‘রাজমালা’র বিবরণ পড়িলে মনে হয়, ধন্যমাণিক্য বাংলার খণ্ডল পর্যন্ত যে অভিযান চালাইয়াছিলেন, তাহা হইতেই হোসেন শাহের সহিত তাঁহার সংঘর্ষের আরম্ভ হয় এবং ১৪৩৫ শক বা ১৫১৩-১৪ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে হোসেন শাহ ত্রিপুরারাজকে প্রতি-আক্রমণ করেন নাই। কিন্তু সোনারগাঁও অঞ্চলে ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দে উত্তীর্ণ হোসেন শাহের এক শিলালিপি পাওয়া গিয়াছে, তাহাতে থওয়াস খান নামে হোসেন শাহের একজন কর্মচারীকে ত্রিপুরার “সর-এ-লস্কর” বলা হইয়াছে। ইহা হইতে মনে হয় যে, ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যেই হোসেন শাহ ত্রিপুরার সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া ত্রিপুরার অঞ্চলবিশেষ অধিকার করিয়াছিলেন। কবীন্দ্র পরমেশ্বর তাঁহার মহাভারতে লিখিয়াছেন যে হোসেন শাহ ত্রিপুরা জয় করিয়াছিলেন। শ্রীকর নন্দী তাঁহার মহাভারতে লিখিয়াছেন যে তাঁহার পৃষ্ঠপোষক, হোসেন শাহের অন্যতম সেনাপতি ছুটি খান ত্রিপুরার দুর্গ আক্রমণ করিয়াছিলেন, তাঁহার ফলে ত্রিপুরারাজ দেশত্যাগ করিয়া “পর্বতগহ্বরে” “মহাবনমধ্যে” গিয়া বাস করিতে থাকেন; ছুটি খানকে তিনি হাতি ও ঘোড়া দিয়া সম্মানিত করেন; ছুটি খান তাঁহাকে অভয় দান করা সত্ত্বেও তিনি আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া থাকেন। এইসব কথা কতদূর যথার্থ তাহা বলা যায় না। তবে হোসেন শাহের রাজত্বকালে কোন সময়ে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে বাংলা বাহিনীর সাফল্যে ছুটি খান উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন–এই কথা সত্য বলিয়া মনে হয়।
হোসেন শাহের সহিত আরাকানরাজেরও সম্ভবত সংঘর্ষ হইয়াছিল। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই মর্মে প্রবাদ প্রচলিত আছে যে হোসেন শাহের রাজত্বকালে আরাকানীরা চট্টগ্রাম অধিকার করিয়াছিল; হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহের নেতৃত্বে এক বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গে প্রেরিত হয়, তাহারা আরাকানীদের বিতাড়িত করিয়া চট্টগ্রাম পুনরধিকার করে। জোআঁ-দে-বারোসের ‘দা এশিয়া’ এবং অন্যান্য সমসাময়িক পর্তুগীজ গ্রন্থ হইতে জানা যায় যে, ১৫১৮ খ্রীস্টাব্দে আরাকানরাজ বাংলার রাজার অর্থাৎ হোসেন শাহের সামন্ত ছিলেন। চট্টগ্রাম অধিকারের যুদ্ধে পরাজয় বরণ করার ফলেই সম্ভবত আরাকানরাজ হোসেন শাহের সামন্তে পরিণত হইয়াছিলেন।
হোসেন শাহ ত্রিহুতের কতকাংশ সমেত বর্তমান বিহার রাজ্যের অনেকাংশ জয় করিয়াছিলেন। বিহারের পাটনা ও মুঙ্গের জেলায়, এমন কি ঐ রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সারণ জেলায়ও হোসেন শাহের শিলালিপি পাওয়া গিয়াছে। বিহারের একাংশ সিকন্দর শাহ লোদীর রাজ্যভুক্ত ছিল। সিকন্দর শাহ লোদীর সহিত সন্ধি করিবার সময় হোসেন শাহ তাঁহাকে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে ভবিষ্যতে তিনি সিকন্দরের শত্রুতা করিবেন না এবং সিকন্দরের শত্রুদের আশ্রয় দিবেন না। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত পালিত হয় নাই। সারণ অঞ্চলের একাংশ হোসেন শাহের এবং অপরাংশ সিকন্দর শাহের অধিকারভুক্ত ছিল। লোদী রাজবংশ সম্বন্ধীয় ইতিহাসগ্রন্থগুলি হইতে জানা যায় যে, সারণে সিকন্দরের প্রতিনিধি হোসেন খান ফর্মূলির সহিত হোসেন শাহ খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা করিতে থাকায় এবং হোসেন খান ফমূলির প্রাধান্য দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে থাকায় সিকন্দর শাহ ক্রুদ্ধ হইয়া ফর্মূলির বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করেন (১৫০৯ খ্রী); তখন হোসেন শাহ ফলিকে আশ্রয় দেন। সিকন্দর শাহ লোদীর মৃত্যুর (১৫১৭ খ্রী) পর তাঁহার বিহারস্থ প্রতিনিধিদের সহিত হোসেন শাহ প্রকাশ্যভাবেই শত্রুতা করিতে আরম্ভ করেন।
হোসেন শাহের রাজত্বকালেই বাংলাদেশের মাটিতে পর্তুগীজরা প্রথম পদার্পণ করে। ১৫১৭ খ্রীষ্টাব্দে গোয়র পর্তুগীজ কর্তৃপক্ষ বাংলা দেশে বাণিজ্য সুরু করার অভিপ্রায়ে চারিটি জাহাজ পাঠান, কিন্তু মধ্যপথে প্রধান জাহাজটি অগ্নিকাণ্ডে নষ্ট হওয়ায় পর্তুগীজ প্রতিনিধিদল বাংলায় পৌঁছিতে পারেন নাই। ১৫১৮ খ্রীষ্টাব্দে জোআঁ-দে-সিলভেরার নেতৃত্বে একদল পর্তুগীজ প্রতিনিধি চট্টগ্রামে আসিয়া পৌঁছান। সিলভেরা বাংলার সুলতানের নিকট এদেশে বাণিজ্য করার ও চট্টগ্রামে একটি কুঠি নির্মাণের অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু সিলভেরা চট্টগ্রামের শাসনকর্ত্তার একজন আত্মীয়ের দুইটি জাহাজ ইতিপূর্বে দখল করিয়াছিলেন এবং চট্টগ্রামের খাদ্যভাবে পড়িয়া একটি চাল-বোঝাই নৌকা লুণ্ঠন করিয়াছিলেন বলিয়া চট্টগ্রামের শাসনকর্ত্তা তাঁহার প্রতি বিরূপ হন ও তাঁহার জাহাজ লক্ষ্য করিয়া কামান দাগেন। পর্তুগীজরা ইহার উত্তরে চট্টগ্রাম অবরোধ করিয়া বাংলার সামুদ্রিক-বাণিজ্য বিপর্যস্ত করিল। চট্টগ্রামে শাসনকর্ত্তা এই সময়ে কয়েকটি জাহাজের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, তাই তিনি সাময়িকভাবে পর্তুগীজদের সহিত সন্ধি করিলেন। কিন্তু জাহাজগুলি বন্দরে পৌঁছিবামাত্র তিনি পর্তুগীজদের প্রতি আক্রমণ পুনরারম্ভ করিলেন। তখন সিলভেরা আরাকানে অবতরণের এবং সেখানে বাণিজ্য সুরু করার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু সিলভেরা জানিতে পারিলেন যে আরাকানে অবতরণ করিলেই তিনি বন্দী হইবেন। এই কারণে তিনি নিরাশ হইয়া সিংহলে চলিয়া গেলেন।
হোসেন শাহ গৌড় হইতে নিকটবর্তী একডালায় তাঁহার রাজধানী স্থানান্তরিত করিয়াছিলেন। এই একডালার অবস্থান সম্বন্ধে ইলিয়াস শাহের প্রসঙ্গে পূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে। সম্ভবত ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এবং ক্রমাগত লুণ্ঠনের ফলে গৌড় নগরী শ্রীহীন হইয়া পড়ায় হোসেন শাহ একডালায় রাজধানী স্থানান্তরিত করিয়াছিলেন।
