এই প্রবাদের খুঁটিনাটি বিবরণগুলি এবং ইহাতে উল্লিখিত তারিখ সত্য বলিয়া মনে হয় না। তবে হোসেন শাহের কামতাপুর-কামরূপ বিজয় যে ঐতিহাসিক ঘটনা, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই, কারণ ‘রিয়াজ, বুকাননের বিবরণী এবং কামতাপুর অঞ্চলের কিংবদন্তী-সমস্ত সূত্রই এই ঘটনার সত্যতা সম্বন্ধে একমত। ‘আসাম বুরঞ্জী’র মতে কোচ রাজা বিশ্বসিংহ হোসেন শাহের অধীনস্থ আটগাঁওয়ের মুসলমান শাসনকর্ত্তা “তুরকা কোতয়াল”কে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করিয়া কামতাপুর-কামরূপ রাজ্য পুনরধিকার করেন। কথিত আছে যে ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের পরে কামতাপুর রাজ্য হইতে মুসলমানরা বিতাড়িত হইয়াছিল। এই সব কথা কতদূর সত্য, তাহা বলা যায় না।
ঐ সময়ে কামরূপের পূর্ব ও দক্ষিণে আসাম ও অহোম রাজ্য অবস্থিত ছিল। রাজ্যটি দুর্গম পার্ব্বত্য অঞ্চলে পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য এবং এখানে বর্ষার প্রকোপ খুব বেশি হওয়ার জন্য বাহিরের কোন শক্তির পক্ষে এই রাজ্য জয় করা খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শিহাবুদ্দীন তালিশ নামে মোগল সরকারের জনৈক কর্মচারী তিহার তারিখ-ফতে-ই-আশাম’ গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, হোসেন শাহ ২৪,০০০ পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া আসাম আক্রমণ করেন, তখন আসামের রাজা পার্ব্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। হোসেন শাহ আসামের সমতল অঞ্চল অধিকার করিয়া সেখানে তাঁহার জনৈক পুত্রকে (কিংবদন্তী অনুসারে ইহার নাম “দুলাল গাজী”) এক বিশাল সৈন্যাবহিনী সহ রাখিয়া নিজে গৌড়ে ফিরিয়া গেলেন। কিন্তু যখন বর্ষা নামিল, তখন চারিদিক জলে ভরিয়া গেল। সেই সময়ে আসামের রাজা পার্ব্বত্য অঞ্চল হইতে নামিয়া হোসেনের পুত্রকে বধ করিলেন ও তাঁহার সৈন্য ধ্বংস করিলেন। মীর্জা মুহম্মদ কাজিমের ‘আলমগীরনামা’ এবং গোলাম হোসেনের ‘রিয়াজ-উস্-সলাতীন’-এ শিহাবুদ্দীন তালিশের এই বিবরণের পরিপূর্ণ সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু অসমীয়া বুরঞ্জীগুলির মতে বাংলার রাজা “খুনফৎ” বা “খুফৎ” (হুসন) “বড় উজীর” ও “বিৎ মালিক” (বা “মি মানিক”) নামে দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে আসাম জয়ের জন্য ২০,০০০ পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য এবং অসংখ্য রণতরী প্রেরণ করিয়াছিলেন; এই বাহিনী প্রায় বিনা বাধায় অনেকদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়; তাঁহার পর আসামরাজ সুহুঙ্গ মুঙ্গ তাহাদের প্রচণ্ড বাধা দেন; দুই পক্ষের মধ্যে নৌযুদ্ধ হয় এবং তাহাতে মুসলমানরা প্রথম দিকে জয়লাভ করিলেও শেষ পর্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়; “বড় উজীর” পলাইয়া প্রাণ বাঁচান; কিছুদিন পরে তিনি আবার “বিৎ মালিক” সমভিব্যাহারে আসাম আক্রমণ করেন; ইতিমধ্যে আসামরাজ কয়েকটি নদীর মোহনায় ঘাঁটি বসাইয়া তাঁহার প্রধান সেনাপতিদের মোতায়েন করিয়া রাখিয়াছিলেন; বাংলার সৈন্যবাহিনী জলপথ ও স্থলপথে সিংরী পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া সেখানকার ঘাঁটি আক্রমণ করে ও এখানে বহুক্ষণব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে অসমীয়া সেনাপতি বরপুত্র গোহাইন বাংলার বাহিনীকে পরাজিত করেন। “বিৎ মালিক এবং বাংলার বহু সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল, অনেকে বন্দী হইয়াছিল; “বড় উজীর” এবারও স্বল্পসংখ্যক অনুচর লইয়া পলাইয়া গিয়া প্রাণ বাঁচাইলেন; তাঁহাদিগকে অসমীয়া বাহিনী অনেক দূর পর্যন্ত তাড়া করিয়া লইয়া গেল।
মুসলমান লেখকদের লেখা বিবরণে এবং অসমীয়া বুরঞ্জীর বিবরণে কিছু পার্থক্য থাকিলেও এবিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে হোসেন শাহের আসামজয়ের প্রচেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হইয়াছিল।
আসামের “হোসেন শাহী পরগণা” নামে পরিচিত একটি অঞ্চল এখনও হোসেন শাহের স্মৃতি বহন করিতেছে।
উড়িষ্যার সহিতও হোসেন শাহের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হইয়াছিল। মুদ্রার সাক্ষ্য হইতে মনে হয়, হোসেন শাহের রাজত্বের প্রথম বৎসরেই উড়িষ্যার সহিত তাঁহার সংঘর্ষ বাধে। ঐ সময়ে পুরুষোত্তমদেব উড়িষ্যার রাজা ছিলেন। ১৪৯৭ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হয় এবং তাঁহার পুত্র প্রতাপরুদ্র সিংহাসনে আরোহণ করেন। প্রতাপরুদ্রের দীক্ষাগুরু জীবদেবাচার্যের লেখা ‘ভক্তিভাগবত’ মহাকাব্য হইতে জানা যায় যে, সিংহাসনে আরোহণের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতাপরুদ্রকে বাংলার সুলতানের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইতে হইয়াছিল।
হোসেন শাহের মুদ্রা ও শিলালিপি, ‘রিয়াজ-উস্ সলাতীন’ এবং ত্রিপুরার ‘রাজমালা’র সাক্ষ্য অনুসারে হোসেন শাহ উড়িষ্যা জয় করিয়াছিলেন।
পক্ষান্তরে, উড়িষ্যার বিভিন্ন সূত্রের মতে উড়িষ্যারাজ প্রতাপরুদ্রই হোসেন শাহকে পরাজিত করিয়াছিলেন। জীবদেবাচার্য ‘ভক্তিভাগবত’-এ লিখিয়াছেন যে পিতার মৃত্যুর ছয় সপ্তাহের মধ্যেই প্রতাপরুদ্র বাংলার সুলতানকে পরাজিত করিয়া গঙ্গা (ভাগীরথী) নদীর তীর পর্যন্ত অঞ্চল অধিকার করিয়াছিলেন। প্রতাপরুদ্রের তাম্রশাসন ও শিলালিপিতে বলা হইয়াছে যে প্রতাপরুদ্রের নিকট পরাজিত হইয়া গৌড়েশ্বর কাঁদিয়াছিলেন এবং ভয়াকুল চিত্তে স্বস্থানে প্রস্থান করিয়া আত্মরক্ষা করিয়াছিলেন। প্রতাপরুদ্রের রচনা বলিয়া ঘোষিত সরস্বতীবিলাস’ গ্রন্থে (১৫১৫ খ্রষ্টাব্দ বা তাঁহার পূর্বে রচিত) প্রতাপরুদ্রকে “শরণাগত জবুনা-পুরাধীনশ্বর হুশনশাহ-সুরত্রাণ-শরণরক্ষণ” বলা হইয়াছে, অর্থাৎ প্রতাপরুদ্র শুধু হোসেন শাহের বিজেতা নহেন, তাঁহার রক্ষাকর্ত্তাও! উড়িয়া ভাষার লেখা জগন্নাথ মন্দিরের মাদলা পাঞ্জী’ ও সংস্কৃত ভাষায় লেখা কটকরাজবংশাবলী’ গ্রন্থের মতে বাংলার সুলতান উড়িষ্যা আক্রমণ করিয়া উড়িষ্যার রাজধানী কটক এবং পুরী পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল জয় করিয়া লন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রায় সমস্ত দেবমূর্ত্তি তিনি নষ্ট করেন, জগন্নাথের মূর্ত্তিকে দোলায় চড়াইয়া চিল্কা হ্রদের মধ্যস্থিত চড়াইগুহা পর্বতে লইয়া গিয়া রাখা হইয়াছিল বলিয়া উহা ধ্বংস হইতে রক্ষা পায়। এই সময়ে প্রতাপরুদ্র। দক্ষিণদিকে অভিযানে গিয়াছিলেন, এবং সংবাদ পাইয়া তিনি দ্রুতগতিতে চলিয়া আসেন এবং বাংলার সুলতানকে তাড়া করিয়া গঙ্গার তীর পর্যন্ত লইয়া যান। মাদলা পাঞ্জী’র মতে ১৫০৯ খ্রীষ্টাব্দে এই ঘটনা ঘটিয়াছিল। এই সূত্রের মতে চউমূৰ্হিতে প্রতাপরুদ্র ও হোসেন শাহের মধ্যে বিরাট যুদ্ধ হয় এবং এই যুদ্ধে পরাজিত হইয়া হোসেন শাহ মান্দারণ দুর্গে আশ্রয় লন। প্রতাপরুদ্র তখন মান্দারণ দুর্গ অবরোধ করেন। প্রতাপরুদ্রের অন্যতম সেনাপতি গোবিন্দ ভোই বিদ্যাধর ইতিপূর্বে হোসেন শাহের কটক আক্রমণের সময়ে কটক রক্ষা করিতে ব্যর্থ। হইয়াছিল, সে এখন হোসেন শাহের সহিত যোগ দিল; হোসেন শাহ ও গোবিন্দ বিদ্যাধর প্রতাপরুদ্রের সহিত প্রচণ্ড যুদ্ধ করিয়া তাঁহাকে মান্দারণ হইতে বিতাড়িত করিলেন। মান্দারণ হইতে অনেকখানি পশ্চাদপসরণ করিয়া প্রতাপরুদ্র গোবিন্দ বিদ্যাধরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং তাহাকে অনেক বুঝাইয়া সুজাইয়া আবার স্বদেশে আনয়ন করিলেন; ইহার পর তিনি গোবিন্দকে পাত্রের পদে অধিষ্ঠিত করিয়া তাহাকেই রাজ্য শাসনের ভার দিলেন; হোসেন শাহ আর উড়িষ্যা জয় করিতে পারিলেন না। এই বিবরণের সমস্ত কথা সত্য না হইলেও অনেকখানিই যে সত্য, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।
