ছিল। বাংলা দেশের প্রায় সমস্তটা এবং বিহারের এক বৃহদংশ তাঁহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইহা ভিন্ন কামরূপ ও কামতা রাজ্য এবং উড়িষ্যা ও ত্রিপুরা রাজ্যের কিয়দংশ অন্তত সাময়িকভাবে তাঁহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল।
এখন আমরা হোসেন শাহের চরিত্র সম্বন্ধে আলোচনা করিব। এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে হোসেন শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁহার অভ্যুদয়ের পূর্বে পরপর কয়েকজন সুলতান অল্পদিন মাত্র রাজত্ব করিয়া আততায়ীর হস্তে নিহত হইয়াছিলেন। এই অবস্থার মধ্যে রাজা হইয়া হোসেন শাহ দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপন করিয়াছিলেন, বিভিন্ন রাজ্য জয় করিয়া নিজের রাজ্যভুক্ত করিয়াছিলেন এবং সুদীর্ঘ ছাব্বিশ বৎসর এই বিরাট ভূখণ্ডে নিরুদ্বেগে অপ্রতিহতভাবে রাজত্ব করিয়াছিলেন, ইহা অল্প কৃতিত্বের কথা নহে।
‘তবকাৎ-ই-আকবরী’ ‘তারিখ-ই-ফিরিশতা’ ও ‘রিয়াজ-উস্-সলাতীনে’র মতে হোসেন শাহ সুশাসক এবং জ্ঞানী ও গুণীবর্গের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন; ইহার ফলে দেশে পরিপূর্ণ শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়; তিনি গণ্ডক নদীর কূলে একটি বাঁধ নির্মাণ করিয়া রাজ্যের সীমানা সুঝক্ষিত করেন; রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, সরাইখানা ও মাদ্রাসা স্থাপন করেন এবং আলিম ও দরবেশদের বহু অর্থ দান করেন।
হোসেন শাহের রাজত্বকালে তাঁহার বা তাঁহার অধীনস্থ কর্মচারীদের দ্বারা বহু সুন্দর সুন্দর মসজিদ, ফটক প্রভৃতি নির্মিত হইয়াছিল। তাহাদের মধ্যে গৌড়ের “ছোট সোনা মসজিদ” এবং “গুমতি ফটক” এখনও বর্তমান আছে। ইহাদের শিল্পসৌন্দর্য অসাধারণ।
হোসেন শাহের রাজত্বকালে দেশে অশুভ ঘটনাও কিছু কিছু ঘটিয়াছিল। বৃন্দাবনদাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ হইতে জানা যায় যে, ১৫০৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার রাজ্যে দুর্ভিক্ষ হইয়াছিল। এই জাতীয় দুর্ভিক্ষের জন্য হোসেন শাহকে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করা না গেলেও পরোক্ষ দায়িত্ব তিনি এড়াইতে পারেন না। … …
কয়েকজন মুসলমান পণ্ডিতের সঙ্গে হোসেন শাহের গোলযোগ সম্বন্ধে কিছু সংবাদ পাওয়া যায়। ইহাদের মধ্যে একজন ফার্সী ভাষায় একটি ধনুর্বিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন এবং তৎকালীন গৌড়েশ্বর হোসেন শাহকে এই গ্রন্থ উৎসর্গ করেন। দ্বিতীয় মুসলমান পণ্ডিত হোসেন শাহের কোষাগারের জন্য একখানি ঐশ্লামিক গ্রন্থের তিনটি খণ্ড নকল করেন; তৃতীয় খণ্ডের পুস্পিকায় তিনি হোসেন শাহের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়াছেন। এই বই হোসেন শাহই উৎসাহী হইয়া নকল করাইয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। কিন্তু এই নকল করানোর মধ্যে তাঁহার বিদ্যোৎসাহিতার বদলে ধর্মপরায়ণতার নিদর্শনই বেশি মিলে।
