সিংহাসন লাভের অব্যবহিত পূর্বে হোসেন শাহ হাবশী সুলতান মুজাফফর শাহের উজীর ছিলেন বিভিন্ন ইতিহাসপ্রন্থে ও বাবরের আত্মজীবনীতে এ কথা উল্লিখিত হইয়াছে, ইহার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। ইতিহাসগ্রন্থগুলির মতে মুজাফফর শাহের উজীর থাকিবার সময় হোসেন একদিকে তাঁহাকে বৈধ অবৈধ নানাভাবে অর্থ সংগ্রহের পরামর্শ দিতেন ও অপর দিকে তাঁহার বিরুদ্ধে প্রচার করিতেন; ইহা খুবই নিন্দনীয়। যে ভাবে হোসেন প্রভুকে বধ করিয়া রাজা হইয়াছিলেন, তাঁহারও প্রশংসা করা যায় না। তবে মুজাফফর শাহও তাঁহার প্রভুকে হত্যা করিয়া রাজা হইয়াছিলেন। সেই জন্য তাঁহার প্রতি হোসেনের এই আচরণকে “শঠে শাঠ্যং সমাচরয়েৎ” নীতির অনুসরণ বলিয়া ক্ষমা করা যায়।
মুদ্রা ও শিলালিপির সাক্ষ্য হইতে জানা যায় যে, হোসেন শাহ ১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর হইতে ১৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসের মধ্যে কোন এক সময়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসনে আরোহণের সময় যে তাঁহার যথেষ্ট বয়স হইয়াছিল, সে সম্বন্ধে অনেক প্রমাণ আছে।
বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থের মতে মুজাফফর শাহের মৃত্যুর পরে প্রধান অমাত্যেরা একত্র সমবেত হইয়া হোসেনকে রাজা হিসাবে নির্বাচিত করেন। তবে, ‘ফিরিশতা’ ও ‘রিয়াজ’-এর মতে হোসেন শাহ অমাত্যদিগকে লোভ দেখাইয়া রাজপদ লাভ করিয়াছিলেন। হোসেন অমাত্যদিগকে বলিয়াছিলেন যে তাঁহারা যদি তাহাকে রাজপদে নির্বাচন করেন, তবে তিনি গৌড় নগরের মাটির উপরের সমস্ত ধন সম্পত্তি তাহাদিগকে দিবেন এবং মাটির নীচে লুকানো সব সম্পদ তিনি নিজে লইবেন। অমাত্যেরা এই সর্তে সম্মত হইয়া তাহাকে রাজা করেন এবং গৌড়ের মাটির উপরের সম্পত্তি লুঠ করিয়া লইতে থাকেন; কয়েক দিন পরে হোসেন শাহ তাঁহাদিগকে লুঠ বন্ধ করিতে বলেন; তাঁহারা তাহাতে রাজী না হওয়ায় হোসেন বারো হাজার লুণ্ঠনকারীকে বধ করেন; তখন অন্যেরা লুঠ বন্ধ করে; হোসেন নিজে কিন্তু গৌড়ের মাটির নীচের সম্পত্তি লুঠ করিয়া হস্তগত করেন; তখন ধনী ব্যক্তিরা সোনার থালাতে খাইতেন; হোসেন এইরূপ তেরশত সোনার থালা সমেত বহু গুপ্তধন লাভ করিলেন।
এই বিবরণ সত্য হইলে বলিতে হইবে হোসেন শাহ সিংসাহনে আরোহণের সময় নানা ধরনের ক্রুর কুটনীতি ও হীন চাতুরীর আশ্রয় লইয়াছিলেন।
বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থের মতে হোসেন রাজা হইয়া অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যে পরিপূর্ণ শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করেন। এ কথা সত্য, কারণ সমসাময়িক সাহিত্য হইতে ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। ইতিহাসগ্রন্থগুলির মতে ইতিপূর্বে বিভিন্ন সুলতানের হত্যাকাণ্ডে যাহারা প্রধান অংশ গ্রহণ করিয়াছিল, সেই পাইকদের দলকে হোসেন শাহ ভাঙিয়া দেন এবং প্রাসাদ রক্ষার জন্য অন্য রক্ষিদল নিযুক্ত করেন; হাবশীদের তিনি তাঁহার রাজ্য হইতে একেবারে বিতাড়িত করেন; তাহারা গুজরাট ও দক্ষিণ ভারতে চলিয়া গেল; হোসেন সৈয়দ, মোগল ও আফগানদের উচ্চপদে নিয়োগ করিলেন।
হোসেন শাহের সিংহাসনে আরোহণের প্রায় দুই বৎসর পরে (১৪৯৫ খ্রী) জৌনপুরের রাজ্যচ্যুত সুলতান হোসেন শাহ শর্কী দিল্লির সুলতান সিকন্দর শাহ লোদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন এবং পরাজিত হইয়া বাংলায় পলাইয়া আসেন। বাংলার সুলতান হোসেন শাহ তাঁহাকে আশ্রয় দেন। ইহাতে ক্রুদ্ধ হইয়া সিকন্দর লোদী বাংলার সুলতানের বিরুদ্ধে একদল সৈন্য প্রেরণ করিলেন। হোসেন শাহও তাঁহার পুত্র দানিয়েলের নেতৃত্বে এক সৈন্যবাহিনী পাঠাইলেন। উভয় বাহিনী বিহারের বাঢ় নামক স্থানে পরস্পরের সম্মুখীন হইয়া কিছুদিন রহিল, কিন্তু যুদ্ধ হইল না। অবশেষে দুই পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হইল। এই সন্ধি অনুসারে দুই পক্ষের অধিকার পূর্ববৎ রহিল এবং হোসেন শাহ সিকন্দর লোদীকে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে সিকন্দরের শত্রুদের তিনি ভবিষ্যতে নিজ রাজ্যে আশ্রয় দিবেন না। সিকন্দরও হোসেনকে অনুরূপ প্রতিশ্রুতি দিলেন। ইহার পর সিকন্দর লোদী দিল্লিতে ফিরিয়া গেলেন। দিল্লির পরাক্রান্ত সুলতানের সহিত সংঘর্ষের এই সম্মানজনক পরিণাম হোসেন শাহের পক্ষে বিশেষ গৌরবের বিষয়, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।
হোসেন শাহ তাঁহার রাজত্বের প্রথম বৎসর হইতেই মুদ্রায় নিজেকে “কামরূপ-কামতা-জাজনগর-উড়িষ্যা-বিজয়ী” বলিয়া অভিহিত করিতে এবং এই রাজ্যগুলি বিজয়ের সক্রিয় চেষ্টা করিতে থাকেন। কয়েক বৎসরের চেষ্টায় তিনি কামতাপুর ও কামরূপ রাজ্য সম্পূর্ণভাবে জয় করিলেন। ঐ অঞ্চলে প্রচলিত প্রবাদ অনুসারে হোসেন শাহ বিশ্বাসঘাতকতার সাহায্যে কামতাপুর (কোচবিহার) ও কামরূপ (আসামের পশ্চিম অংশ) জয় করিয়াছিলেন; কামতাপুর ও কামরূপের রাজা খেন-বংশীয় নীলাম্বর তাঁহার মন্ত্রীর পুত্রকে বধ করিয়াছিলেন সে তাঁহার রাণীর প্রতি অবৈধ আসক্তি প্রকাশ করিয়াছিল বলিয়া, তাহাকে বধ করিয়া তিনি তাঁহার পিতাকে নিমন্ত্রণ করিয়া তাঁহার মাংস খাওয়াইয়াছিলেন; তখন তাঁহার পিতা প্রতিশোধ লইবার জন্য গঙ্গাস্নান করিবার অছিলা করিয়া গৌড়ে চলিয়া আসেন এবং হোসেন শাহকে কামতাপুর আক্রমণের জন্য উত্তেজিত করেন। হোসেন শাহ তখন কামতাপুর আক্রমণ করেন, কিন্তু নীলাম্বর তাঁহার আক্রমণ প্রতিহত করেন। অবশেষে হোসেন শাহ মিথ্যা করিয়া নীলাম্বরকে বলিয়া পাঠান যে তিনি চলিয়া যাইতে চাহেন, কিন্তু তাঁহার পূর্বে তাঁহার বেগম একবার নীলাম্বরের রাণীর সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাহেন; নীলাম্বর তাহাতে সম্মত হইলে হোসেন শাহের শিবির হইতে তাঁহার রাজধানীর ভিতরে পালকী যায়, তাহাতে নারীর ছদ্মবেশে সৈন্য ছিল; তাহারা কামতাপুর নগর অধিকার করে; ১৪৯৮-৯৯ খ্রীষ্টাব্দে এই ঘটনা ঘটিয়াছিল।
