যাহা হউক, দেখা যাইতেছে যে হোসেন শাহ ও উড়িষ্যারাজের সংঘর্ষে উভয়পক্ষই জয়ের দাবি করিয়াছেন।
বাংলার চৈতন্যচরিগ্রন্থগুলি–বিশেষভাবে ‘চৈতন্যভাগবত’, ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ ও ‘চৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটক’ হইতে এ সম্বন্ধে অনেকটা নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায়। এগুলি হইতে জানা যায় যে, হোসেন শাহ উড়িষ্যা আক্রমণ করিয়া সেখানকার বহু দেবমন্দির ও দেবমূর্ত্তি ভাঙিয়াছিলেন ও দীর্ঘকাল ধরিয়া তাঁহার সহিত উড়িষ্যার রাজার যুদ্ধ চলিয়াছিল। চৈতন্যদেব যখন দক্ষিণ ভারত ভ্রমণের শেষে নীলাচলে প্রত্যাবর্তন করেন (১৫১২ খ্রীষ্টাব্দ), তখন বাংলা ও উড়িষ্যার যুদ্ধ বন্ধ ছিল। বাংলা হইতে চৈতন্যদেবের নীলাচলে প্রত্যাবর্তনের (জুন ১৫১৫ খ্রী) অব্যবহিত পরে হোসেন শাহ আবার উড়িষ্যা অভিযান করেন।
জয়ানন্দ তাঁহার ‘চৈতন্যমঙ্গলে লিখিয়াছেন যে উড়িষ্যারাজ প্রতাপরুদ্র একবার বাংলা দেশ আক্রমণ করিবার সঙ্কল্প করিয়া সে সম্বন্ধে চৈতন্যদেবের আজ্ঞা প্রার্থনা করিয়াছিলেন, কিন্তু চৈতন্যদেব তাঁহাকে এই প্রচেষ্টা হইতে বিরত হইতে বলেন; তিনি প্রতাপরুদ্রকে বলেন যে, “কালবন রাজা পঞ্চগৌড়েশ্বর” মহাশক্তিমান; তাঁহার রাজ্য আক্রমণ করিলে সে উড়িষ্যা উৎসন্ন করিবে এবং জগন্নাথকে নীলাচল ত্যাগ করিতে বাধ্য করিবে। চৈতন্যদেবের কথা শুনিয়া প্রতাপরুদ্র বাংলা আক্রমণ হইতে নিরস্ত হন। এই উক্তি কতদূর সত্য বলা যায় না।
এতক্ষণ যে আলোচনা করা হইল, তাহা হইতে পরিষ্কার বুঝিতে পারা যায় যে, ১৪৯৩-৯৪ খ্রীষ্টাব্দে হোসেন শাহের সহিত উড়িষ্যার রাজার যুদ্ধ আরম্ভ হয়। ১৫১২ খ্রীষ্টাব্দ হইতে ১৫১৪ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই যুদ্ধ বন্ধ ছিল। কিন্তু ১৫১৫ খ্রষ্টাব্দে হোসেন শাহ আবার উড়িষ্যা আক্রমণ করেন এবং স্বয়ং এই অভিযানে নেতৃত্ব করেন। কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে কোন পক্ষই বিশেষ কোন স্থায়ী ফল লাভ করিতে পারেন নাই।
হোসেন শাহ এবং ত্রিপুরার রাজার মধ্যেও অনেক দিন ধরিয়া যুদ্ধবিগ্রহ চলিয়াছিল। ইহা ‘রাজমালা’ (ত্রিপুরার রাজাদের ইতিহাস) নামক বাংলা গ্রন্থে কবিতার আকারে বর্ণিত হইয়াছে। ‘রাজমালা’র দ্বিতীয় খণ্ডে (রচনাকাল ১৫৭৭ ৮৬ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে) হোসেন শাহ ও ত্রিপুরারাজের সংঘর্ষের বিবরণ পাওয়া যায়। ঐ বিবরণের সারমর্ম নিম্নে প্রদত্ত হইল।
হোসেন শাহের সহিত ত্রিপুরারাজের বহু সংঘর্ষ হয়। ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বেই ত্রিপুরারাজ ধন্যমাণিক্য বাংলার সুলতানের অধীন অনেক অঞ্চল জয় করেন। ১৪৩৫ শতকে ধন্যমাণিক্য চট্টগ্রাম অধিকার করেন ও এতদুপলক্ষে স্বর্ণমুদ্রা প্রকাশ করেন। হোসেন শাহ তাঁহার বিরুদ্ধে গৌরাই মল্লিক নামক একজন সেনাপতির অধীনে এক বিপুল বাহিনী পাঠান। গৌরাই মল্লিক ত্রিপুরার অনেক অঞ্চল জয় করেন, কিন্তু চণ্ডীগড় দুর্গ জয় করিতে অসমর্থ হন। ইহার পর তিনি চণ্ডীগড়ের পাশ কাটাইয়া গিয়া গোমতী নদীর উপরদিক দখল করেন, বাঁধ দিয়া গোমতীর জল অবরুদ্ধ করেন এবং তিন দিন পরে বাঁধ খুলিয়া জল ছাড়িয়া দেন; ঐ জল দেশ ভাসাইয়া দিয়া ত্রিপুরার বিপর্যয় সাধন করিল। তখন ত্রিপুরারাজ অভিচার অনুষ্ঠান করিলেন; এই অনুষ্ঠানে বলিপ্রদত্ত চণ্ডালের মাথা বাংলার সৈন্যবাহিনীর ঘাঁটিতে অলক্ষিতে পুঁতিয়া রাখিয়া আসা হইল। তাঁহার ফলে সেই রাত্রেই বাংলার সৈন্যরা ভয়ে পলাইয়া গেল।
১৪৩৬ শকে ধন্যমাণিক্যের রাইকছাগ ও রাইকছম নামে দুইজন সেনাপতি আবার চট্টগ্রাম অধিকার করেন। তখন হোসেন শাহ হৈতন খাঁ নামে একজন সেনাপতির অধীনে আর একটি বাহিনী পাঠান। হৈতন খাঁ সাফল্যের সহিত অগ্রসর হইয়া ত্রিপুরারাজ্যের দুর্গের পর দুর্গ জয় করিতে থাকেন এবং গোমতী নদীর তীরে গিয়া উপস্থিত হন। ইহাতে বিচলিত হইয়া ধন্যমাণিক্য ডাকিনীদের সাহায্য চান। তখন ডাকিনীরা গোমতী নদীর জল শোষণ করিয়া সাত দিন নদীর খাত শুষ্ক রাখিয়া অতঃপর জল ছাড়িয়া দিল। সেই জলে ত্রিপুরার লোকেরা বহু ভেলা ভাসাইল, প্রতি ভেলায় তিনটি করিয়া পুতুল ও প্রতি পুতুলের হাতে দুইটি করিয়া মশাল ছিল। অর্গলমুক্ত জলধারায় বাংলার সৈন্যদের হাতি ঘোড়া উট ভাসিয়া গেল, ইহা ভিন্ন তাহারা দূর হইতে জ্বলন্ত মশাল দেখিয়া ভয়ে ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল; তারপর ত্রিপুরার লোকেরা তাঁহার নিকটবর্তী একটি বনে আগুন লাগাইয়া দিল। বাংলার সৈন্যেরা তখন পলাইয়া গেল, তাহাদের অনেকে ত্রিপুরার সৈন্যদের হাতে মারা পড়িল। ত্রিপুরার সৈন্যরা বাংলার বাহিনীর অধিকৃত চারিটি ঘাঁটি পুনরধিকার করিল। বাংলার বাহিনী ছয়কড়িয়া ঘাঁটিতে অবস্থান করিতে লাগিল।
এখন প্রশ্ন এই, ‘রাজমালা’র এই বিবরণ কতদূর বিশ্বাসযোগ্য। ধন্যমাণিক্য অভিচারের দ্বারা গৌরাই মল্লিককে এবং ডাকিনীদের সাহায্যে হৈতন খাকে বিতাড়িত করিয়াছিলেন বলিয়া বিশ্বাস করা যায় না। এইসব অলৌকিক কাণ্ড বাদ দিলে ‘রাজামালা’র বিবরণের অবশিষ্টাংশ সত্য বলিয়াই মনে হয়। সুতরাং এই বিবরণের উপর নির্ভর করিয়া আমরা এই সিদ্ধান্ত করিতে পারি যে হোসেন শাহ ধন্যমাণিক্যের সংঘর্ষের প্রথম পর্যায়ে ধন্যমাণিক্যই জয়যুক্ত হন এবং তিনি খণ্ডল পর্যন্ত হোসেন শাহের রাজ্যের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল অধিকার করিয়া লন। দ্বিতীয় পর্যায়ে ধন্যমাণিক্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত জয় করেন, কিন্তু প্রতিপক্ষের আক্রমণে তাঁহাকে পূর্বাধিকৃত সমস্ত অঞ্চল হারাইতে হয় এবং গৌড়েশ্বরের সেনাপতি গৌরাই মল্লিক গোমতী নদীর তীরবর্তী চণ্ডীগড় দুর্গ পর্যন্ত অধিকার করেন; গৌরাই মল্লিক গোমতী নদীর জল প্রথমে রুদ্ধ ও পরে মুক্ত করিয়া ত্রিপুরারাজের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটাইয়াছিলেন। তৃতীয় পর্যায়ে ধন্যমাণিক্য আবার পূর্বাধিকৃত অঞ্চলগুলি অধিকার করেন, কিন্তু হোসেন শাহের সেনাপতি হৈতন খাঁ প্রতি-আক্রমণ করিয়া তাহাকে বিতাড়িত করেন এবং তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিয়া গোমতী নদীর তীরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত অধিকার করেন। এইবার ত্রিপুরা-রাজ গোমতী নদীর জল প্রথমে রুদ্ধ ও পরে মুক্ত করিয়া তাহাকে বিপদে ফেলেন। তাঁহার ফলে হৈতন খাঁ পিছু হটিয়া ছয়কড়িয়ায় চলিয়া আসেন। ত্রিপুরারাজ ছয়কড়িয়ার পূর্ব পর্যন্ত হৃত অঞ্চলগুলি পুনরধিকার করেন, ত্রিপুরারাজ্যের অন্যান্য অধিকৃত অঞ্চল হোসেন শাহের দখলেই থাকিয়া যায়।

মধ্যযুগে কাম রাজ্য